ঢাকা-১৭ আসনের উপ-নির্বাচন ‘বিধিসম্মত হয়নি’ দাবি করে পুনর্নির্বাচন দাবি করেছেন স্বতন্ত্র এই প্রার্থী।
Published : 23 Jul 2023, 03:29 PM
ঢাকা-১৭ আসনের উপ-নির্বাচনে ‘জালভোট ও অনিয়ম’ হয়েছে দাবি করে পুনর্নির্বাচন চেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী আশরাফুল হোসেন আলম ওরফে হিরো আলম।
সেইসঙ্গে প্রার্থীর নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতার জন্য তীব্র ভাষায় ঢাকার পুলিশ কমিশনারের সমালোচনা করেছেন তিনি।
পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়ে রোববার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে একটি চিঠি দিয়েছেন হিরো আলম। আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে ওই চিঠি পৌঁছে দেওয়ার পর তিনি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন।
উপ নির্বাচনে হিরো আলমকে নিরাপত্তা দিতে না পারার বিষয়টি স্বীকার করে ঢাকার পুলিশ কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক শনিবার বলেছিলেন, এই প্রার্থী যে দ্বিতীয়বার ওই কেন্দ্রে গেছেন, সেটি তাদের জানা ছিল না।
পুলিশ কমিশনারের ওই বক্তব্যকে ‘দুঃখজনক’ হিসেবে বর্ণনা করে হিরো আলম সাংবাদিকদের বলেন, “কমিশনার ফারুক স্যার যে কথাটা বলেছে তা খুবই দুঃখজনক, লজ্জাজনক। তার লজ্জা থাকলে এই কথা বলত না।
“কারণ একটাই, উনি বলেছে আমি নাকি একই কেন্দ্রে দুইবার গেছি। দৃষ্টি আকর্ষণ করতেছি, ভিডিও ফুটেজগুলো দেখবেন- আমি ওই কেন্দ্রে দুইবার গেছি কিনা। একবারই গিয়েছিলাম।”
গত ১৭ জুলাই ঢাকা-১৭ আসনে ভোটের দিন কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোটের পরিস্থিতি দেখছিলেন হিরো আলম। ভোটগ্রহণের শেষ দিকে বিকাল সোয়া ৩টার দিকে বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে তিনি হামলার শিকার হন।
ভোটকেন্দ্রের চৌহদ্দিতে স্কুলের মাঠে কয়েকজনের সঙ্গে সেলফি তোলেন হিরো আলম। তখন নৌকার ব্যাজধারী কয়েকজন এসে তাকে ঘিরে ধরেন এবং বলেন, ‘এটা টিকটক ভিডিও বানানোর জায়গা না’। এরপর হিরো আলমকে ধাওয়া শুরু করেন।
তখন কেন্দ্রটির দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা হিরো আলমকে ঘিরে ধরে স্কুলের গেইটের বাইরে দিয়ে আসেন। এরপর হিরো আলমকে সড়কে ফেলে বেধড়ক পেটানো হয়।
হিরো আলম ফের ওই কেন্দ্রে গেছেন, জানত না পুলিশ: ডিএমপি কমিশনার
নিরাপত্তা খুঁজে পাচ্ছি না: হিরো আলম
তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাটি আলোচনার জন্ম দেয়। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্রিফিংয়েও হিরো আলমকে মারধরের প্রসঙ্গ উঠে আসে। ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি গোয়েন লুইস টুইট করে উদ্বেগ জানান। বিবৃতি দিয়ে নিন্দা জানায় ঢাকায় ১২টি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মিশন। বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ১৪ দলের বৈঠকেও এ ঘটনা আলোচনায় আসে।
ওই ঘটনায় বনানী থানায় মামলা হওয়ার পর পুলিশ নয়জনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের মধ্যে চারজন বর্তমানে পুলিশ রিমান্ডে রয়েছেন।
শনিবার দুপুরে রাজধানীর পল্টনে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এ বিষয়ে কথা বলেন ঢাকার পুলিশ কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক।
তিনি বলেন, নির্বাচনের দিন তিন ভাগে পুলিশের দায়িত্ব ভাগ করা থাকে। কেন্দ্রের ভেতরে একটি দল ব্যালট বাক্স পাহারা দেয় এবং নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখে। বাইরে মোবাইল ডিউটিতে যারা থাকেন, তারা দেখেন কেউ (কোন ভোটার) বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছেন কিনা, মারামারি হচ্ছে কিনা। আর কেন্দ্রের বাইরে বা ভেতরে যে দল আছে, তারা কিছু সামাল দিতে না পারলে তখন ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ সেখানে যায়।
“হিরো আলমের ঘটনাটা, ওই কেন্দ্রে যখন সমস্যা হচ্ছিল, কেন্দ্রের পুলিশ তাকে বের করে দিয়েছে। বাইরে কী পরিস্থিতি ছিল, খুব সম্ভব সে (পুলিশ কর্মকর্তা) জানত না বাইরে কী অবস্থা। সে ভেতরেরটা দেখেছে। বাইরে পরিস্থিতি তার হয়ত ওভাবে জানা ছিল না। তারপরেও আমরা তদন্ত করে দেখছি আসলে তার বাইরের পরিস্থিতি জানা ছিল কি না।”
ডিএমপি কমিশনারের ওই যুক্তি খণ্ডন করে হিরো আলম রোববার বলেন, শুধু ভোটকেন্দ্র নয়, পুলিশের দায়িত্ব পুরো দেশের নিরাপত্তা দেওয়া।
“উনারা বলেছে নিরাপত্তা ভেতরে দেবে, বাইরে দেবেন না- এটা ভুল ধারণা। কারণ পুলিশ সারা বাংলাদেশে নিরাপত্তা দেবে এটাই পুলিশের কর্তব্য। পুলিশের দায়িত্ব ঢাকা-১৭ আসনের পুরো এলাকার নিরাপত্তা দেওয়া। অথচ দেখলাম আমাকে যারা মারধর করছে পুলিশ তাদেরকে বের করে দিচ্ছে আমাকে বের করে না দিয়ে। তাদের উচিত ছিল আমাকে সসম্মানে কেন্দ্রের ভেতর থেকে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া।“
“কেন্দ্রের বাইরে কি পুলিশের দায়িত্ব নেই”– এ প্রশ্ন রেখে স্বতন্ত্র এই প্রার্থী বলেন, “যখন আমাকে ওরা বেদম মারধর করছিল, তখন পুলিশের কর্তব্য ছিল আমাকে রক্ষা করা। তারা বিজিবি মোতায়েন করেছে, তারা আমাকে মারতে মারতে যখন বিজিবির গাড়ির কাছে নিয়ে গেল, তখন বিজিবির গাড়ি থেকে একটা লোকও নামল না। তারা আমাকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতা অর্জন করেছে। পুলিশ আমাকে কোনোদিনই নিরাপত্তা দিতে পারেনি।”
ঢাকা-১৭ উপ-নির্বাচন বাতিল এবং পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়ে ইসিতে জমা দেওয়া হিরো আলমের চিঠিতে বলা হয়েছে- সেদিন ভোটগ্রহণ শুরুর ১ ঘণ্টার মধ্যে একতারা প্রতীকের প্রার্থীর ৮৮ জন এজেন্টকে ১৯টি ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে ‘ব্যাপক জাল ভোট’ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়টি ভোটের দিনই ই-মেইলে নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়েছে।
“নির্বাচনের দিন বিকেল ৩ ঘটিকায় বনানী বিদ্যানিকেতন ভোটকেন্দ্রে প্রার্থী হিসেবে ভোটগ্রহণ পরিদর্শনে গেলে সরকারদলীয় ক্যাডারেরা আমাকে মারধর করে। যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ঘটনা, যা দেশ ও বিদেশের কোটি কোটি মানুষ ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছে, ওই ঘটনার পর বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে আমার এজেন্টদের জোরপূর্বক বের করে ভোট গণনা করা হয়েছে, যা নির্বাচনবিধির সম্পূর্ণ পরিপন্থি। আমার উপরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলা, ব্যাপক জাল ভোট ও ভোট গণনার অনিয়ম নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
“তাই এই নির্বাচন বিধিসম্মত হয়নি। এই প্রহসনের নির্বাচনকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল ঘোষণা করে পুনর্নির্বাচনের দাবি করছি। সেই সাথে আমার প্রতিপক্ষকে নির্বাচন বিধি লঙ্ঘনের দায়ে নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে তার বিরুদ্ধে যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।”
সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে হিরো আলম জানান, নির্বাচন বাতিল ও পুর্নির্বাচনের বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে গেলে তিনি নির্বাচন কমিশনে আবেদন করার পরামর্শ দেন। তবে এ বিষয়ে ইসির কোনো আশ্বাস তিনি পাননি।