Published : 15 Dec 2022, 01:07 PM
বুয়েটছাত্র ফারদিন নূর পরশ ‘আত্মহত্যা’ করেছেন বলে যে দাবি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন করছে, তার ‘প্রমাণ’ দেখতে গোয়েন্দা পুলিশের দপ্তরে গেছেন তার সহপাঠীরা।
পূর্বঘোষিত প্রতিবাদ সমাবেশ স্থগিত করে জনা বিশেষ শিক্ষার্থী বৃহস্পতিবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে যান। বেলা দেড়টা পর্যন্ত তারা ভেতরেই ছিলেন।
গত ৪ নভেম্বর রাতে নিখোঁজ হওয়ার পর ৭ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল থেকে বুয়েটছাত্র ফারদিনের (২৪) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
পরদিন ময়নাতদন্তে হত্যার আলামত পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন চিকিৎসক। তিনি মাদক কারবারিদের হাতে খুন হয়েছেন বলেও সংবাদ মাধ্যমে খবর এসেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বরাতে।
তদন্ত নিয়ে পরিবার ও সহপাঠীদের হতাশার মধ্যে র্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশ বুধবার হঠাৎ করেই জানায়, ওই তরুণ আত্মহত্যা করেছিলেন বলে তারা এখন ধারণা করছেন।
ফারদিনের মৃত্যুর ঘটনাটির তদন্তভার গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে, পাশাপাশি ছায়া তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছিল র্যাব। এর আগে দুই সংস্থার ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যে বিভ্রান্তি ছড়ালেও বুধবার একই উপসংহারে পৌঁছায় র্যাব ও ডিবি।
দুই পক্ষই বলেছে, নিখোঁজ হওয়ার দিন ভোররাতে ডেমরার সুলতানা কামাল সেতু থেকে শীতলক্ষ্যা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ফারদিন।
গোয়েন্দা পুলিশেল পক্ষ থেকে বলা হয়, পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়া এবং বিদেশ যেতে অর্থ জোগাড় করতে না পারার হতাশা থেকে ওই তরুণ আত্মহননের পথ বেছে নেন।
‘আত্মহত্যা’ মানতে নারাজ ফারদিনের সহপাঠীরা, ‘কনভিন্সড’ নন বাবাও
বুয়েট ছাত্র ফারদিনকে হত্যা করা হয়েছে: ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক
ফারদিন খুন হননি, আত্মহত্যা: ডিবি-র্যাব
ফারদিন ডেমরা সেতু থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন: ডিবি
তবে সহপাঠী আর স্বজনরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওই নতুন ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি। ফারদিন আত্মহত্যা করেছেন– এটা মানতে নারাজ তার সহপাঠীরা।
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় বুয়েট শহীদ মিনারে প্রতিবাদ সমাবেশ ডেকেছিলেন শিক্ষার্থীরা।
ওই কর্মসূচিতে যাওয়ার আগে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তাদের ডেকে ফারদিনের আত্মহত্যার বিষয়টি নিয়ে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাদের ডাকে সাড়া দিয়েই শিক্ষার্থীরা পরে ডিবি কার্যালয়ে হাজির হন।
ফারদিনের সহপাঠী মো. শাফী বুধবার বিডিনিউজ টোয়েন্টফোর ডটকমকে বলেছিলেন, “পরীক্ষার ফলাফল বা সিজিপিএ নিয়ে ফারদিনকে আমরা কখনও ডিপ্রেসড দেখি নাই। ফারদিন মৃত্যুর আগে আমাদের সঙ্গে ১০ দিন একটা সার্ভে করেছে। সার্ভে শেষে পরীক্ষার আগের রাতে সারা ঢাকা ঘুরে ঘুরে সুইসাইড করেছে! এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? সুইসাইড করার জন্য তো বাসা আছে, হল আছে, নিজের রুম আছে। এত ঢং করে আত্মহত্যা করবে কেন?”
তিনি বলেন, “পুলিশ প্রায় দুই মাস ইনভেস্টিগেট করে গতকাল (মঙ্গলবার) ডিপার্টমেন্ট থেকে ওর রেজাল্ট শিট নিয়েছে। গতকাল রেজাল্ট নিয়ে আজকেই ডিক্লেয়ার করে দিল, এটা সুইসাইড। এটা তো প্রথম দিনই করতে পারত। এটা ডিক্লেয়ার করতে তো দুই মাস লাগার কথা না।”
বুয়েটের পুরকৌশলের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ফারদিন থাকতেন ঢাকার ডেমরার কোনাপাড়ায় পরিবারের সঙ্গে। বিতার্কিক হিসেবে এই বছরই স্পেনের এক অনুষ্ঠানে তার যাওয়ার কথা ছিল।
গত ৪ নভেম্বর দুপুরে কোনাপাড়ার বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন ফারদিন; বলে গিয়েছিলেন, পরদিন তার পরীক্ষা রয়েছে বলে রাতে বুয়েটের হলেই থাকবেন। পরীক্ষা দিয়ে বাসায় ফিরবেন।
সেদিন বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমতুল্লাহ বুশরা নামে এক বন্ধুর সঙ্গে ছিলেন তিনি। ওই তরুণীকে আসামি করে ফারদিনের বাবা মামলা করার পর তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
ফারদিনের মধ্যে সেদিন কোনো অস্বাভাবিকতা না দেখার কথা বুশরাও বলেছিলেন পুলিশকে।

তাকে উদ্ধৃত করে ডিবি কর্মকর্তা হারুন অর রাশিদ এর আগে বলেছিলেন, “বুশরার বক্তব্য হচ্ছে, তারা যতক্ষণ একসঙ্গে ছিলেন, ততক্ষণ ফারদিন স্বাভাবিকই ছিলেন। তারা রেস্তোরাঁয় খেয়ে নিজ নিজ বিল দিয়েছেন। তাকে রামপুরা নামিয়ে দিয়ে ফারদিন চলে যায়।”
শাফী বলেন, “বলা হচ্ছে, বিদেশ যেতে অর্থ জোগাড় করতে না পারার হতাশা থেকে আত্মহত্যা করেছে। টাকার জন্য বুয়েট শিক্ষার্থী কখনও আত্মহত্যা করতে পারে না। বুয়েট শিক্ষার্থীরা এতটা ‘গোবর’ নয়, রেজাল্ট দিয়ে জীবনকে জাজ করবে, ফারদিন তো অবশ্যই না। ডিবেটে তার পারফর্মেন্স দেখলেই এটা বোঝা যায়।
“প্রাথমিক পোস্ট মর্টমে ডাক্তার কিন্তু বলেছিল, তার গায়ে আঘাত, মাথায় আঘাত পেয়েছে। তখন বলা হয়েছে, এটা পরিকল্পিত হত্যা। দুই মাস পরে কেন সুইসাইড বলা হচ্ছে?”
সেই রাতে ৪ স্থানে ঘোরেন ফারদিন, যাত্রাবাড়ী থেকে ওঠেন লেগুনায়: ডিবি
ফারদিন যাত্রাবাড়ী গেলেন, লেগুনায় উঠলেন, তারপর? তদন্ত গতিহারা
হিসাব মেলাতে পারছেন না ফারদিনের সহপাঠী-স্বজনরা
মাশিয়াত জাহিন নামের ফারদিনের আরেক সহপাঠী বুধবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আত্মহত্যার বিষয়টি আমরা সহপাঠিরা কেউই বিশ্বাস করছি না।
“আমাদের একটা সার্ভে (জরিপ) করতে হয়েছিল, সেটা শেষ করে সে যায়৷ সেটি ১০ দিন সারারাত সারাদিন ফিল্ডে থেকে করতে হয়েছে৷ যারা তার সাথে ছিল, তারা সবাই ফারদিনকে উৎসাহ নিয়ে কাজ করতে দেখেছে। যার মধ্যে মরে যাওয়ার মোটিভ থাকবে, সে তো ১০ দিন ধরে এই উৎসাহ নিয়ে কাজ করত না।”
মাশিয়াত বলেন, “ডিবি যখন নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার কথা বলছে, তার কয়েক ঘণ্টা আগেও সে অন্য একজনের সাথে সময় কাটিয়েছে, খাওয়া-দাওয়া করেছে, কথা-বার্তা বলছে, কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা যায়নি।
“স্পেনে বিতর্ক করতে যাওয়া নিয়েও অনেক এক্সাইটেড ছিল। টাকা নিয়ে ডিবি যেটা বলছে সেটা সিভিয়ার কোনো সমস্যা না, ওটা ম্যানেজ হয়ে যেত, কোনো স্পন্সর ম্যানেজ হয়ে যেত। আর রেজাল্ট তেমন খারাপও ছিল না, ভালোও ছিল না (কোনো ফেইল ছিল না) কিন্তু সে সহ-শিক্ষা কার্যক্রমে তো এগিয়ে আছে৷ শুধু রেজাল্টের জন্য কখনোই সুইসাইড করার প্রশ্নই আসে না।”
আর ফারদিনের বাবা নূরউদ্দিন রানা বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, “ডিবি ও র্যাবের বক্তব্যে আমি কনভিন্সড না। রামপুরার পর ফারদিনের যেসব (সিসি ক্যামেরার) ভিডিও দেখানো হয়েছে তার কোনোটিই স্পষ্ট নয়।
“ডেমরার সুলতানা কামাল সেতু থেকে থেকে ফারদিন ঝাঁপ দিয়েছে বলে যে কথা বলা হচ্ছে তারও কোনো স্পষ্ট ভিডিও নেই। সেখানে ঢেউ দেখা যায়। কিন্তু ফারদিনই যে সেখান থেকে লাফিয়ে পড়েছে, তার গ্যারান্টি কী। এটা তো অন্য কেউ হতে পারে।”