Published : 01 Jun 2026, 05:56 PM
পশ্চিম এশিয়া সংকটে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে সরকার ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে বলে ভাষ্য জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের।
তিনি বলেছেন, দেশে জ্বালানি তেলের মোট ব্যবহারের প্রায় ৬৬ শতাংশই ডিজেল।
“এটার পেছনে সবচেয়ে বেশি ভর্তুকি সরকারকে দিতে লাগে। কিন্তু তার পরেও এটা আনটাচড ফর প্রেজেন্ট, সাধারণ মানুষ যেন কোনোভাবে এফেক্টেড না হন।”
সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী অমিত এ কথা বলেন।
জুন মাসের জন্য অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়িয়েছে সরকার।
নতুন দর অনুযায়ী, প্রতি লিটার কেরোসিনের দাম ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ টাকা। তবে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকাই রাখা হয়েছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল সরবরাহে চাপে থাকার মধ্যে ১৮ এপ্রিল চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে অনেকখানি বাড়ায় সরকার। পরে ৩০ এপ্রিল সরকার আরেক আদেশে ওই দরই মে মাসের জন্য বহাল রাখে।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, “মে মাসে মূল্য সমন্বয় হয়নি; যেহেতু এপ্রিল মাসে একটা অ্যাডজাস্টমেন্ট করা হয়েছিল। আমরা একটা কথা বারবার বলবার চেষ্টা করেছি যে একান্ত যখন উপায়হীন হবে, সরকার তখনই এই ধরনের অপ্রিয় কিছু সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে।”
পরপর দুই দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর আবারও মূল্যবৃদ্ধির শঙ্কা আছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রতিমন্ত্রী অমিত বলেন, “আমরা তো আশাবাদী যে মিডল ইস্ট ক্রাইসিস অচিরেই রিজলভ হবে।
“আমি খুব দায়িত্ব নিয়েই বলতে পারি—যদি গ্লোবাল প্রাইস শার্পলি ডিক্লাইন করে, আমরাও খুব শার্পলি এটা অ্যাডজাস্ট করবার চেষ্টা করব।”
আলাপচারিতায় এক সাংবাদিক বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়লে দেশেও দাম বাড়ানো হয়, কিন্তু কমলে সেই অনুপাতে কমানো হয় না বলে জনমনে বিশ্বাস রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, “অতীতের অভিজ্ঞতাগুলো থেকে আমি এটুকু বুঝি যে মানুষের (অভিজ্ঞতা) সুখকর না, মানে বাড়ে যেভাবে, হয়তোবা সেভাবে কমে না।”
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবে বলে আশ্বাস দেন বিএনপি সরকারের জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী।
“যদি এই ক্রাইসিস ডিজলভ হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য কমে আসে, আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন, যেহেতু এটা নির্বাচিত সরকার, জনগণের প্রতি আমাদের একটি দায়বদ্ধতা রয়েছে, সেই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে জনগণের কষ্ট লাঘবের জন্য আমরা ত্বরিৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব,” বলছিলেন অমিত।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও সেই সময় দেশে মূল্য বাড়ানো হয় বলে সমালোচনা রয়েছে।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, “এ কথা তো কেউ বলছে না যে—যখন জ্বালানি তেলের মূল্য শতভাগ বৃদ্ধি পেয়েছিল, তখনও সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করেনি।”
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, জ্বালানি মূল্য নির্ধারণের সঙ্গে সরকারের সামগ্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনাও জড়িত।
“আমরা স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে চাই, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করতে চাই, অসচ্ছল পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দিতে চাই, কৃষকদের ফার্মার্স কার্ডের আওতায় আনতে চাই। এইগুলোর জন্য যদি সমস্ত অর্থের একটি বৃহৎ অংশ ভর্তুকির পেছনে ব্যয় হয়ে যায়, তাহলে প্রত্যেকটা সেক্টর এফেক্টেড হবে।”
তিনি বলেন, “যখন স্কোপ থাকে তখন কিছু রি-অ্যাডজাস্টমেন্ট হয় এবং এটা হতেই হয়, সব সেক্টরগুলোকে সচল রাখার জন্য।”
পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ২১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে পিডিবি। এ নিয়ে সম্প্রতি গণশুনানি করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে প্রতিমন্ত্রী অমিত বলেন, বিষয়টি বিইআরসি’র এখতিয়ারভুক্ত।
“আসলে বিইআরসি এটা নিয়ে কাজ করে, আমরা কাজ করি না। এখানে প্রপোজাল তো অনেক কিছুই থাকতে পারে, কিন্তু দিনশেষে একটা শুনানি হয়। সেই শুনানির পরিপ্রেক্ষিতে এটা চূড়ান্ত হয়।”
তিনি বলেন, “বিইআরসির যে ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছিল, সেই ক্ষমতা তো আমরা আবার ফিরিয়ে দিয়েছি পার্লামেন্টে। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো আলোচনা হয়নি।”
ভর্তুকির চাপ কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাওয়ার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অমিত।
তিনি বলেন, “উচ্চমূল্যের এই পাওয়ার প্লান্টগুলোকে যদি আমরা আস্তে আস্তে রিনিউয়েবল এনার্জি দিয়ে রিপ্লেস করতে পারি, তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমে যাবে। উৎপাদন ব্যয় কমে গেলে সরকারের ভর্তুকি যেমন কমবে, গ্রাহকরেও আমরা সাশ্রয় মূল্যে বিদ্যুৎ দিতে পারব।”
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
“আমরা অফশোর বিডিংয়ে গেছি। ইস্টার্ন রিফাইনারি সেকেন্ড ইউনিটের জন্য আমরা পিএমসি কনট্র্যাক্ট ওপেন করেছি।”
শিল্প খাতে গ্যাস সংকটের কথা স্বীকার করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “বহু ইন্ডাস্ট্রি হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বসে রয়েছে। ইন্ডাস্ট্রিগুলো গ্যাস পেলে কর্মসংস্থান হবে, ইকোনমির রোল ওভার করবে।”
রাতারাতি গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, “কারণ এই ইনফ্রাস্ট্রাকচার নেই আমাদের। এখানে দুটো এফএসআরইউ (ভাসমান টার্মিনাল ও পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরকরণ ইউনিট) রয়েছে। প্রয়োজন হলে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম এফএসআরইউ স্থাপনের বিষয়েও আমরা কাজ করছি।”
ঈদে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে গ্রামগঞ্জের মানুষের অভিযোগের প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী অমিত বলেন, সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো হলেও তিনি নিজে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন।
“যাদেরকে আমরা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে পেরেছি, আলহামদুলিল্লাহ, সেটা হয়তো একটা তৃপ্তি এনেছে। কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় ঈদের আগে, ঈদের সময় এবং ঈদের পরে কালবৈশাখী ঝড় হয়েছে, ভারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। সেখানে পল্লী বিদ্যুতের লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত লাইন মেরামতে সময় লাগায় কিছু এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।
ঈদের সময় বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকার ঘটনাকে সব ক্ষেত্রে ‘লোড শেডিং’ বলা ঠিক হবে না বলেও মন্তব্য করেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী।
“লোড শেডিং বলতে আমরা কী বুঝাচ্ছি? চাহিদা এবং সরবরাহের মধ্যে যখন ঘাটতি থাকে, তখন পরিকল্পিতভাবে কোনো জায়গায় যদি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়, সেটাকে লোড শেডিং বলে। চাহিদা এবং সরবরাহের মধ্যে কোনো ঘাটতি নেই; কিন্তু এর পরেও যদি কোনো জায়গায় বিদ্যুৎ না থাকে, সেটা টেকনিক্যাল ফল্টের জন্য হতে পারে, লাইনের ফল্টের জন্য হতে পারে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও হতে পারে,” বলছিলেন অমিত।
বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় বেশি রয়েছে ভাষ্য জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর।
তিনি বলেন, “আমাদের ক্যাপাসিটি হচ্ছে প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু সর্বোচ্চ উৎপাদন আমরা ১৭ থেকে ১৮ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত করি।”
অমিতের ভাষ্য,চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা থাকার পরও ঝড়, বৃষ্টি বা কারিগরি ত্রুটির কারণে কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হতে পারে।
“বাংলাদেশের মানুষ কষ্ট পাচ্ছে, আমরাও কষ্টের মধ্যে আছি। এই কষ্ট থেকে তাদেরকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আমরা কাজ করছি।”
তিনি বলেন, “আমার মধ্যে এই অস্বস্তি এবং অতৃপ্তি কাজ করেছে যে, ঈদের ছুটিটা কিছু কিছু জায়গায় এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আমরা বিদ্যুৎ সরবরাহটা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে পারিনি। এটাও আমাদের একটা মনোবেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”