ভোটের দিন অ্যাপটি বেশ কাজে দেবে বলে মনে করছেন ইসি কর্মকর্তারা।
Published : 06 Jan 2024, 07:09 AM
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট নামে যে অ্যাপ চালু করেছে ইসি, সেটি সম্পর্কে না জানার কথাই বলছেন বেশির ভাগ ভোটার।
ভোট ঘনিয়ে এলেও গুগল প্লে স্টোর থেকে অ্যাপটি ডাউনলোড হয়েছে লাখখানেকের মত। আর অ্যাপল অ্যাপ স্টোর থেকে সেটি ডাউনলোডের সংখ্যা খুব বেশি নয়। অথচ এবারের নির্বাচনের ভোটার সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি, যেখানে কেবল তরুণ ভোটারের সংখ্যাই আড়াই কোটির মত।
এই ভোটারদের বড় অংশের হাতে স্মার্টফোন থাকলেও ইসির অ্যাপটি সম্পর্কে তেমন প্রচার নেই। না জানার কারণে অ্যাপটি ডাউনলোড করেননি বলে জানাচ্ছেন ভোটারদের অনেকেই।
জানতে চাইলে ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, “অ্যাপটি উদ্বোধন হওয়ার পর আমরা চেষ্টা করেছি প্রচার বাড়াতে, কমিশন কেন্দ্রীয়ভাবে ব্রিফ করেছে। ভোটের সময় কমিশন গেছে, এ নিয়ে কথা বলেছে। জনসংযোগ শাখাকে অ্যাপের বিষয়টি ব্যাপকভাবে জানাতে প্রচারের জন্য বলা হয়।
“তবে তফসিল ঘোষণার পর প্রার্থী ও ভোটাকেন্দ্রের তথ্য জানাতে পদ্ধতিগত সময় লেগেছে। ভোটকেন্দ্রের গেজেট ডিসেম্বরের শুরুতে হয়েছে। প্রতীক বরাদ্দ হয়েছে ১৮ ডিসেম্বর। এরপর প্রার্থী, ভোটাকেন্দ্রের তথ্য পাচ্ছেন সবাই।”
ভোটের দিন অ্যাপটি বেশ কাজে দেবে বলে মনে করছেন তিনি।
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট অ্যাপে মিলছে দরকারি নানা তথ্য। জন্ম তারিখ ও এনআইডি কার্ডের নম্বর দিয়ে ভোট কেন্দ্রের ঠিকানা, ভোট দেওয়ার সিরিয়াল নম্বর, প্রার্থীদের প্রতীক যেমন জানা যাচ্ছে; তেমনই ভোট চলা অবস্থায় দুই ঘণ্টা পর পর ভোটের হারও জানা যাবে।
জানে স্বল্প ভোটার
এবারই প্রথম ভোট দেবেন সরকারি বাঙলা কলেজের শিক্ষার্থী শাকিল আহমেদ। ভোট দেওয়ার আগ্রহ থেকেই তিনি স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ সম্পর্কে জেনেছেন।
তার ভাষ্যে, “এক প্রার্থীর কাছ থেকে জানলাম যে, একটা অ্যাপের মাধ্যমে তথ্য জানতে পারব। পরে অ্যাপটা ইনস্টল করে দেখলাম- নির্বাচন সংক্রান্ত অনেক তথ্যই আছে। আমার ভোট কেন্দ্রও জানলাম। ভোটার নম্বর, প্রার্থীদের তালিকা সবই দেখলাম।”
আবার এই অ্যাপ ডাউনলোড করেও নিজের কেন্দ্রের তথ্য না পাওয়ার কথাও বলছেন কেউ কেউ।
ভোটকেন্দ্র কোনটি, জানবেন যেভাবে
ভোটের হার মিলবে অ্যাপে, ফলাফল পেতে ‘হোয়াটসঅ্যাপ’ ব্যবহারের চিন্তা
স্মার্ট অ্যাপে দুই ঘণ্টা পর পর জানা যাবে ভোট পড়ল কত
এক ক্লিকে ভোটের সব তথ্য: প্রস্তুত স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ
তাদের একজন বদরুন্নেসা কলেজের শিক্ষার্থী হীরা মনি বলছেন, তিনি ফোনে জন্ম তারিখ ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর বসিয়েও ভোটকেন্দ্রের তথ্য জানতে পারেননি।
নরসিংদীর এই ভোটারের ভাষ্য, “আমি এনআইডি আর জন্মতারিখ দেওয়ার পরে আমাকে বলছে, জন্মতারিখ বা এনআইডি ভুল আছে। আমি কেন্দ্র সম্পর্কে জানতে পারলাম না।”
তবে বেশির ভাগ ভোটার বলছেন, তারা অ্যাপটি সম্পর্কে জানেনই না। তারা ভরসা করছেন নিজের অভিজ্ঞতার ওপর।
মিরপুরের বাসিন্দা রেহানা পারভীন বলেন, “আমি যে কেন্দ্রে সবসময় ভোট দিয়েছি, ওখানে দেব। আর কোনো সমস্যা হলে পরে তো জানা যাবে।”
ওই এলাকার ফুচকা বিক্রেতা হারুন মিয়াও অ্যাপটির কথা শোনেননি।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের কাছে কেউ ভোট চাইতে আসে না, কেউ কিছু বলেও না। এইটা কী জিনিস আমি জানি না; কেউ বলেও নাই। আমার মোবাইল-টোবাইলও নাই।”
আবার সমাজে এগিয়ে থাকা মানুষরাও যে অ্যাপটি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়, তা স্পষ্ট হলো উন্নয়নকর্মী মেহেরুন নাহার মেঘলার কথায়।
তিনি বলছিলেন, “এই অ্যাপ নিয়ে কোনো প্রচার দেখলাম না, তাহলে জানব কীভাবে?”
স্মার্টফোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা না থাকায় নির্বাচনি অ্যাপ কেমন হয়ে থাকতে পারে সে সম্পর্কে ধারণাই নেই কাপড় বিক্রেতা মোজাম্মেল হোসেনের।
নারায়ণগঞ্জের এই বাসিন্দা বললেন, “আমার কেন্দ্র তো চাষাড়ায়; এবার কোন কেন্দ্র- বাড়ি গেলে হয়ত জানতে পারব।”
হাতে স্মার্টফোন থেকেও অ্যাপটি সম্পর্কে জানেন না অনেকেই।
তাদের একজন শিক্ষার্থী মনির হোসেন বলেন, “আজকে প্রথম শুনলাম নির্বাচনের কোনো অ্যাপ আছে। অন্য কারোর কাছ থেকে কিছু শুনিনি, যারা ভোট চাইতে আসে, তারা বাড়ি গিয়ে হয়ত বলে আসতে পারে।”
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কেন্দ্রভিত্তিক ভোট পড়ার হার দুই ঘণ্টা পরপর স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট অ্যাপে জানাবে ইসি।
তবে ভোটের দিন যদি ইন্টারনেটের গতি ধীর হয়, তবে এই অ্যাপ ব্যবহার করতে পারবেন না বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ভোটারদের কেউ কেউ।
যদিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল জানিয়েছেন, ভোট গ্রহণের দিন ইন্টারনেটের গতি ধীর হবে না।
বানোয়াট তথ্যে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা, বানোয়াট তথ্যে যাতে কেউ বিভ্রান্ত না হয়, সেজন্য তা যাচাই করে নিতে বলেছে ইসি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্য কোন মাধ্যমে নির্বাচন নিয়ে কোনও তথ্য পাওয়া গেলে তার সঠিকতা যাচাই করার জন্য নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট www.ecs.gov.bd অথবা অফিসিয়াল ফেইসবুক পেইজে নজর রাখতে অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাটি।
যা বলছে ইসি
সংস্থাটির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, “একটু দেরিতে হলেও এখন অনেকেই অ্যাপটি সম্পর্কে জানেন। ইসির ফেইসবুক পেইজ, অনলাইন, সোশাল মিডিয়ায় প্রচার করা হচ্ছে। ঘরে বসেই ভোটাররা নির্বাচনের সব আসনের তথ্য জানতে পারছে।”
অ্যাপটি নিয়ে ২০২২ সালের শেষ ভাগে পরিকল্পনা করা হলেও বাস্তবায়নে বেশ সময় পার হয়ে যায়। তফসিল ঘোষণার মাত্র দু’দিন আগে গত ১২ নভেম্বর নির্বাচনি অ্যাপ এবং অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমার পদ্ধতি (ওএনএসএস) চালু করে ইসি।
অ্যাপ উদ্বোধনের দেড়মাস পরে গত ১ জানুয়ারি ইসি সচিব জাহাংগীর আলম তথ্য হালনাগাদ করার কথা জানিয়ে বলেন, “ভোটকন্দ্রের তথ্য এখনই জানা যাচ্ছে, কার ভোটকেন্দ্র কোনটি এবং লোকেশন কোথায়। ইন্টারনেট গতি ধীর হবে না।
“যতগুলো মোবাইল নেটওয়ার্কিং সিস্টেম আছে, সবগুলোই ফুল স্পিডে চালু থাকবে। নির্বাচনি অ্যাপে প্রায় ৩৯০টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল; বাছাইয়ে টিকেছে ২৬টি।”