১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ত্রয়োদশ সংসদ: ভোটে ‘খরচ নেই’ ২৮ দলের, ব্যয়ের হিসাব যাচাই করবে ইসি?

সবচেয়ে বেশি খরচ করেছে বিরোধী দলের আসনে বসা জামায়াতে ইসলামী।

মঈনুল হক চৌধুরী

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Jul 2026, 11:15 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:45 PM

দলীয় কোনো খরচ না করেই ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন পার করেছে ২৮টি দল। 

বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি, জাতীয় পার্টিরসহ ৫০টি দল ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেয়।

এসব দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খরচ করেছে জামায়াত, যারা ৬৮ আসন পেয়ে বিরোধী দলের আসনে বসেছে। আর খরচের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিএনপি প্রায় দুই দশক পর সরকার গঠন করেছে।

নির্বাচন কমিশন-ইসি দলীয় ব্যয়ের এই হিসাব যাচাই করে কি না এমন আলোচনা সামনে এসেছে।

রাষ্ট্র সংস্কারে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম বলছেন, নির্বাচনে ব্যয়ের হিসাব দল ও নির্বাচন কমিশনের তরফে জনগণকে জানানো দরকার।

এই নির্বাচন বিশ্লেষক বলেন, “এবার যেহেতু একটা পরিবর্তনের পরে ইলেকশনটা হল, আইনের মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে এসব বিষয়ে। আশা করি, বর্তমান ইসি একটু অন্যরকম চিন্তা করবে।”

২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর বদলে যাওয়া বাস্তবতায় মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকায় তাদের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে, যে কারণে এবারের নির্বাচনে নৌকা প্রতীক ছিল না।

নির্বাচনে বিএনপি ও তার মিত্ররা কয়েকটি আসনে সমঝোতা করেছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ‘১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য’ জোটগতভাবে নির্বাচন করেছে।

ভোটের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশের তিন মাসের মধ্যে দলের নির্বাচনি ব্যয়ের বিবরণী জমা দেওয়ার কথা। নির্ধারিত সময়ে অর্ধেক দল তাতে সাড়া না দেওয়ায় সময় বাড়ানো হয়। এরপর সাতটি দল ভোটের খরচের তথ্য জমা না দেওয়ায় সতর্ক করে নোটিস দেয় নির্বাচন কমিশন।

সবশেষ ২৭ জুলাই নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ৪৯টি দল নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাব বিবরণী জমা দিয়েছে। 

তবে এরই মধ্যে একটি দলের হিসাব বিবরণী জমা পড়ার তথ্য মিলেছে।

বুধবার জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “আশা করি, বর্ধিত সময়ে সব দলই ব্যয় রিটার্ন জমা দিয়েছে। আইন মোতাবেক যে যা ব্যয় করেছে তা-ই জানিয়েছে বলে মনে করি। 

“তা ইসি সচিবালয় ওয়েবসাইটেও তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। যদি কেউ না দিয়ে থাকে, ইসি সচিবালয় আইন মোতাবেক নোটিস দেবে।”

তিনি বলেন, যে দল যা ব্যয় করেছে, যত প্রার্থী দিয়েছে সে অনুপাতে ব্যয় করতে হবে। কোনো দল খরচ না করলে বা প্রার্থীকে অনুদান না দিলে সংশ্লিষ্ট দলের ‘ব্যয় রিটার্ন’ শূন্য হতে পারে।

ভোটে অংশ নেওয়া দলগুলোরও ব্যয়সীমা রয়েছে নির্বাচনি আইনে।

কোনো দলের প্রার্থী ২০০ জনের বেশি হলে সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা, প্রার্থীর সংখ্য ১০০ থেকে ২০০ জনের কম হলে ব্যয় করতে পারবে ৩ কোটি টাকা। কোনো দলের প্রার্থীর সংখ্যা ৫০ থেকে ১০০ হলে দেড় কোটি টাকা এবং ৫০ জনের কম হলে সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারবে।

৩০০ সংসদীয় আসনে এবার ভোটার রয়েছে ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের ব্যয়সীমা ছিল ২৫ লাখ টাকা। তবে আড়াই লাখের বেশি হলে জনপ্রতি ১০ টাকা হারে ব্যয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

এবার আড়াই লাখের নিচে ভোটার ছিল তিনটি আসনে; যেগুলোয় ২৫ লাখের বেশি অর্থ খরচ করার সুযোগ ছিল না।

দলগুলোর ব্যয়ের হিসাব বিবরণী পর্যালোচনায় দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি, প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে হিসাব দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটি প্রার্থী দিয়েছিল ২২৫ জন। 

এবার বিএনপি সর্বোচ্চ সংখ্যক ২৯১ আসনে প্রার্থী দিলেও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খরচের হিসাব দিয়েছে; দলটির ব্যয় ৩ কোটি ৮০ লাখ, ৮৯ হাজার ১৩৭ টাকা।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৮ জন প্রার্থী দিয়ে খরচ দেখিয়েছে প্রায় ৩৩ লাখ ৬৬ হাজার টাকা, জাতীয় পার্টি ২০০ প্রার্থী দিয়ে খরচ দেখিয়েছে ৫ লাখ টাকার বেশি।

নতুন দল এনসিপি ৩২ জন প্রার্থী দিয়ে ব্যয় দেখিয়েছে ১২ লাখ ৮৪ হাজার টাকা।

২২টি দলের মধ্যে সবচেয়ে কম, ৩ হাজার টাকা ব্যয় দেখিয়েছে বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল; দলটির প্রার্থী ছিল চার জন।

কেন খরচ নেই ২৮ দলের?

এবার ভোটে কোনো ধরনের দলীয় ব্যয় না করা দলের মধ্যে রয়েছে-লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি, জাকের পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, গণফোরাম, গণফ্রন্ট, বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, কল্যাণ পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, জাগপা, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট-বিএনএফ, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএম, বাংলাদেশ কংগ্রেস, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি-বিএসপি, নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি), বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি, জনতার দল ও বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টি।

ভোলার একটি আসনে জয় পেয়েছে বিজেপি। দলটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের দলের দুজন প্রার্থী ছিল। প্রার্থী হিসেবে ব্যক্তিগত নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাব নির্ধারিত সময়ে রিটার্নিং অফিসার ও ইসিতে দেওয়া হয়েছে। দলীয় কোনো ব্যয় ছিল না।” 

নতুন নিবন্ধিত দল বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি-বিএমজেপির আট জন প্রার্থী এবারের ভোটে ছিল; দলটির ব্যয় শূন্য।

বুধবার জানতে চাইলে বিএমজেপি সভাপতি সুকৃতি কুমার মণ্ডল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা দল থেকে কোনো সহায়তা বা অনুদান কোনো প্রার্থীকে দিইনি; তাই আমাদের কোনো ব্যয় ছিল না। 

“নির্বাচন কমিশনকে দলীয় নির্বাচনি ব্যয় নেই বলে জানিয়ে দিয়েছি। আমরা নতুন দল, আমাদের আর্থিক ব্যবস্থাপনাও স্বচ্ছ। যা ব্যয় হয় তাই উল্লেখ করি, আটজন প্রার্থী ছিল তাদের ব্যক্তিগত ব্যয়ের বিষয়টিও প্রতিবেদনে যুক্ত করে দিয়েছিলাম।”

গণসংহতি আন্দোলন ১৭ জন প্রার্থী দিলেও দলীয় কোনো ব্যয় হয়নি বলেছেন দলটির নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল। 

তিনি বলেন, “দল থেকে কোনো প্রার্থীকে অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল না, আমাদের দলের নির্বাচনি কোনো ব্যয় হয়নি। কোনো প্রার্থীকেও অনুদান দল থেকে দেওয়া হয়নি।”

ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার যুগ্ম সচিব মঈন উদ্দীন খান বলেন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-আরপিও, নির্বাচন পরিচালনা বিধি মেনে ও বাস্তবতার নিরিখে ভোটের ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হয়। কখনো কখনো প্রার্থী ও দল তাদের ব্যয় শূন্য দেখায়। নির্ধারিত ছকে ব্যয়ের রিটার্ন জমা দেন। এক্ষেত্রে বিষয়গুলো কমিশনে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে।”

“কেউ শূন্য ব্যয় দেখালে পরবর্তী কিছু করণীয় রয়েছে কিনা বা কোনো দল ব্যয় রিটার্ন জমা না দিলে কমিশন যে নির্দেশনা দেবেন সে অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব,” বলেন তিনি।

যাচাই হয় না ব্যয় বিবরণী

আরপিও অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনের ফলাফল গেজেট প্রকাশ পরবর্তী এক মাসের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ব্যয়ের হিসাব জমা দিতে হয়, দলের ব্যয়ের রিটার্ন দিতে হয় ৯০ দিনের মধ্যে।

ভোটের ব্যয় রিটার্ন বাস্তবভিত্তিক দেখানো হয় কিনা তা নিয়ে ‘সংশয়’ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম বলেন, “এখানে তহবিল ব্যবস্থাপনার অনেক দুর্বলতা রয়েছে। একটি হচ্ছে-দলগুলো যখন এগুলো (ব্যয় বিবরণী) দাখিল করে তখন ইসি ট্র্যাডিশনাল, অর্থাৎ শুরু থেকেই এটাকে গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করে। আর ওইটাই অ্যাকসেপটেড। 

“এটা নিয়ে আর কোনো ফারদার অডিট, যাচাই-বাছাই কোনো কিছু হয় না। এমনকি পার্টিগুলো কি কাগজপত্র দিচ্ছে, কি কাগজ দিচ্ছে না-এসব আমরা কেউই জানি না।”

তিনি বলেন, কীভাবে দলগুলো হিসাব দিচ্ছে তা পরিষ্কার করে জনগণকে বলা হয় না।

এ নির্বাচন বিশ্লেষক বলেন, “এবার যেহেতু একটা পরিবর্তনের পরে ইলেকশনটা হল, আইনের মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে এসব বিষয়ে। আশা করি, বর্তমান ইসি একটু অন্যরকম চিন্তা করবে। এ যে ২৬-২৭টা দলের কোনো খরচ নেই-কেন নেই, কী কারণে নেই তার ব্যাখ্যা, হিসাব তাদের কাগজে আছে কিনা জানি না। কিন্তু এটা পার্টি থেকে, কমিশন থেকে মানুষকে জানানো দরকার।”

আব্দুল আলীমের মতে, নির্বাচন চলাকালে ব্যয় তদারকির কোনো ব্যবস্থা না থাকা বড় দুর্বলতা।

তিনি বলেন, “একজন প্রার্থী, দল ভোটে খরচ করছে; এটা ওই সময় মনিটরিং করা উচিত। আইনে বলা হচ্ছে-তারা হিসাব রাখছে ডেইলি বেসিস। তখন কিন্তু কোনো মনিটরিং নেই। কাজেই বেশির ভাগ হয়ত খরচের হিসাব রাখেও না। 

“যেহেতু রাখে না এক ধরনের হিসাব দিয়ে দেয়, তা গৃহীত হয়ে যায়। আর যাচাই হয় না, কাজেই আমরা যা জমা দেবে গ্রহণযোগ্য, শূন্য খরচ দেখালেও কোনো সমস্যা নেই।”

নিবন্ধিত দলগুলোকে প্রতি পঞ্জিকা বছরের (জানুয়ারি-ডিসেম্বরের) আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দিতে হয় ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে। নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। দলগুলো ২০০৯ সাল থেকে আয়-ব্যয়ের প্রতিবেদন জমা দিলেও তা আর উন্মুক্ত করা হয় না।

ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচনের সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে জেল-জরিমানা করে। তবে ব্যয়সীমা ল্ঘন করছে কিনা, নিয়মিত ব্যয় মনিটরিং করার বিশেষ লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয় না।

তারা বলছেন, সংসদ নির্বাচনের সময় ব্যয় তদারকির কমিটির করার তাগিদ থাকলেও লোক স্বল্পতার কারণে বরাবরই তা উপেক্ষিত থাকে। দলগুলোর ব্যয় বিবরণী পেলেও তা যাচাইয়ের কোনো সিদ্ধান্ত নেই বর্তমান ইসির।

দলের নির্বাচনি ব্যয়ের খাতওয়ারি হিসাব প্রকাশ করা ও যাছাই করার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “দলের ব্যয়ের হিসাব তো ওয়েবসাইটেই প্রকাশ করা হয়। আইন মোতাবেক তো জমা দিয়ে থাকে। এখন এসব যাছাই-বাছাই তো আর করা হয় না।

“এখন নতুন পদক্ষেপের বিষয়ে আগাম কিছু বলা যাচ্ছে না।”

ভোটের বছরে বিএনপির আয় বেড়েছে, ব্যয়ও বেড়ে তিনগুণ 

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ব্যয় সাড়ে ৪ কোটি টাকা

ভোটের বছরেও জাতীয় পার্টির আয় আগের চেয়ে কমেছে

নির্বাচনি ব্যয়: কোন আসনে কত খরচ প্রার্থীদের

দলগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাব নিলেও প্রকাশে নারাজ ইসি

নির্বাচনি ব্যয়: কোন আসনে কত খরচ প্রার্থীদের

নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাব দিতে বিএনপি ও এনসিপিসহ ২৩ দলকে ইসির চিঠি