অনেক পরিবহন কোম্পানি বাসের ভেতরে ট্রেনের মতো ‘ওপর-নিচ’ করে বিছানা বসিয়েছে। আবার কোনো বাসের নিচের তলায় ‘বিজনেস ক্লাস সিট’ আর ওপরে বিছানা বসিয়ে ‘স্লিপার’ হিসেবে চালানো হচ্ছে।
Published : 31 Dec 2023, 12:28 AM
লম্বা যাত্রায় আরামদায়ক ভ্রমণে এখন অনেকের পছন্দ বিলাসবহুল ‘স্লিপার কোচ’ ও দোতলা বাস। দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে চলছে এ ধরনের শতাধিক বাস। তবে অভিযোগ উঠেছে, আমদানি করা একতলা বাসের চেসিসের ওপরই কোনো অনুমোদন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই দোতলা কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।
যানবাহনের নিবন্ধন দেওয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তরফেই এ অভিযোগ তোলা হয়েছে। বলা হচ্ছে, সংস্থাটিরই কিছু অসাধু কর্মকর্তা নিজেরা লাভবান হতে যাচাই-বাছাই না করেই এসব বাসের নিবন্ধন দিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা-কক্সবাজার, ঢাকা-সিলেটসহ বিভিন্ন গন্তব্যে স্লিপার ও দোতলা বাস চলছে। অনেক পরিবহন কোম্পানি বাসের ভেতরে ট্রেনের মতো ‘ওপর-নিচ’ করে বিছানা বসিয়েছে।
আবার কোনো বাসের নিচের তলায় ‘বিজনেস ক্লাস সিট’ আর ওপরে বিছানা বসিয়ে ‘স্লিপার’ হিসেবে চালানো হচ্ছে।
বিআরটিএ এ ধরনের ১২৩টি বাসের তালিকা করেছে। তবে যারা এ ধরনের বাস তৈরি করছেন, তাদের দাবি তালিকার চেয়েও স্লিপার বাসের সংখ্যা এখন বেশি।
বাস মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বিষয়টি নজরে আনা হলে নড়েচড়ে বসেছে বিআরটিএ।
সিঙ্গেল ডেকার চেসিসে দোতলা
খাত সংশ্লিষ্টরা স্বীকার করেছেন, যেসব চেসিসের ওপর স্লিপার ও দোতলা বাস বানানো হচ্ছে সেগুলো সিঙ্গেল ডেক বাস তৈরির জন্য অনুমোদন পাওয়া। বাসের বডি বা পুরো কাঠামোর যার ওপর তৈরি হয় সেটিই চেসিস।
ঢাকার গাবতলী, মিরপুর, আমিনবাজার এলাকার বিভিন্ন গ্যারেজে এখন অর্ধ শতাধিক স্লিপার বাস তৈরির কাজ চলছে।
গাবতলীর এসএন বডি বিল্ডার্স সম্প্রতি দুটো দোতলা বাস তৈরি করে দিয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের বাস অপারেটর বলেশ্বর পরিবহনের জন্য।
ভারতীয় একটি কোম্পানির ১২ মিটার (১২ এমএফই) চেসিসের ওপর বাসের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। সম্পূর্ণ এসি বাস দুটির নীচতলায় রয়েছে ২৮টি আসন আর ওপরের তলায় ১৭টি বিছানা। বাসের সামনের দিকে একটি সিড়ি দিয়ে দোতলায় ওঠানামার ব্যবস্থা।
ওই কোম্পানির ওয়েব সাইটে ১২ এমএফই চেসিসের আসন ধারণক্ষমতা বিষয়ে লেখা রয়েছে- এগুলোতে দুই সারিতে দুটি করে ৪৫টি আসন বা দুই-এক ফরমেশনে ৩০টি ‘স্লিপার সিট’ করা সম্ভব। দোতলা কাঠামো করা যাবে এমন কথা বলা হয়নি। ১২ মিটার চেসিসের বাসের যেসব ছবি রয়েছে সেগুলো সব একতলা।
এসএন বডিবিল্ডার্সের মালিক হাফিজ উদ্দীন বলছেন, বাসের মালিকপক্ষ ইন্দোনেশিয়ার লাকসানা বাস বডি বিল্ডারের একটি ক্যাটালগ নিয়ে আসেন। সেটি দেখেই তারা দুটো বাসের কাঠামো তৈরি করে দিয়েছেন।
বাসগুলো নিরাপদ দাবি করে হাফিজউদ্দীন বলেন, “বাস ডেলিভারি নেওয়ার আগে ৪-৫ দিন ট্রায়াল হয়েছে। তখন খুব ভাঙা রাস্তায়, রাফলি চালানো হইছে, মোটামুটি গতিতে ইউটার্ন নেওয়া হইছে। আল্লার রহমতে কোনো সমস্যা হয়নি। মালিকপক্ষ সন্তুষ্ট হয়েই বাস বুঝে নিয়ে গেছে।”
দৃশ্যপটে মালিক সমিতি
দেশের বাস মালিকদের প্রধান সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলছেন এই বাসগুলো ঝুঁকিপূর্ণ।
“আমরাই বিআরটিএকে এ বিষয়ে সজাগ করি। যেকোনো কোম্পানির চেসিস দেশে আসার পর তার ‘টাইপ অ্যাপ্রুভাল’ নিতে হয়। অর্থাৎ ওই চেসিসের ওপর কত সিটের কোন ধরণের বডি বানানো যাবে তার একটা অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
“যে চেসিসগুলোর ওপর এখানকার কারিগররা দোতলা বাস বানিয়ে ফেলছে এগুলো দেশে এসেছে মূলত সিঙ্গেল ডেকার হিসেবে। এগুলোর কোনো টাইপ এপ্রুভাল ছিল না। এখন এগুলোকে দোতলা বানিয়ে তথাকথিত স্লিপার হিসেবে চালানো হচ্ছে। এগুলো শুধু যে অবৈধ তা নয়, এগুলো কিন্তু রিস্কিও।”
বিআরটিএ না দেখেই এগুলোর নিবন্ধন এবং রুট পারমিট দিয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, “বিআরটিএর কেউ না কেউ হয়ত না দেখেই তাদের স্বার্থের জন্য এগুলোর রেজিস্ট্রেশন আর রুট পারমিট দিয়েছে। আমরা বিষয়টি তাদের নজরে আনার পর এখন এগুলো নিয়ে এনকোয়্যারি হচ্ছে।”
এসব দোতলা বাস নিরাপদ, কাঠামো প্রস্তুতকারীদের এমন দাবির বিষয়ে এনায়েতুল্লাহ বলেন, “তারা বানিয়েছে, তারা তো বলবেই। আমরা বিআরটিএকে জানিয়েছি। এখন তারা এটা দেখবে।”
‘আমরা বানাইলেই দোষ’
মালিক সমিতির নেতা এনায়েতুল্লাহর বক্তব্যের জবাবে বাসের বডি প্রস্তুতকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অটোমোবাইল বডি ম্যানুফাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মোর্শেদ আলী বলছেন, বিদেশ থেকে আনা দোতলা বাস চলতে পারলে তাদের বাসও চলতে পারবে।
৪৪ বছর ধরে যানবাহনের বডি তৈরির অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এই ব্যবসায়ী বলেন, “বিদেশ থেকে আনা গাড়িগুলা চলতাছে কোন সমস্যা নাই আর বাংলাদেশে বানাইলে দোষ। আর দেশে যে খারাপ বানায় তাও না। আমাদের দেশে গাড়ি বানাইলে টাইপ অ্যাপ্রুভাল লাগবে আর বিদেশ থেকে আনলে লাগবে না এটা তো হইতে পারে না।
“যারা ভুল ধরার দায়িত্বে আছেন আমরা আশা করি আপনি আমারে ডাইকা ভুলটা শোধরাইয়া দেবেন, কীভাবে করলে ভালো হবে সেটা বইলা দেবেন। আপনি টাইপ অ্যাপ্রুভাল বোঝেন, বিআরটিএ বোঝেন আর এতদিন ধরে গাড়িগুলো চলতাছে সেইটা দেখেন না।”
বিষয়টি নিয়ে কেউ কখনো তাদেরকে বলেনি অভিযোগ করে মোর্শেদ আলী বলেন, “আমাগো কাছে এই বিষয়গুলো কেউ জানতেও চায় না। বিআরটিএর কাছে বুয়েটের এক স্যার একটা আইনের জন্য সুপারিশ করছে। পরে আমি যোগাযোগ কইরা কথা কইলাম। স্যাররে কইলাম, আপনারা বইপত্র পইড়া আইছেন। আমাগো যদি ডাইকা একটু ভুলটা ধরায় দেন, আমাগো লগে কথা কন, তাইলেই তো সমস্যার সমাধান হইয়া যায়।
“এখন শুনতেছি ১২৩ গাড়ির লিস্ট করছে। কেউ আমাগো একটা চিঠিও দেয়নি, একবার ডাইকা জিগায়ও নাই। কিন্তু এই ১২৩টা গাড়ির রেজিস্ট্রেশন তো বিআরটিএ দিছে।”
যা বলছেন বিশেষজ্ঞ
বুয়েটের অধ্যাপক পরিবহন বিশেষজ্ঞ এম শামসুল হক মনে করেন, সংখ্যায় অনেক বেড়ে যাওয়ার পর এই বাসগুলোকেও হয়তো বিআরটিএ বৈধতা দিতে বাধ্য হবে, যেভাবে এই দেশে বৈধ হয়েছে ‘কভার্ডভ্যান’ নামের মালবাহী যানগুলো।
তিনি বলেন, “আমি জানি না এটা ওরা কোন চেসিসের ওপর তৈরি করছে। যদি সিঙ্গেল ডেকার বাসের চেসিস এনে তারা সেটাতে ডাবল ডেকার বানায় তবে সেটা ঝুঁকিপূর্ণ তো বটেই।”
স্লিপার ও দোতলা বাসগুলোকে নিরাপদ দাবির বিষয়ে শামসুল হক বলেন, “যে ভুয়া কবিরাজ সেও তো বলে আমার কত রোগী ভালো হয়েছে। দেখার বিষয়, যথাযথ পরীক্ষার পর সেগুলো যাত্রী পরিবহনের জন্য নামছে কীনা।”
এই বিশেষজ্ঞও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর ওপর ক্ষোভ ঝেরেছেন।
“যারা অথরিটি তারা কুম্ভকর্ণ। তারা জানে না তাদের দায়িত্বটা কী। এদের ম্যানপাওয়ার, নলেজ কোনোটাই নেই। এখন পরিবহন খাতে নতুন নতুন ডাইমেনশন আসছে। তবে চারদিকে বিশৃঙ্খলা। হয়ত কভার্ড ভ্যানের মতো এই দোতলা বাসকেও একসময় কোন পরীক্ষা ছাড়াই বৈধতা দেবে তারা।”
বিআরটিএর ‘হুঁশ’
মালিক সমিতির কাছ থেকে বার্তা পাওয়ার পর সম্প্রতি এ ধরনের ১২৩টি বাসের তালিকা করে এগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনয়ি আইনি ব্যবস্থা নিতে সব বিভাগীয় কার্যালয়ে চিঠি দিয়েছেন বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) সীতাংশু শেখর বিশ্বাস।
গত ৪ ডিসেম্বর পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, “ঢাকা টু কক্সবাজারসহ একাধিক রুটে বিভিন্ন ব্যক্তি ও পরিবহন কোম্পানির ব্যানারের ১২৩টি বাস অবৈধভবে ডাবল ডেকার বা স্লিপার বাসে রূপান্তরিত করে রাস্তায় চলাচল করছে মর্মে অভিযোগ পাওয়া যায়। এই অথরিটির অনুমতি ব্যতিরেকে মোটরযানের এ ধরণের কাঠামো বা টাইপ পরিবর্তন করে ডাবল ডেকার বাসে রূপান্তর সড়ক পরিবহন আইনের পরিপন্থী।
তালিকায় উল্লেখিত ১২৩টি বাসসহ এ ধরণের যেসব বাস অনুমোদন ছাড়া ডাবল ডেকার বানিয়ে চালানো হচ্ছে সেগুলোর আমদানি সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই ও বাসগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে জানাতে বলা হয়েছে বিআরটিএর ওই চিঠিতে।
এ প্রসঙ্গে বিআরটিএর পরিচালক সীতাংশু শেখর বিশ্বাস বলছেন, সিঙ্গেল ডেকার গাড়িগুলোকে রূপান্তর করে দোতলা করা হয়েছে। এগুলো অবৈধ এবং বিপজ্জনক।
তাহলে কীভাবে বিআরটিএ বাসগুলোর নিবন্ধন ও রুট পারমিট দিল জানতে চাইলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রেজিস্ট্রেশনের সময় এভাবে নেয়নি তো। তখন তো সিঙ্গেল ডেকার বা একতলা বাস হিসেবে তারা রেজিস্ট্রেশন নিয়েছে। এরপরে সেগুলো তারা মডিফাই করেছে।”
তিনি জানান, বিষয়টি নজরে আসার পর বিআরটিএ এগুলো সরেজমিন পরিদর্শনের উদ্যোগ নিয়েছে। এরপরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।