Published : 15 Apr 2026, 06:18 PM
চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড ‘বন্ধের’ খবর যেমন এসেছে, তেমনি একই সময়ে দুই লাখ টন জ্বালানি তেল নিয়ে দুইটি জাহাজ বন্দরে নোঙর করার তথ্যও সংবাদমাধ্যমে আসা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “গতকালকে ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হয়েছে। ঠিক কিনা? এই কথাটা ঠিক বলেছে কিনা? গতকালকে। কিন্তু গতকালকে দুইটা জাহাজ ঘাটে নোঙর করেছে তেল নিয়া। এ কথাটা কেউ লেখে নাই। এটা দুঃখজনক।”
বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনের বিরতিতে সংসদ ভবনের টানেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি এসব কথা বলেন।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েলের কোনো চালান বাংলাদেশে আসেনি। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ক্রুড অয়েলবাহী একটি জাহাজ দেশে আসে; সেই তেল দিয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড-ইআরএলে শোধন প্রক্রিয়া চলছিল।
যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে গত মার্চ মাসে সৌদি আরব থেকে এক লাখ টন ক্রুড অয়েলের চালান দেশে আসার কথা ছিল। তেলভর্তি জাহাজটি গত ৩ র্মাচ সৌদি আরবের রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে দেশে আসার কথা থাকলেও তা আসতে পারেনি।
এ অবস্থায় ইআরএলের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধের পর্যায়ের রয়েছে বলে খবর আসে।
এ প্রসঙ্গ ধরে চিফ হুইপ বলেন, “আমি চাই আপনারা পজিটিভ নেগেটিভ সবটাই বলেন, আলোচনা করেন, সমালোচনা করেন। আলোচনা সমালোচনা হলে হবে কি, আমরা সমৃদ্ধ হব।”
তিনি জ্বালানি পরিস্থিতি, ভাষাশিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি, সশস্ত্র বাহিনীকে রাজনীতির বাইরে রাখা এবং সংবিধান সংশোধনের সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেন।
দক্ষ জনশক্তি গড়তে ভাষাশিক্ষার ওপর জোর
চিফ হুইপ বলেন, বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে মানুষকে একাধিক ভাষায় দক্ষ করে তোলার বিষয়ে সরকার ভাবছে।
তার ভাষায়, “আমরা অনেকগুলো ভাষায়, ভাষাভাষী মানুষকে মানে ভাষায় শিক্ষিত করতে চাই।”
নুরুল ইসলাম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করতে হলে আরবি, চীনে কাজ করতে হলে মান্দারিন, ইতালিতে কাজের জন্য ইতালিয়ান, কোরিয়ায় কোরিয়ান এবং জাপানে কাজের জন্য জাপানি ভাষা শেখার প্রয়োজন আছে।
চিফ হুইপ বলেন, “কিন্তু সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবে আমাদের অবশ্যই ইংলিশ শিখতে হবে। ইংলিশ একটা গ্লোবাল ল্যাঙ্গুয়েজ।”
এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী কাজ করছেন তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাওয়া মতামত ও বাস্তবতা মিলিয়ে একটি নির্দেশনা তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেওয়া হবে।

‘সশস্ত্র বাহিনী দেশের গর্ব’
এক প্রশ্নে সশস্ত্র বাহিনীকে দেশের গর্ব ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অন্যতম প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করে তাদের রাজনীতির বাইরে রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন চিফ হুইপ।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে এর আগে কথা বলেছেন। সম্প্রতি এক বক্তব্যে এবং পরে প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীকে রাজনীতির বাইরে রাখার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
নূরুল ইসলাম বলেন, “সশস্ত্র বাহিনী এ দেশের গর্ব, সশস্ত্র বাহিনী এ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার অন্যতম প্রতীক।”
তার ভাষায়, অতীতে সশস্ত্র বাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে তিনি একটি বিদেশি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের কথাও বলেছেন।
চিফ হুইপ বলেন, “সশস্ত্র বাহিনীকে একটা পর্যায়ে আপনারা দেখেছেন, আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই একটা পত্রিকা, টাইমসে ছাপা হয়েছিল, লন্ডন ভিত্তিক, যে সশস্ত্র বাহিনীকে পলিউটেড করা হয়েছে।”
তার দাবি, “অতীত সরকারের সময় সশস্ত্র বাহিনীকে তারা নানানভাবে পলিউট করার চেষ্টা করেছে এবং করেছে তারা।”
নুরুল ইসলামের মতে, “সশস্ত্র বাহিনীকে যদি পলিটিক্সে আনা হয়, তাকে যদি, মানে পলিটিক্সের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে হয় কি একটা দলের একটা গোষ্ঠীর কাজ করে, তখন দেশের কাজ করতে পারে না।”
তিনি বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের কাজ করার জন্য সশস্ত্র বাহিনী এবং দেশের কল্যাণের জন্য সশস্ত্র বাহিনী, সেটা নিশ্চিত করেছেন।”
‘সংবিধান সংশোধনে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে’
সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠনের প্রশ্নে চিফ হুইপ বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে গেলে শেষ পর্যন্ত সংবিধান সংশোধনের পথেই যেতে হবে।
তিনি বলেন, “সংবিধান সংশোধন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।”
গণভোটের রায় অনুসারে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের দাবি করে আসছে বিরোধী দল। অন্যদিকে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠনের পক্ষে সরকার।
চিফ হুইপের ভাষায়, জুলাই সনদে ৪৮টি দফা এসেছে, আর সংবিধানে রয়েছে ১৫২টি অনুচ্ছেদ। ফলে নতুন প্রস্তাবগুলোকে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে আনতেই হবে।
তবে এ পথে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে এখনো কিছু মতপার্থক্য রয়েছে, বলেন তিনি।
নুরুল ইসলাম বলেন, “বিরোধী দল চেয়েছে এই আদেশ বাস্তবায়ন হোক, আমরা বলছি প্রক্রিয়াটা হবে কি, এই দুইটা জায়গায় আটকা।”
তবে সনদের বিষয়ে মৌলিক আপত্তি নেই বলেও দাবি করেছেন তিনি।
চিফ হুইপ বলেন, “আমার মনে হয়, একটা পর্যায়ে ইনশআল্লাহ আমরা সবাই একত্রিত হব সংবিধান সংশোধনের ব্যাপারে।
“যখন আমরা একত্রিত হব, তখনই আমরা সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব আনব এবং দেখবেন আমরা সবাই একত্রিত হয়ে এই বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন করব।”

‘পার্লামেন্টে আলোচনা-সমালোচনার জায়গা আছে’
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ বিল আকারে সংসদে উত্থাপন ও তা পাস করার প্রক্রিয়া নিয়ে ‘বিশ্বাস ভঙ্গের’ অভিযোগ তুলে ১০ এপ্রিল সংসদে ‘ওয়াকআউট’ করে বিরোধী দল। এর আগেও মুলতবি প্রস্তাব এনে ‘প্রতিকার না পাওয়ার’ অভিযোগ তুলে এক দফা ‘ওয়াকআউট’ করেছিলেন বিরোধী সদস্যরা।
এছাড়া গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট।
সংসদ ও রাজনীতির মাঠে বিরোধী দলের এ অবস্থানের প্রসঙ্গ টেনে চিফ হুইপ বলেন, সংসদই হচ্ছে আলোচনা ও সমালোচনার জায়গা, আর সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই একসময় ঐকমত্য তৈরি হবে।
তিনি বলেন, “আমরা পার্লামেন্টে বসি আলোচনার জন্য, পার্লামেন্টে বসি সমালোচনার জন্য।
“আজকে না হয় কালকে, কালকে না হয় পরশু, একদিন না একদিন আমরা হব।”
চিফ হুইপের মতে, দেশকে ভালোবাসার জায়গা থেকে সরকার ও বিরোধী দল শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়ে একমত হবে।