পুরনো দুই রুটে ফের ডানা মেলার অপেক্ষায় বিমান

সবকিছু বিবেচনায় রোম রুট লাভজনক হবে বলেই আশা করছে বিমান; ফের নিউ ইয়র্কের আকাশে ওড়ারও চেষ্টা চলছে।

মাছুম কামালবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 25 Jan 2024, 08:39 PM
Updated : 25 Jan 2024, 08:39 PM

দেড় দশক পর ইউরোপের দেশ ইতালিতে ফ্লাইট চালু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।

বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শফিউল আজিম জানিয়েছেন, আগামী ২৬ মার্চ থেকে ঢাকা-রোম ফ্লাইট চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।

পরের মাস এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক রুটেও বিমানের ফ্লাইট চালু করা যাবে বলে তিনি আশা করছেন।

বিমানের রোম ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যায় ২০০৯ সালে, এখন আর বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ইতালিতে যাওয়ার কোনো ফ্লাইট নেই। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক এয়ারলাইন্সগুলো তাদের দেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে ইতালিতে পৌঁছে দেয়।

ইউরোপের বাইরের দেশগুলো থেকে ইতালিতে যাওয়া অভিবাসীর সংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। রোমের বাংলাদেশ দূতবাস জানাচ্ছে, ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত সর্বশেষ সমীক্ষা অনুযায়ী ইতালিতে নিয়মিতভাবে বসবাস করছেন এক লাখ ৫০ হাজার ৬৯২ জন বাংলাদেশি। ইইউভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে এটি সর্বোচ্চ।

২০০২ সালে ইতালিতে বাংলাদেশির সংখ্যা ছিল ২২ হাজার। অর্থাৎ ২০ বছরে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে সাত গুণ। ইতালি থেকে অভিবাসীরা যেসব দেশে রেমিটেন্স পাঠান, তার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়।

ইতালি থেকে যে পরিমাণ রেমিটেন্স বহির্বিশ্বে যায়, তার ১৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ আসে বাংলাদেশে। ২০২২ সালের ইতালি থেকে ১ হাজার ১৯৮ মিলিয়ন ইউরো রেমিটেন্স হিসেবে বাংলাদেশে আসে, যা ২০২১ সালে ছিল ১ হাজার মিলিয়ন ইউরো।

বাংলাদেশ থেকে ইতালির দূরত্ব প্রায় সাত হাজার ২৯৫ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে ইতালির রাজধানী রোমে যেতে গড়ে সময় লাগে ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা। বিমান কোনো ট্রানজিট না নিয়ে সরাসরি ফ্লাইট চালালে সেটা ১০ ঘণ্টায় নেমে আসবে।

বিমান এমডি শফিউল আজিম বলেন, “সব কিছু বিবেচনা করলে এই রুট লাভজনক হবে বলেই মনে হচ্ছে। ইতালিতে বসবাসকারী এবং বাংলাদেশ থেকে যাওয়া-আসা করা বাংলাদেশির সংখ্যাটা ৩ লাখের বেশি হয় বলে আমরা স্টাডি করে দেখেছি। বছরে তাদের কেউ কেউ একাধিকবার যাওয়া-আসা করেন।

“আমরা যদি সপ্তাহে তিনটা ফ্লাইট চালাই, তাতেও কভার করতে পারব না। তবে প্রাথমিকভাবে আমরা তিনটা ফ্লাইটের বেশি চালাব না। আমার এখানে একদম রেডি মার্কেট আছে।”

এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রীর সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে বলে জানান শফিউল আজিম।

তিনি বলেন, “উনিও লাভজনক রুটে ফ্লাইট চালুর বিষয়ে একমত। উনি আগেও বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। আমরা আশা করছি উনি বিমানের সীমানা বাড়াতে আরও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন।”

বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নতুন মন্ত্রী ফারুক খান গত ১৬ জানুয়ারি সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে অনেক উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আমার কাজ হবে আমার অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে এই উন্নয়ন কাজগুলোকে সঠিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া; বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের যাত্রী সেবা ও লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের মান আরো উন্নত করা এবং নতুন নতুন লাভজনক গন্তব্যে বিমানের রুট চালু করা।”

আগ্রহ আছে প্রবাসীদের

শামীম ইসলাম থাকেন ইতালির মিলান শহরে। তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলায়। রোমে বিমানের ফ্লাইট চালুর খবর তার কাছে ‘আনন্দের সংবাদ’।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমরা তো এখন অন্য বিদেশি এয়ারলাইন্সে যাতায়াত করি। সেই টাকাটা চলে যায় বিদেশে। বিমানের ফ্লাইট চালু হলে টাকাটা দেশেই থাকবে। সবচেয়ে বড় কথা সময়ও বাঁচবে। আমাদের চাওয়া থাকবে, সেবার মানটা যাতে ভালো হয়।”

চাঁদপুরের একই এলাকার ছেলে শাহপরান মানিক এখন থাকেন ইতালির রোমে। তার শহরে বিমানের ফ্লাইট চালুর খবর জানালে তিনি বললেন, “এখন বছরে এক-আধবার যাওয়া যাবে অন্তত। এটা ভালো সংবাদ।”

তবে মানিকের জিজ্ঞাসা, বিমানের রোম ফ্লাইট সরাসরি, নাকি ট্রানজিট হয়ে যাবে?

এর উত্তরে বিমানের সিইও শফিউল আজিম জানালেন, তারা এখনও বিষয়টি চূড়ান্ত করেননি। 

“আমরা কাতার হয়ে যাব, নাকি অন্য ট্রানজিট ব্যবহার করব, নাকি সরাসরি যাব– সেটা এখনো নিশ্চিত নয়। আমাদের যে টিম আছে, তারা এটা নিয়ে কাজ করছে।”

কেন বন্ধ হয়েছিল ঢাকা-রোম রুট

বিমানের পরিচালনা বোর্ডের সাবেক সদস্য ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ২০০৯ সালে রোমে ফ্লাইট বন্ধ করতে হয়েছিল, কারণ বিমানের কাছে তখন উপযুক্ত এয়ারক্রাফট ছিল না।

“তখন অনেক এইজ ওল্ড এয়ারক্রাফট ছিল। যেমন ডিসি-১০ বা এয়ারবাসের এ-৩১০; এসব এয়ারক্রাফট ওয়াজ নট সুইটেবল ফর রোম অপারেশন।”

সে সময় বিমানের বহরে পর্যাপ্ত উড়োজাহাজও ছিল না জানিয়ে ওয়াহিদুল আলম বলেন, “হ্যান্ডলিংয়ের কিছুটা অদক্ষতাও ছিল। মার্কেটিংটা ভালো ছিল না। এসব কারণে রোম বা ইউরোপের কোনো ডেস্টিনেশন বিমানের জন্য লাভজনক হতে পারেনি।”

বিমান এখন সেসব সীমাবদ্ধতা ‘অনেকটাই’ কাটিয়ে উঠেছে বলে মনে করেন এ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিউল আজিম। তিনি জানান, রোম ‍রুটে তারা ২৫০-২৭০ আসনের বোয়িং-৭৮৭ দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা করছেন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান (বেবিচক) এয়ারভাইস মার্শাল মো. মুফিদুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রোমে মার্চেই বিমানের ফ্লাইট শুরুর কথা আছে। এটা বিমানের নিজস্ব প্ল্যান। তারা যদি ইকোনমিক্যালি ভালো করতে পারে, আমি বলব ইট উইল বি গুড। তবে আমি বলব ভালোভাবে স্টাডি করতে, তারা এটা করেছে বলেই মনে হয়।”

নজর নিউ ইয়র্কেও

এখন ঢাকা থেকে লন্ডন, ম্যানচেস্টার আর টরেন্টো- এই তিন বড় রুটে ফ্লাইট চালাচ্ছে বিমান। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কেও চলতি বছর ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা করছে। সেজন্য গত বছর মে মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অথরিটি (এফএএ) বরাবর আবেদন করা হয়েছে।

শফিউল আজিম বলেন, “আমাদের বিমানবন্দরের যে সুবিধা, সেটি ক্যাটাগরি–১ এ উন্নীত হতে হবে। অন্য বিষয়গুলোও চলমান রয়েছে। আমরা গত মে মাসে চূড়ান্ত আবেদন করেছি। এখন তাদের ফেডারেল এভিয়েশন অথরিটি নিরাপত্তার বিষয়টি দেখছে। আশা করা যাচ্ছে আগামী এপ্রিলে ফ্লাইট চালু করা যাবে।”

তবে এক্ষেত্রে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষেরও অনেক কাজ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা আমাদের প্রসেস সবই করে রাখছি। কিন্তু নিউ ইয়র্কেরটা আমাদের ওপর ডিপেন্ড করছে না এখন। হযরত শাহজালাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের যে রানওয়ের ক্যাটাগরি বা সুযোগ-সুবিধা, এটা নিয়ে কিন্তু সিভিল এভিয়েশন কাজ করছে ফেডারেল এভিয়েশন অথরিটির সাথে।

“এফএএ টিএসএ আমাদের এখানে ইন্সপেকশন করে গেছে গত ডিসেম্বরে। আমাদের সব ধরনের কমপ্লায়েন্স, এগুলা মোর দ্যান পজিটিভ। আমরা আমাদের প্রিপারেশন নিয়ে রেখেছি। সিভিল এভিয়েশনের সাথে ফেডারেল এভিয়েশন অথরিটির যে বিষয়গুলা চলছে, এগুলো এপ্রিল থেকে সর্বোচ্চ জুনের মধ্যে ম্যাক্সিমাম স্যাটেল হয়ে যাবে বলে আমরা আশা করছি।”

ফ্লাইট পরিচালনায় ‘নিরাপত্তা দুর্বলতার’ কারণ দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অথরিটি (এফএএ) ২০০৬ সালে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বেবিচককে ক্যাটাগরি-২ নামিয়ে আনে। ফলে বিমানের নিউ ইয়র্ক ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যায়। নিউ ইয়র্কে ফ্লাইট পরিচালনা করতে হলে ক্যাটাগরি-১ মানের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে বেবিচককে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এয়ারভাইস মার্শাল মুফিদুর রহমান বলেন, “এটা আসলে একটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আমরা চেষ্টা করছি দ্রুত করতে। আমি বলব, আমাদের প্রস্তুতি নিয়ে আমরা স্যাটিসফায়েড। এফএএ'র আরও দুটো ভিজিট বাকি আছে। তারা ডেট দেবে কবে আসবে। আমরা আশা করছি, ওখানে শিগগিরই ফ্লাইট চালু হবে।”

এপ্রিল থেকেই নিউ ইয়র্ক ফ্লাইট চালুর বিষয়ে বিমান এমডির প্রত্যাশার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বেবিচক চেয়ারম্যান বলেন, “বিমান যদি এপ্রিল ধরে প্ল্যান করে থাকে, ভালো। তারা যদি আগে থেকে প্রস্তুতি শুরু করে, এটা ভালো। আমি সাধুবাদ জানাই।”