Published : 15 Sep 2025, 09:27 AM
কিশোরগঞ্জের সাবেক সাংসদ ফজলুর রহমানের বাসার সামনে অশোভন স্লোগান দিয়ে আলোচনায় আসা তমা ফের আলোচনায় এসেছেন চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে।
পুলিশ ও মামলার বিবরণ অনুযায়ী, বুধবার মধ্যরাতে (সোয়া ১টার দিকে) রাজধানীর উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ৬ নম্বর রোডের একটি বাসায় প্রবেশ করে তমাসহ কয়েকজন নিজেদের সমন্বয়ক বলে পরিচয় দেন। তারা গার্মেন্ট ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেনকে মামলা থেকে অব্যাহতি পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। রাতেই তাদের সাড়ে ৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করে দেয় পরিবারটি। বাকি সাড়ে চার লাখ টাকা বিকাল ৪টার মধ্যে দিতে হবে বলে শাসিয়ে তারা ফজরের আজানের দিকে ওই বাসা থেকে চলে যান।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার পরিবারটির তরফে উত্তরা পশ্চিম থানায় চারজনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা দুজনকে আসামি করে মামলা করেন দেলোয়ার হোসেনের শ্যালক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ।
মামলা দায়েরের পর ওইদিন রাত ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে আসামি এ এইচএম নোমান রেজাকে বিমান বন্দর থানার সামনে থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী রাত ৩ টা ৪০ মিনিটের তানজিল হোসেন ও ফারিয়া আক্তার তমাকে বিমান বন্দর থানার জসিম উদ্দিন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে আসামি নিলয় এবং অজ্ঞাতনামা দুই আসামি এখনো অধরা রয়েছেন। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা।
এদিকে গ্রেপ্তারের পর শুক্রবার তিন আসামিকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার এসআই আব্দুল মালেক খান। আসামিদের পক্ষে তাদের আইনজীবী জামিন চেয়ে আবেদন করেন।
ঢাকার মহানগর হাকিম মেহেদী হাসান জামিন আবেদন নাকচ করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। আগামী ১৬ অক্টোবর মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ঠিক করা আছে।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আব্দুল মালেক খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মামলা দায়েরের পর অভিযান চালিয়ে এখন পর্যন্ত এজাহারনামীয় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চাঁদাবাজির চার লাখ ৩০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
“বাকি টাকা উদ্ধারে অভিযান চলছে। অজ্ঞাত দুই আসামির পরিচয় সনাক্তে কাজ চলছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
মামলার বাদী রিয়াজ উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রাতটা আমাদের জন্য ছিল মানসিক টর্চারের একটা রাত। রাত ১টার পর সমন্বয়ক পরিচয়ে পুলিশ নিয়ে ধস্তাধস্তি করে তারা বাসায় প্রবেশ করে। রাত দেড়টার দিকে আমার ভাগ্নি আমাকে ফোন দেয়। আড়াইটার দিকে আমরা ওই বাসায় পৌঁছাই।”
তিনি বলেন, “তারা ৬ জন চাঁদাবাজি করতে আসে। দুজন ছিলে ইনডোরে, চারজন আউটডোরে। সাথে ৫/৬ জন পুলিশও নিয়ে যায়। পুলিশেরা ছিল অসহায়। তারা বলছে, তাদের কিছু করার নেই। তারা (সমন্বয়করা) মামলা করেছে। আসামি ধরতে তাদের নিয়ে এসেছে। কী রাজত্ব তাদের! তারা কিছুই মানছিল না। কারো সাথে যোগাযোগ করতে দিচ্ছিল না।
“সেনাবাহিনী, পুলিশ তাদের কাছে কিছু না বলে হুমকি দেয়। কী পাওয়ার ওদের! কোন দেশে যে বসবাস করছি! ফজরের আজান পর্যন্ত তারা বাসায় অবস্থান করে। সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে ভোর সাড়ে চারটার দিকে বাসা ছাড়ে। লোকজন আসার আগে বেরিয়ে যায়। চাঁদাবাজিতে নোমান নেতৃত্ব দেয়। আর তমা পরে বাসায় প্রবেশ করে সবকিছু সার্চ করে।”
পুলিশের উপস্থিতিতে চাঁদাবাজিতে পুলিশের কারা ছিলেন, এ প্রশ্নের উত্তরে তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুল মালেক খান বলেন, “মামলার তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাচ্ছে না।”
বাদী রিয়াজ উদ্দিন বলেন, “শুনেছি, সমন্বয়ক পরিচয়ে তারা বিভিন্ন জনকে টার্গেট করে চাঁদাবাজি করে। আমরা নন পলিটিকাল। আমার ভগ্নিপতি একজন সমাজসেবক।
“তাকে টার্গেট করে চাঁদাবাজি করেছে। আমরা তাদের বিরুদ্ধে কমপ্লেইন করেছি। আশা করছি, পুলিশ যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।”
রিয়াজ উদ্দিন তার মামলার অভিযোগে বলেন, নোমান রেজা জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক একটা হত্যাচেষ্টা মামলা করেছিলেন বিমানবন্দর থানায়। মামলায় দেলোয়ার নামে একজনকে আসামি করা হয়। সেই সূত্র ধরে গার্মেন্ট ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেনকে আসামি দেলোয়ার হিসেবে পুলিশে দেওয়ার জন্য উত্তরা পশ্চিম থানার ১৩ নম্বর সেক্টরে গিয়ে তাকে খোঁজ করে। তখন তাদের জানানো হয়, তারা বাসায় নেই। তখন পুলিশ চলে যায়।
এজাহার অনুযায়ী, ভাগ্নির ফোন পেয়ে রাতেই ওই বাসায় যান বাদী এবং তার ছেলে মুন্না। পরবর্তীতে নোমান রেজা, তানজিল, তমা, নিলয়সহ অজ্ঞাতনামা দুইজন রাত ১টা ১০ মিনিটের দিকে বাসায় জোর করে প্রবেশ করে। নোমান রেজা নিজেকে সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে পরিবারটিকে জানায়, ‘পুলিশের অগোচরে’ দেলোয়ার হোসেনকে মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করবে। রিয়াজ উদ্দিন জানতে চান, দেলোয়ার হোসেন জড়িত থাকার কি সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে? সাক্ষ্যপ্রমাণ দেখাতে বললে নোমান রেজা ও তার সহযোগীরা অকথ্য ভাষায় কথাবার্তা বলতে থাকে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, মুন্না এগিয়ে গেলে আসামিরা তাকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দিতে থাকে। দেলোয়ার হোসেনকে মামলা থেকে অব্যাহতি পেতে ১০ লাখ টাকা দিতে হবে বলে জানায়। আসামিদের হুমকির মুখে বিভিন্ন জায়গা থেকে তাদের সাড়ে ৫ লাখ টাকা জোগাড় করে দেওয়া হয়। এরপর নোমান রেজা হুমকি দেন, বিকালের মধ্যে সাড়ে চার লাখ টাকা না দিলে তাদের ক্ষতি হবে।
আসামিপক্ষের আইনজীবী এ এইচ এম আশিক বলেন, “আসামিদের সাথে কথা বলতে পারিনি, এমনকি তাদের দেখতেও পারিনি।
“তবে আমার যেটুকু ধারণা, তাদের ফাঁসানো হয়েছে। তারা মামলা করেছে, আসামি ধরতে পুলিশ নিয়ে সেখানে গেছে।”
আসামি ধরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব কি তাদের? এ প্রশ্নের উত্তরে এ আইনজীবী বলেন, “সমন্বয়করা বেশিরভাগই এটা করেছে।
“মামলাটা তেমন স্টাডি করতে পারেননি। পরে বিস্তারিত জানাতে পারব।”
তবে আশিক দাবি করেন, “তমা অসুস্থ। ৯ সেপ্টেম্বর ডাক্তার দেখিয়ে রাতে বাসায় যায়।”
কী ধরনের অসুস্থতায় ভুগছেন তমা? এ প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি আইনজীবী আশিক।
তিনি বলেন, “বড় একটা প্রেশক্রিপশন দেখলাম। তবে ভালোভাবে পড়তে পারিনি।”