Published : 03 Jul 2026, 11:07 PM
জুনের শেষভাগে কিছুদিন গভীর রাতেও লোডশেডিং তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গিয়েছিল; পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে বিদ্যুৎমন্ত্রীকে জাতীয় সংসদে তার ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে।
সক্ষমতা থাকার পরেও কেন এই অবস্থা হল? জুলাই-অগাস্টেও যাতে এ ধরনের সংকট না হয়, সে প্রস্তুতি কি আছে?

আগের দুই জুনে তুলনায় এবার বেশি লোডশেডিংয়ের কারণ তুলে ধরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বলছে, গ্যাস ও তরল জ্বালানি সংকট, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়া, কারিগরি ত্রুটি এবং আর্থিক চাপ মিলিয়ে জুনের শেষ দিকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হয়।
২৮ জুন টাঙ্গাইল, ঝালকাঠি ও ঢাকার দোহারে লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে মানববন্ধন, মহাসড়ক অবরোধ ও বিদ্যুৎ কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভের খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
মাসে সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হয় সেদিন রাত ২টায়, ৩ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। পরদিন সংসদে বিবৃতিতে দিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং জ্বালানি সরবরাহে সমস্যার কারণে এতটা লোড শেড করতে হয়েছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টার (এনএলডিসি) এর দৈনিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে করে দেখা যায়, জুনের শেষ দিকে গ্যাস, তরল জ্বালানি ও কয়লা সরবরাহের চাপের সঙ্গে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়ে।
এনএলডিসির তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে মোট বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১০ হাজার ৭৭৬ দশমিক ২৭৫ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১০ হাজার ২৪৪ দশমিক ৮৪৮ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা।
চাহিদা থাকলেও যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়নি, এনএলডিসির ভাষায় তাকে বলা হয় ‘এনার্জি আনসার্ভড’। জুনে এর পরিমাণ ছিল ৫৩১ দশমিক ৪২৭ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা।
এর মধ্যে ১ থেকে ১০ জুন সরবরাহ না হওয়া বিদ্যুৎ ছিল ৪৩ দশমিক ৩৯৬ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা। ১১ থেকে ২০ জুন তা বেড়ে হয় ২১৭ দশমিক ৫৩৫ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা। ২১ থেকে ৩০ জুন তা আরো বেড়ে দাঁড়ায় ২৭০ দশমিক ৪৯৬ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টায়।
অর্থাৎ জুনে বিদ্যুতের মোট ঘাটতির প্রায় ৯২ শতাংশই হয়েছে শেষ ২০ দিনে। এতে বোঝা যায়, মাসের শুরুতে সংকট তুলনামূলক কম থাকলেও মাঝামাঝি সময়ের পর ঘাটতি দ্রুত বেড়েছে।

কেন এই ঘাটতি
পিডিবি চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিদ্যুৎ উৎপাদনে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। গ্যাসের সরবরাহ কমেছে, কয়লাভিত্তিক উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এর মধ্যে কখনও কয়লা সরবরাহে সমস্যা হয়, আবার কারিগরি কারণেও কোনো কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয়।”
আর্থিক সংকটও একটি বড় বিষয় বলে স্বীকার করেন পিডিবি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, “ফাইন্যান্সিয়াল ইস্যু একটা বড় ইস্যু। এগুলো আমরা অনেকটাই কাভার করে আসছি। আস্তে আস্তে ঠিক হবে।”
বকেয়া বিলের বিষয়ে রেজাউল করিম বলেন, পিডিবির বকেয়া আছে; তবে তা আগের তুলনায় কমিয়ে আনা হচ্ছে। তিনি বলেন, “বকেয়া তো আছেই। এটা নতুন কিছু না। বরং আগের তুলনায় আমরা বকেয়া কমিয়ে নিয়ে আসছি। রাতারাতি এটা অ্যাড্রেস করা সম্ভব না।”
‘একটি কারণে সংকট হয়নি’
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, জুনের শেষ দিকে লোডশেডিং বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে।
তিনি বলেন, “কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ ছিল। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এসএস পাওয়ারে জ্বালানি স্বল্পতা ছিল। রামপালের দুটি কেন্দ্র পরপর বন্ধ হয়েছে। এজন্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে।
জরুল ইসলাম বলেন, “গ্যাসের জেনারেশনও কিছুটা কম ছিল। পেমেন্ট বাকি ছিল। সব মিলিয়ে ওভারঅল ইমপ্যাক্ট এসেছে।”
অর্থাৎ তরল জ্বালানি ও গ্যাস সংকট, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বিগড়ে যাওয়া ও কয়লা সরবরাহের সমস্যার কারণে বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল জুন মাসে।
এখন সেই পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে দাবি করে পিডিবির এই সদস্য বলেন, “বন্ধ থাকা কেন্দ্রগুলো উৎপাদনে ফিরেছে এবং গ্যাসের সরবরাহও বাড়ানো হয়েছে।”
তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এসেছে।
“নিকট অতীতে কাছাকাছি সময়ে গ্যাস থেকে এত (বিদ্যুৎ) জেনারেশন করা যায়নি।”
পেট্রোবাংলা পিডিবিকে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট-এমএমসিএফডি গ্যাস দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তুলে ধরে জহুরুল ইসলাম বলেন, ওই গ্যাস সরবরাহ বাস্তবে কত দিন ধরে রাখা যাবে, তা নির্ভর করবে গ্যাসের প্রাপ্যতা ও অগ্রাধিকার বণ্টনের ওপর।

গভীর রাতেও বড় লোডশেডিং
জুনের প্রথম ১০ দিনে কোনো ঘণ্টায় লোডশেডিং এক হাজার মেগাওয়াট ছাড়ায়নি। ওই সময়ে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৭ জুন বিকাল ৩টায়, ৬৮৩ মেগাওয়াট।
এরপর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়। ১৪ জুন রাত ১১টায় লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ১৭২ মেগাওয়াট। ১৬ জুন রাত ৯টায় ছিল ২ হাজার ৮৪৬ মেগাওয়াট। ১৭ জুন রাত ১২টায় তা ৩ হাজার ২৭৫ মেগাওয়াটে ওঠে।
মাসের সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হয় ২৮ জুন রাত ২টায়, ৩ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। ওই দিন রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টায় লোডশেডিং তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি ছিল।
মাসজুড়ে রাত ১২টা থেকে ভোর ৩টার মধ্যে গড় লোডশেডিং ছিল এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি। রাত ১২টা, ১টা, ২টা ও ৩টায় গড় লোডশেডিং ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ২৩৯, ১ হাজার ১৩১, ১ হাজার ১১৯ এবং ১ হাজার ২২ মেগাওয়াট।
সাধারণত মধ্যরাতের পর বিদ্যুতের চাহিদা কমে। কিন্তু জুনের শেষ দিকে কয়েক দিন গভীর রাতেও চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি ছিল। ফলে সংকটটি শুধু সন্ধ্যার পিক সময়ের মধ্যে সীমিত ছিল না; রাতের কম-চাহিদার সময়েও ঘাটতি বড় হয়ে ওঠে।
রাত ১২টার পর চাহিদা বেশি থাকার কারণ জানতে চাইলে পিডিবির সদস্য জহুরুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে তাদের নিজস্ব কোনো কারিগরি গবেষণা নেই।
তবে তিনি বলেন, “আমরা কয়েকটা জিনিস ‘অ্যাসেস’ করি। এর মধ্যে একটা হচ্ছে, রাত ১২টার পর থেকে ৩টা-৪টা পর্যন্ত মানুষ ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার চার্জ দেয়, বিশেষ করে ঢাকায়। লোডটা কমে না।”

‘বিশ্বকাপও চাহিদা বাড়িয়েছে’
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস বা আইইইএফএ-এর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, জুনের মাঝামাঝির পর বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়াও লোডশেডিং বাড়ার বড় কারণ।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, জুনের ১ থেকে ১১ তারিখ পর্যন্ত চাহিদা তুলনামূলক কম ছিল। কিন্তু ১১ বা ১২ জুনের পর ২৪ ঘণ্টার বিভিন্ন সময়ে চাহিদা বেড়ে যায়।
তার ব্যাখ্যা, চাহিদা ১৬ হাজার থেকে সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে থাকলে সরবরাহ করা তুলনামূলক সহজ হয়। কিন্তু চাহিদা ১৭ হাজার থেকে সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট ছাড়ালে সরবরাহে চাপ তৈরি হয়।
রাতের চাহিদা বেশি থাকার পেছনে ফুটবল বিশ্বকাপেরও ভূমিকা আছে বলে মনে করেন তিনি।
শফিকুল বলেন, “বিশ্বকাপ একমাত্র কারণ নয়; তবে এর প্রভাব আছে। রাত ১২টার পর, কখনও রাত ২টা বা ভোরের দিকে খেলা থাকায় মধ্যরাতের পর বিদ্যুতের চাহিদা যেভাবে কমার কথা, তা কমেনি।”
তিনি বলেন, ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার চার্জিংয়ের কারণেও রাতে বিদ্যুতের চাহিদা আগের মতো কমে না। কয়েক বছর আগেও রাত ১২টার পর চাহিদা অনেকটা কমে যেত। এখন সেই প্রবণতা বদলেছে।
তার মতে, মে থেকে জুনে হঠাৎ এত বড় পরিবর্তন শুধু ব্যবহার অভ্যাসের কারণে হয়নি; তাপমাত্রা, বিশ্বকাপের খেলা এবং জ্বালানি সরবরাহের চাপ মিলিয়েই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বিশেষ বরাদ্দ চেয়ে হুইপের চিঠি
লোডশেডিংয়ের চাপ স্থানীয় পর্যায়ের বিদ্যুৎ বরাদ্দেও দেখা গেছে।
২৮ জুন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর জন্য অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিশেষ বিদ্যুৎ বরাদ্দ চেয়েছিলেন জাতীয় সংসদের হুইপ এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু।
চিঠিতে তিনি বলেছেন, তার নির্বাচনি এলাকা নাটোর-২ এবং নাটোর সদর, নলডাঙ্গা, সিংড়া, বাগাতিপাড়া উপজেলাসহ রাজশাহীর পুঠিয়া ও বাগমারায় নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।
গ্রীষ্মে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং চলমান বিশ্বকাপ ফুটবলের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা ‘বহুগুণ’ বেড়েছে বলে চিঠিতে তুলে ধরেন তিনি।
দুলু বলেছিলেন, “লোড শেডিংয়ের কারণে বিদ্যুৎ গ্রাহক ও জনসাধারণের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।”
চিঠির তথ্য অনুযায়ী, নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এলাকায় দিনে বিদ্যুতের চাহিদা ১২০ মেগাওয়াট হলেও বরাদ্দ মিলছে ৫৮ থেকে ৭০ মেগাওয়াট। রাতে চাহিদা ১৩১ মেগাওয়াটের বিপরীতে বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে ৭২ থেকে ৮৩ মেগাওয়াট।
তার চিঠির তথ্যে জাতীয় গ্রিডের ঘাটতির সঙ্গে স্থানীয় বরাদ্দ সংকটের সম্পর্কও দেখা যায়।
সক্ষমতা আছে, তবে উৎপাদন কম
জুনে জাতীয় গ্রিডে গড় বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় ২৯ হাজার ৩০৪ মেগাওয়াট। কিন্তু সন্ধ্যার পিক সময়ে গড় উৎপাদন ছিল ১৫ হাজার ৩৬২ মেগাওয়াট।
অর্থাৎ সন্ধ্যার পিক সময়ে গড়ে বর্তমান সক্ষমতার প্রায় ৫২ শতাংশ উৎপাদনে এসেছে।
এনএলডিসির ৩০ জুনের দৈনিক প্রতিবেদনে বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা দেখানো হয়েছে ২৯ হাজার ৩২৩ দশমিক ৫১৭ মেগাওয়াট। ওই দিন সন্ধ্যার পিকে উৎপাদন হয়েছে ১৬ হাজার ১৫২ দশমিক ১৪ মেগাওয়াট। সে হিসাবে ওই সময় বর্তমান সক্ষমতার প্রায় ৫৫ শতাংশ উৎপাদনে এসেছে।
সব বিদ্যুৎকেন্দ্র একসঙ্গে পুরো সক্ষমতায় চালানো যায় না। কোনো কেন্দ্র মেরামতে থাকে, কোনো কেন্দ্র জ্বালানি পায় না, আবার কোনো কেন্দ্র খরচ বেশি হওয়ায় কম চালানো হয়।
তবে এনএলডিসির কেন্দ্রভিত্তিক প্রতিবেদনে জুনে গ্যাস ও তরল জ্বালানি সংকটে অনেক কেন্দ্র কম চলার তথ্য আছে।
আইইইএফএ-এর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, “উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি থাকলেই বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। সেই সক্ষমতা চালানোর মতো জ্বালানি, অর্থ, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সঠিক চাহিদা ব্যবস্থাপনা থাকতে হয়।”
তার মতে, বিদ্যুৎ খাতে আমদানি নির্ভরতা এখন ‘বড় ঝুঁকি’। ফলে গ্যাস, কয়লা বা তরল জ্বালানির সরবরাহে সামান্য সমস্যা হলেও উৎপাদনে দ্রুত প্রভাব পড়ে।

গ্যাস-তেল সংকট যেসব কেন্দ্রে
৩০ জুন এনএলডিসির প্রতিবেদনে ২৭টি গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের পাশে ‘গ্যাস সংকট’ বা ‘গ্যাসের চাপ কম’ বলা ছিল।
এসব কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে ঘোড়াশাল, মেঘনাঘাট, সিদ্ধিরগঞ্জ, আশুগঞ্জ, চাঁদপুর, ভেড়ামারা ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিট। এ ছাড়া বাঘাবাড়ী ও রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড-আরপিসিএলও তালিকায় আছে।
সব মিলিয়ে এসব কেন্দ্রের বর্তমান সক্ষমতা ছিল ৭ হাজার ৬৭৩ মেগাওয়াট। কিন্তু পিক সময়ে উৎপাদন হয়েছে ২ হাজার ৯১৫ দশমিক ৫ মেগাওয়াট।
অন্যদিকে, প্রতিবেদনে ৪৪টি কেন্দ্রের পাশে তরল জ্বালানি সংকটের কথা রয়েছে। কড্ডা, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, রাউজান, শিকলবাহা, হাটহাজারী, চাঁদপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুর, ভৈরব, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, রূপসা, মধুমতি, বরিশাল, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন কেন্দ্র এই তালিকায় আছে।
এসব কেন্দ্রের বর্তমান সক্ষমতা ৪ হাজার ৭৭০ দশমিক ৯২৪ মেগাওয়াট। কিন্তু পিক সময়ে উৎপাদন হয়েছে ২ হাজার ৮১ দশমিক ৫ মেগাওয়াট।
অর্থাৎ গ্যাস ও তরল জ্বালানি সংকটে থাকা কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার বড় অংশ ওই দিন (৩০ জুন) উৎপাদনে আসেনি।
জুনে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহের দৈনিক গড় ছিল ৯০৩ দশমিক ৯৮ এমএমসিএফডি।
১ জুন গ্যাস সরবরাহ ছিল ১ হাজার ৪০ দশমিক ৭২ এমএমসিএফডি। ১১ জুন তা নেমে হয় ৮৫৫ দশমিক ৫ এমএমসিএফডি, যা মাসের সর্বনিম্ন। ৩০ জুন সরবরাহ বেড়ে দাঁড়ায় ৯৩৩ দশমিক ৭৮ এমএমসিএফডি।
জুনে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ এসেছে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে, ৩ হাজার ৭৪৭ দশমিক ২৩৮ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা। মোট উৎপাদনের হিসাবে এটি ৩৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে এসেছে ৩ হাজার ৫৫০ দশমিক ১৪২ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা, যা মোট উৎপাদনের ৩৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
ভারত থেকে এসেছে ১ হাজার ৭৫৫ দশমিক ১৬৩ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা, ১৭ দশমিক ১৩ শতাংশ।
ফার্নেস অয়েল থেকে এসেছে ১ হাজার ১৪ দশমিক ১ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা, ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। সৌর, জলবিদ্যুৎ, বায়ু ও ডিজেল মিলিয়ে এসেছে দুই শতাংশের কম।
এ হিসাবে জুনে গ্যাস ও কয়লা মিলিয়ে মোট বিদ্যুতের ৭১ শতাংশের বেশি এসেছে। ফলে এই দুই জ্বালানির সরবরাহে চাপ পড়লে পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থাতেই দ্রুত প্রভাব পড়ে।

আগের দুই জুনের চিত্র
এনএলডিসির ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জুনের মাসিক প্রতিবেদন মিলিয়ে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জুনে পিক সময়ে লোডশেডিং আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক কম ছিল।
২০২৪ সালের জুনে সন্ধ্যার পিক সময়ের হিসাবে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৭২৭ মেগাওয়াট। ২০২৫ সালের জুনে একই সময়ে সর্বোচ্চ লোডশেডিং নেমে আসে ১১০ মেগাওয়াটে। দিনের পিক সময়ের হিসাবে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ২০২৪ সালের জুনে ছিল ১ হাজার ৮০৮ মেগাওয়াট; ২০২৫ সালের জুনে তা কমে হয় ৩৯ মেগাওয়াট।
২০২৪ সালের জুনে সন্ধ্যার পিক সময়ে ২২ দিন এবং দিনের পিক সময়ে ১৯ দিন লোডশেডিং ছিল। ২০২৫ সালের জুনে তা কমে হয় যথাক্রমে ১৪ দিন ও ২ দিন।
তবে এই উন্নতির পেছনে চাহিদা কম থাকাও একটি কারণ। ২০২৪ সালের জুনে সর্বোচ্চ সন্ধ্যায় পিক চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। ২০২৫ সালের জুনে তা ছিল ১৫ হাজার ৭২০ দশমিক ৬৮ মেগাওয়াট।
একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্রের দিক থেকেও বড় পরিবর্তন দেখা যায়। গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন ৪ হাজার ১০৩ দশমিক ৩৬ মিলিয়ন ইউনিট থেকে বেড়ে ৪ হাজার ২৭৬ দশমিক ৪১ মিলিয়ন ইউনিট হয়েছিল। কয়লাভিত্তিক উৎপাদন ৯৮৮ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ইউনিট থেকে বেড়ে ২ হাজার ৬২৬ দশমিক ২৮ মিলিয়ন ইউনিটে ওঠেছিল।
অন্যদিকে ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ ৭০০ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন ইউনিট থেকে বেড়ে ১ হাজার ৩৭৮ দশমিক ৩১ মিলিয়ন ইউনিট হয়।
অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুনে লোডশেডিং কম থাকলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ ধরে রাখতে কয়লা ও ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ভূমিকা ছিল।
সংকট কাটাতে কী প্রস্তুতি?
জুলাই-অগাস্টে একই ধরনের সংকট যাতে না হয় সে জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা এবং জ্বালানির অর্থ পরিশোধে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পিডিবি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলামও বলেন, বন্ধ থাকা কেন্দ্রগুলো উৎপাদনে ফিরেছে এবং গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে।
আইইইএফএ-এর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলমের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং চাহিদা ব্যবস্থাপনাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
তিনি বলেন, বিদ্যমান সক্ষমতার ভালো ব্যবহার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ব্যাটারি স্টোরেজ ও নিজস্ব গ্যাসে জোর দিলে আমদানি করা জ্বালানির ওপর চাপ কমবে এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো হতে পারে।