Published : 19 Jun 2026, 09:51 PM
ডেফল, বৈচি, ডেউয়া, আঁশফল, অরবরই, তৈকর, লুকলুকির মতো সচরাচর চোখে না পড়া ফলের সমাহার রয়েছে রাজধানীর খামারবাড়ি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন (কেআইবি) চত্বরে জাতীয় ফল মেলায়।
ক্রেতা-দর্শনার্থীরা মেলায় আসছেন, ফলগুলোর সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন, স্বাদ পরখ করতে কিনে বাসায় ফিরছেন।
মেলা আয়োজক কর্তৃপক্ষ বলছে, সেখানে ৬৭ স্টলে রয়েছে ১০৮ রকমের ফল। দেশের নানা অঞ্চলের ফল ছাড়াও রয়েছে বিদেশ থেকে আমদানি করা ফলও।
এসব ফলের সঙ্গে পরিচিত হতে শুক্রবার মেলায় আসেন একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা হাসান ইমাম মাসুম; সচরাচর পাওয়া যায় না এমন ফল চেনাতে সন্তানদের সঙ্গে আনার কথা বললেন তিনি।
মাসুম বলেন, “দেশের আনাচে কানাচে কত ধরনের ফল পাওয়া যায় এগুলো বাচ্চারা চেনে না। ডিজিটাল যুগে মোবাইল ল্যাপটপ নিয়ে আছে তারা। কিন্তু এ দেশে এত ধরনের ফল আছে আমাদের নিজস্ব, এগুলো দেখাতে তাদের নিয়ে আসা।
“তারা খুব আনন্দ পাচ্ছে। এত রকমের ফল যে পাওয়া যায়, তারা না দেখলে বিশ্বাস করতে পারত না।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তিন দিনের এ মেলা চলবে শনিবার পর্যন্ত।
শুক্রবার বিকালে মেলা ঘুরে দেখা যায়, কাউফল, ডেউয়া, গাব, বিলিম্বি, আতা, যজ্ঞ ডুমুর এবং লুকলুকির মতো সচরাচর না পাওয়া ফল রয়েছে। এ ছাড়া থাই ক্যাটিমন, হানি ডিউ, ব্যানানা আম, আপেল আম এবং চকাপাতের রাজা নামে আমদানি করা আমও রয়েছে।
মেলায় শাহরিয়ার এন্টারপ্রাইজের স্টলে দেখা মেলে বিরল জাতের মিয়াজাকি, চিয়ানমাই রেড পামার, দকমাই আম। আমগুলো শুধু ফল মেলায় প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে।
শাহরিয়ার এন্টারপ্রাইজের মালিক আনসার আলী বলেন, “ওই সব বিক্রি করছি না। কাস্টমারদের দেখানোর জন্যই দোকানে রাখা। ব্যানানা ম্যাঙ্গো, কাটিমন ও বারি-৪ জাতের আমের কিনতে পারছেন। এগুলোর বাণিজ্যিক চাষ করেছি।”
বিক্রেতারা বলছেন, আমের মধ্যে বেশি বিক্রি হচ্ছে হিমসাগর, গোপালভোগ, ল্যাংড়া, আম্রপালি, নাগ ফজলি, বারি-৪, হারিভাঙ্গা ও সূর্যপুরীর মত জনপ্রিয় আম। ব্যানানা আম নিয়েও ক্রেতাদের আগ্রহ রয়েছে। আকার ও মানভেদে প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

দিনাজপুরের ‘আলহামদুলিল্লাহ অ্যাগ্রো’ স্টলে ক্রেতাদের একজন রাশেদ বলেন, “বাজারে ব্যানানা ম্যাঙ্গোর দাম সাধারণত ১৫০ থেকে ২০০ টাকার নিচে পাওয়া যায় না। এখানে ১০০ টাকায় ভালো মানের আম পাওয়া যাচ্ছে।”
১১০ টাকা কেজিতে ‘থ্রি টেস্ট’ নামের আম কেনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “নিয়েছি দুই কেজি। এই আম কাঁচা অবস্থাতেই বেশ মিষ্টি এবং খোসাসহ খাওয়া যায়।”
নরসিংদীর ‘ঘোড়াশাল আনারস’ও ক্রেতাদের টানছে। ‘ন্যাচারস ফ্রুট’ স্টলের মালিক হাবিবুর রহমান নরসিংদীর পলাশ উপজেলার রাবান গ্রামে এ আনারস চাষ করেছেন।
তিনি বলেন, “ঘোড়াশাল খুব মিষ্টি। প্রচুর রস আছে। আমাদের এলাকায় অনেক বিক্রি হয়। এ মেলার মাধ্যমে ঢাকার বাজারে পরিচিত হচ্ছে। বিক্রি ভালো হলে এখানেও সাপ্লাই দিব। এ ধরনের মিষ্টি আনারস ভালো বাজার পাবে।”
জাতীয় ফল মেলায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের স্টলেই প্রায় ৫০টি বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় ফলের জাত প্রদর্শন করা হয়েছে। সেখানে কাউফল, করমচা, ডেউয়া, আঁশফল, গাব, যজ্ঞ ডুমুর, চাম্বুল, আতা, চালতা, অরবরই, বিলিম্বি, শরিফা, সাতকরা, তৈকর, ডেফল, লুকলুকি, বৈচি ও মুনিয়ার মত ফল দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করেছে।

আসাদগেট ফলবীথি হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. রুহিদ হাসান শুক্রবার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের স্টালের দায়িত্বে ছিলেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, মেলায় ১০৮ রকমের ফল এসেছে। এর মধ্যে ৫৫ জাতের আম রয়েছে, প্রায় ৫০ ধরনের বিরল ফল রয়েছে এখানে।
মেলায় মাশরুম ও কাঁঠাল থেকে তৈরি বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যও বিক্রি হচ্ছে।
দেশে প্রথম মাশরুমের চিপস্ তৈরির দাবি করে ‘টেস্টি মাশরুম’ স্টলের স্বত্বাধিকারী মেহেদী হাসান বলেন, “এই প্রোডাক্ট আমরাই প্রথম তৈরি করেছি। ছোট প্যাকেট ৩০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া মাশরুমের মিষ্টিও বিক্রি করছি।
“মাশরুম চাষে বিভিন্ন প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। ল্যাব ও অবকাঠামো তৈরিতে সহযোগিতা করেছে।”
টেস্টি মাসরুমের পাশেই রয়েছে কাঁঠালের খাদ্যপণ্য তৈরির উদ্যোক্তা সালমা আক্তারের স্টল। তিনি বলেন, “কাঁঠাল থেকে ২২ ধরনের পণ্য বানাই। কাশ্মীরি আচার, চিপস ও কাবাবও রয়েছে।”

কাঁঠালের তৈরি নানা খাবার দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে মেহেদী হাসান নামে কৃষিবিদ বলেন, “কাঁঠালের জুস, চিপস, আমসত্ত্ব যে তৈরি করার যায়, এই মেলায় না আসলে জানতামও না। আঁশফলসহ তিন-চার রকমের ফল দেখলাম, যেগুলো আমার মনেও নেই।”
মেহেদী হাসান বলেন, “অনেক ফলের সঙ্গে পরিচিত হলাম। হারিয়ে যাওয়া অনেক দেশি ফল দেখতে পেলাম। সব স্টল বাচ্চাদের ঘুরে ঘুরে দেখালাম। পুরাতন ফলের সঙ্গে নতুন অনেক ফল দেখলাম।
“পরিবার-বাচ্চাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্যই আসা। সবার আসা উচিত। কিনতে না পারলেও দেখলেই ভালো লাগবে।”
মেলায় ‘হর্টেক্স ফাউন্ডেশন’ স্টলে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ফাউজিয়া।
তার কথায়, “যারা ঢাকায় থাকে, তারা অনেক ফল সম্পর্কে জানে না। বিলুপ্তপ্রায় কিছু ফল আছে যেগুলো স্টলে রাখা আছে। বিক্রির চেয়ে দর্শনার্থীরা চিনতেছে, বাচ্চারা দেখতেছে। তারাও খুশি আমরাও খুশি।”