Published : 30 Sep 2025, 10:22 PM
মহাঅষ্টমীর বিকাল, বনানীর কামাল আতাতুর্ক সড়কে পা রাখতেই শোনা যায় ঢাকের আওয়াজ। সে ধ্বনি টেনে নিয়ে যায় পূজামণ্ডপে, সেখানে দর্শনার্থীদের দৃষ্টি ছড়িয়ে পড়ে ‘পঞ্চভূতে’।
মণ্ডপের প্রবেশপথে পাটকাঠি আর বাঁশের নানান রকম বুনন দর্শককে মনে করায় বৈদিক দর্শনের ‘পঞ্চভূতের’ একটি-পৃথিবীর (ক্ষিতি) ঘ্রাণ। ভেতরে ঝুলছে অলংকৃত নিশান, যেন অপ (জল) আনমনে খেলছে মণ্ডপে।
সূর্যের আলো ঝলকাচ্ছে বুননের ফাঁক গলে, লাল রঙের দৃঢ় বন্ধনী দাঁড়িয়ে আছে শক্তি আর তেজের (আগুন) মূর্ত প্রতীক হয়ে।
খোলা প্রাঙ্গণে জালি করা সাদা রঙের পাতাগুলো তুলোর মেঘে মিশে নিশ্বাস নিচ্ছে বাতাসে (মরুত) আর মণ্ডপের চূড়ায় মহাশূন্যের (ব্যোম) এক মহাবৃত্ত, তার বিস্তৃতি জুড়ে অসংখ্য আলোক বিন্দু যেন মহাকাশের তারার মতো প্রসারিত।
মঙ্গলবার দুর্গাপূজার মহাঅষ্টমীতে ছিল কুমারী পূজা ও সন্ধি পূর্জা।
বিকালে বাবা-মায়ের সঙ্গে ঘুরতে এসে বনানীর পূজামণ্ডপে প্রকৃতির এমন মূর্ত ছোঁয়ায় মুগ্ধ প্রীতি চক্রবর্তী। নান্দনিক তোরণের সামনে দাঁড়িয়ে ছোট বোনের সঙ্গে ছবি তুলছিলেন তিনি। পরে দেবীর সঙ্গেও ছবি তুলতে দেখা যায়।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রীতি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ঢাকার কয়েকটা মণ্ডপেই গিয়েছি। বনানীর মণ্ডপটা সবথেকে বেশি ভালো লাগার কারণ হল–এখানে অনেক বড় জায়গা। ভিড় থাকলেও ধাক্কাধাক্কি হওয়ার মতো পরিস্থিতি হচ্ছে না। সময় লাগলেও প্রতিমা দর্শন করতে পারছি স্বস্তি নিয়ে।”
ঢাকার বনানী পূজামণ্ডপে দুর্গার প্রতিমা। রোববার ষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে এ মণ্ডপেও শুরু হয় পূজার মূল আনুষ্ঠানিকা
মণ্ডপে বাঁশের বিভিন্ন আকৃতি দিয়ে নির্মিত বিশাল তোরণ; যা দর্শনার্থীদের নিয়ে যায় প্রকৃতির কাছাকাছি।
সরকারি চাকরি থেকে সদ্য অবসরে যাওয়া শৈলী মজুমদার বলেন, “প্রতিবারই শুনি ঢাকার বাইরে অনেক জায়গায় ধান, পাট দিয়ে মণ্ডপ সাজানো হয়। সেখানে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। এবার বনানী মণ্ডপে বাঁশের তোরণ দেখে খুবই ভালো লাগছে।”
বাঁশের তোরণ দিয়ে ভেতরে প্রবেশের পর মাথার ওপর ছোট ছোট রঙবেরঙের কাপড়ের তৈরি ঝালর। হালকা বাতাসে যেন মনে হয় রঙিন ঢেউ। তরুণদের এই ঝালরের ভিডিও মুঠোফোনে ধারণ করতেও দেখা যায়।
বিকাল থেকে বৃষ্টি উপেক্ষা করেও অনেকে এসেছেন বনানী পূজা মণ্ডপে। কেউ আবার সকালেই দেবীর আরাধনায় অঞ্জলি দিয়েছেন, অংশ নিয়েছেন সন্ধি পূজায়ও।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বনানী পূজা মণ্ডপে দুর্গাদেবীকে অঞ্জলি দিতে এসেছিলেন অভিনেত্রী জয়শ্রী কর জয়া। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অষ্টমীতে প্রচুর লোকজনের জমায়েত হয়, এজন্য সকালেই এসেছি। অঞ্জলি দেওয়া এবং সন্ধি পূজা হয়েছে। অনেক ছবি তুলেছি, আনন্দ করেছি।”
মণ্ডপের নান্দকিতার প্রশংসা করেন জয়শ্রী। তিনি বলেন, “এবারের মণ্ডপে প্রকৃতির একটা বার্তা আছে। গ্রামীণ একটা আমেজ আছে।”
জয়শ্রীর মতো মণ্ডপের প্রশংসা করছিলেন সাজনিন নামের একজন দর্শনার্থীও। তিনি বলেন, “প্রতি বছরই ঢাকার অনেক মন্দিরে যাই, ছবি তুলি। বনানী মণ্ডপের আলো ঝলমলে পরিবেশে প্রকৃতির ছোঁয়া পাওয়া যাচ্ছে। এটা ভালো লাগছে।”
পঞ্চভূত
‘পঞ্চভূত: প্রকৃতির পাঁচ স্তম্ভে দেবীর আবাহন’ প্রতিপাদ্য নিয়ে এবার সাজানো হয়েছে বনানীর পূজা মণ্ডপ।
শিল্পী পার্থ প্রতীম সাহার শিল্পভাবনায় মণ্ডপটিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বৈদিক দর্শনের পাঁচ তত্ত্ব-ক্ষিতি (পৃথিবী), অপ (জল), তেজ (আগুন), মরুত (বায়ু) আর ব্যোম (আকাশ)।
বৈদিক মতে, এই পাঁচটি প্রকৃতির মৌলিক উপাদান।
পার্থ প্রতীম সাহা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পূজা মানে শুধু ভক্তি নয়, প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতাও। এজন্যই পরিবেশবান্ধব কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়েছে।”
কাঁচামালের উপাদান বাংলাদেশের সাতটি জেলা থেকে আনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “তিনটি জেলার ৪৫ জনের মতো কারিগর ও কারুশিল্পী এসে মাঠে কাজ করেছেন।
“তাছাড়া বগুড়া ও সান্তাহারের মাদুরের কারুশিল্পী, পিরোজপুরের বেলুয়া নদীর পাড় থেকে হোগলা বেতির বুননশিল্পীরা, সাতক্ষীরা থেকে বাঁশ বুননের কারুশিল্পীরা এখানে এসে সরাসরি যোগ দিতে না পারলেও আমাদের কাজের সঙ্গে তারা সম্পৃক্ত ছিলেন।”
মণ্ডপের জন্য বাঁশের বুনন সাতক্ষীরা থেকে, হোগলা/মলোই পিরোজপুর থেকে, মাদুর/পাটি বগুড়া থেকে, পাটকাঠি নড়াইল থেকে, লাল মাটি টাঙ্গাইল থেকে, কাঠ বাগেরহাট থেকে আর চার রকমের বাঁশ এসেছে যশোর থেকে।
মাঠে ২৫ দিন এবং ড্রুইং ডিজাইন পর্যায়ে আরো এক মাস কাজ করতে হয়েছে বলেও জানান পার্থ প্রতীম।
পূজা শেষে মণ্ডপের অধিকাংশ উপকরণই পরিবেশে মিশে যেতে সক্ষম বলেও এই শিল্পীর ভাষ্য।