১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

গার্ডার দুর্ঘটনা: পাঁচজনের প্রাণহানির ঘটনা তদন্তে যা উঠে এল

“কোম্পানির নামে মামলা করেছিলাম; আর চার্জশিট দিছে ব্যক্তির বিরুদ্ধে,” বলছেন বাদী।

বিডিনিউজ২৪

মামুন খান

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 23 May 2026, 10:24 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:18 PM

বছর চারেক আগে ঢাকার উত্তরায় বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের কংক্রিটের গার্ডার আছড়ে পড়ে পাঁচজনের প্রাণহানির ঘটনায় দুই চীনাসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার পরিদর্শক মুনিরুজ্জামান গত ৩০ এপ্রিল এ অভিযোগপত্র জমা দেন।

আসামিরা হলেন—চীনা ঠিকাদারি কোম্পানি চায়না গেঝুবা গ্রুপের সুন লেই, শিয়াং জিয়াও, ক্রেন চালক আলামিন হোসেন ওরফে হৃদয়, তার সহকারী রাকিব হোসেন, সিগনালম্যান রুবেল, আফরোজ মিয়া; সেফটি ইঞ্জিনিয়ার জুলফিকার আলী, ইফসকন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ইফতেখায়ের ও আজহারুল ইসলাম মিঠু, তোফাজ্জল হোসেন, বিলট্রেড গ্রুপের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রুহুল আমিন মৃধা ও মনজুরুল ইসলাম। 

আগামী ৩০ জুন ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম জাকির হোসাইনের আদালতে মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।

জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা মুনিরুজ্জামান বলেন, “মামলায় ১২ জনের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে দুই চীনা নাগরিকও রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছি।”

আসামিদের মধ্যে দুই চীনা নাগরিক পলাতক রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। অপর ১০ আসামি জামিনে রয়েছে।

২০২২ সালের ১৫ অগাস্ট ঢাকার উত্তরায় বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের ক্রেইন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ৫০ টন ওজনের কংক্রিটের গার্ডার আছড়ে পড়ে থেঁতলে যায় রাস্তায় থাকা একটি গাড়ি; তাতে ভেতরেই প্রাণ যায় এক পরিবারের পাঁচজনের। আহত হয় নবদম্পতি। 

নিহতরা হলেন—বরের বাবা রুবেল মিয়া (৬০), কনের মা ফাহিমা (৪০), খালা ঝর্না (২৮) এবং ঝর্নার দুই সন্তান জান্নাত (৬) ও জাকারিয়া (২)।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, জাতীয় শোক দিবসে সরকারি ছুটি থাকায় ঠিকাদারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী সেদিন কোনো কর্মসূচি থাকার কথা ছিল না। ছুটি থাকায় মাঠপর্যায়ে কোনো সরকারি প্রতিনিধিও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না।

ছুটির দিনে কাজ করার কথা না থাকলেও ঠিকাদারি কোম্পানি তার কাজ অব্যাহত রাখে। ছুটির দিনেও কাজ চালিয়ে যেতে হলে পরামর্শকের কাছ থেকে অনুমতি গ্রহণের নিয়ম থাকলেও তা মানা হয়নি। তাছাড়া পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কেউ সেদিন ঘটনাস্থলে ছিলেন না।

তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে বলেছেন, ঠিকাদারি কোম্পানির প্রতিনিধি সুন লেই ও শিয়াং জিয়াও কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই ছুটির দিনের কাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তারা মোবাইলে ফোনের মাধ্যমে আসামি আলামিন, রাকিব, রুবেল, আফরোজ, জুলফিকার, তোফাজ্জলসহ অন্যদের উত্তরার প্যারাডাইস টাওয়ারের সামনে আসতে বলেন।

অভিযোপত্রে বলা হয়, ক্রেইন চালক সহকারীকে দিয়ে ক্রেন পরিচালনা করিয়ে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেন এবং সহকারী রাকিবের পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় ঘটনাটিকে ‘অবহেলাজনিত অপরাধ’ বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তাছাড়া ক্রেনটি যেখানে বসানো হয়েছিল, সেই স্থানের মাটি ভেজা ও নরম হলেও আসামিরা অবহেলা করে সেটি এড়িয়ে গেছেন।

আর ক্রেনের সাহায্যে বক্স গার্ডার তুলে রাস্তার একপাশ থেকে অন্য পাশে নেওয়ার সময় জননিরাপত্তার জন্য রাস্তার দুই পাশে ব্যারিকেড দেওয়ার বিধান থাকলেও কর্তব্যরত সেফটি ইঞ্জিনিয়ার জুলফিকার আলী এবং সিগনালম্যান রুবেল ও আফরোজ দায়িত্ব তা মানেননি।

তদন্ত কর্মকর্তা মুনিরুজ্জামান অভিযোগপত্রে বলেছেন, ব্যারিকেড না দিয়েই প্রায় ৫০ টন ওজনের বক্স গার্ডার রাস্তার এক পাশ থেকে অন্যপাশে সরানো হচ্ছিল। ক্রেন হেলপার প্রথম বক্স গার্ডারটি লরিতে উঠাতে সক্ষম হলেও দ্বিতীয় বক্স গার্ডারটি ক্রেন দিয়ে লরিতে তোলার সময় ক্রেনটি হেলে পড়ে এবং বক্স গার্ডারটি প্রাইভেটকারের উপর গিয়ে পড়ে। এতে বক্স গার্ডারের নিচে চাপা পড়ে প্রাইভেটকার আরোহী রুবেলসহ পাঁচজন প্রাণ হারান। নবদম্পতি হৃদয় ও রিয়া মিন গুরুতর জখম হন। ঘটনার পরপরই আসামিরা সেখান থেকে পালিয়ে যান।

সংশ্লিষ্টদের কার কী দায়িত্ব তা তুলে ধরতে গিয়ে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে- সার্বিক নিরাপত্তা বিধানসহ অনুমোদিত কর্মসূচি অনুযায়ী প্রকল্পের সব কাজ সম্পাদন করা। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এসএমইসি ইন্টারন্যাশনালের কাজ হচ্ছে ঠিকাদারের কাজের কর্মসূচি, মেথড স্টেটমেন্টস, ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট প্লান, নিরাপত্তা বিধানসহ সব ধরনের কারিগরি বিষয়াদি অনুমোদন করা এবং চুক্তির শর্তানুযায়ী ঠিকাদারের কাজের গুণগত মান ও পরিমাণ নিশ্চিত করা। প্রকল্পের সার্বিক বিষয়াদি দেখভালের দায়িত্বে সরকারের একজন প্রকল্প পরিচালক রয়েছেন।

ঘটনার দিন গাড়ির জানালার ধারে থাকা নবদম্পতি হৃদয় ও রিয়াকে টেনে বের করে স্থানীয়রা দ্রুত হাসপাতালে পাঠাতে পারলেও ওই পরিবারের আরও পাঁচজন গাড়ির ভেতর আটকে থাকেন তিন ঘণ্টা।

পরে সন্ধ্যায় গার্ডার সরিয়ে হৃদয়ের বাবা রুবেল মিয়া, রিয়ার মা ফাহিমা, খালা ঝর্না এবং ঝর্নার দুই সন্তান জান্নাত ও জাকারিয়ার লাশ উদ্ধার করা হয়।

ঘটনার পরদিন রিয়ার মামা আফরান মন্ডল বাবু ‘অবহেলাজনিত মৃত্যুর’ অভিযোগ এনে ঠিকাদার কোম্পানি, ক্রেইন চালক এবং প্রকল্পের নিরাপত্তার দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। 

বাদী আফরান মন্ডল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কোম্পানির নামে মামলা করেছিলাম আর চার্জশিট দিছে ব্যক্তির বিরুদ্ধে। কোম্পানি কেন কর্মচারীর দায়ভার নেবে না? পুরো কোম্পানিকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।"

তিনি বলেন, “পরিবারের পাঁচজনকে হারিয়েছি। মামলার সুষ্ঠু বিচার হতে হবে।”

অভিযোগপত্রে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয় জানিয়ে আফরান মন্ডল বলেন, “পরামর্শ করে এ বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেব—নারাজি দেব কি না।”

আসামি মনজুরুল ইসলাম ও রাকিবের আইনজীবী সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, “মনজুরুল তো ঘটনাস্থলে ছিল না। মামলা দায়েরের পুলিশ বিলট্রেড গ্রুপের অফিসে যায়। কাউকে না পেয়ে তাকে ধরে এনে আসামি করে দিয়েছে। 

“আর রাকিব হলো ক্রেন চালকের সহকারী। মূল চালককে না পেয়ে তাকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। তারা কোনোভাবে ঘটনার সাথে জড়িত না।”

তোফাজ্জল হোসেন ও রুহুল আমিনের আইনজীবী তাইবুর রহমান তুহিন বলেন, “তারা কোনো কিছু করেনি। কোথাও কোনোভাবে কিছু প্রমাণ করতে পারবে না। চায়না কোম্পানি যদি অন্য কোথা থেকে ক্রেনের চালক এনে কাজ করে, সেখানে তাদের কী অবহেলা আছে? 

“তারা কোনোভাবে মামলার ঘটনার সাথে জড়িত না। তার পরও যেহেতু চার্জশিট হয়ে গেছে, আইনগতভাবে যা করার করব।”