Published : 17 Dec 2025, 07:03 PM
ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনারকে তলবের পর দিল্লিতে বাংলাদেশের দূতকেও যে পাল্টা ডাকা হবে, সেটাকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবেই দেখছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।
তবে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যে বক্তব্য ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিয়েছে, এমন ‘নসিহত অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
বুধবার বিকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে বাংলাদেশ সরকারের এমন প্রতিক্রিয়া তুলে ধরে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “আমরা তাদের হাই কমিশনারকে ডেকেছি। এটার ব্যাপারে আমরা যা কিছু বলেছি, সেটা তারা গ্রহণ করে নাই; তাদের কিছু দ্বিমত আছে এ বিষয়ে।
“একইভাবে আমাদের হাই কমিশনারকেও তারা ডেকেছে। এটা খুব অপ্রত্যাশিত না। সাধারণত এটা ঘটে। একজনকে ডাকা, আরেকজনকে ডাকা হয়।”
এর বিপরীতে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারত সরকারের করা মন্তব্যে জোর আপত্তি তার। যেটি তার ভাষায় ‘নসিহত’।
তিনি বলেন, “সর্বশেষ যে বক্তব্য তাদের, তাতে কিছু নসিহত করা হয়েছে আমাদেরকে। এই নসিহত, আমি মনে করি না যে এটার কোনো প্রয়োজন আছে আমাদেরকে এভাবে করার। বাংলাদেশে নির্বাচন কেমন হবে, এটা নিয়ে আমরা আমাদের প্রতিবেশীদের উপদেশ চাই না।
“আমরা, এই সরকার প্রথম দিন থেকে স্পষ্টভাবে বলে আসছে যে, আমরা একটা অত্যন্ত উচ্চ মানের, মানুষ যেন গিয়ে ভোট দিতে পারে, সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাই, যে পরিবেশ গত ১৫ বছর ছিল না।”
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার নির্বাচনগুলোর সময়ে ভারতের চুপ থাকার সমালোচনা করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “এখন ভারত আমাদেরকে এটা নিয়ে উপদেশ দিচ্ছে, এটা আমি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য মনে করি এই কারণে যে, তারা জানে যে এর আগে গত ১৫ বছর ধরে যে সরকার ছিল, যে সরকারের সাথে তাদের অত্যন্ত মধুর সম্পর্ক ছিল, তখন কিন্তু এই যে নির্বাচনগুলো প্রহসনমূলক হয়েছে, তখন তারা একটা শব্দ উচ্চারণ করেনি।
“এখন সামনে একটা ভালো নির্বাচনের দিকে আমরা যাচ্ছি, এই মুহূর্তে আমাদেরকে নসিহত করারতো কোনো প্রয়োজন নাই। আমরা জানি আমরা কী করব। আমরা একটা ভালো নির্বাচন করব, যেটাতে মানুষ ভোট দিতে পারবে এবং যাদেরকে ভোট দেবে তারাই নির্বাচিত হবে। যেটা এর আগে গত ১৫ বছরে ঘটেনি। তো, এই জিনিসটা আমাদের কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।”
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয়দের নির্বাচন নিয়ে একই ধরনের বক্তব্যের বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “না, বিষয়টা কিন্তু একরকম না। তাদের সাথে আমাদের কিছু যোগাযোগ সবসময় আছে এবং তারা নির্বাচন কমিশনের সাথেও যোগাযোগে আছে। কারণ আমরা চাই যে তারা এখানে তাদের পর্যবেক্ষকদেরকে পাঠাক।
“সেটা কিন্তু এভাবে একটা স্টেটমেন্ট দিয়ে যে আমাদের অবস্থানটাকে ‘গ্রহণযোগ্য না’ এই ধরনের কথাবার্তার পাশাপাশি বলা যে, এই এই রকম হতে হবে নির্বাচন। এই নসিহত আমরা গ্রহণ করতে পারি না বিশেষত এই কারণে যে, তাদের তো এই সেন্টিমেন্ট দেখা যায় নাই গত ১৫ বছর, হঠাৎ করে এটা জেগে উঠল।”
সম্পর্কের টানাপোড়েন, হাসিনার বক্তব্য প্রসঙ্গে
পাল্টাপাল্টি তলবের ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক তিক্ততার পরবর্তী ধাপের দিকে যাচ্ছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তৌহিদ হোসেন বলেন, “যে প্রশ্নটা উনি করেছিলেন যে, আসলে এটাতে আমরা অন্য একটা ধাপে প্রবেশ করলাম কি না? এটা বলা খুব কঠিন যে, আরেকটা ধাপ শুরু হল কি না।
“কারণ আমাদেরতো এটা বাস্তবতাকে মেনে নেওয়াই ভালো যে আসলেতো সরকারের শুরু থেকে আজকে পর্যন্ত টানাপোড়েন তো আছে।”
তিনি বলেন, “ভারতের সাথে টানাপোড়েন ছিল, এটা মেনে নিয়েই আমরা সবসময় বলে আসছি যে, আমরা একটা ‘গুড টু ওয়ার্কিং রিলেশন’ চাই। তো আমরা চাইলে সেটা হবেই এমন তো কোনো কথা নেই।
“এখন সম্পর্ক- দুই পক্ষ থেকেইতো সেটাকে এগোনোর চেষ্টা করতে হবে। আমার মনে হয়, আমরা দুই পক্ষ মিলিয়ে হয়ত অতটা এগোতে পারিনি। যে কারণে টানাপোড়েনটা রয়েই গেছে।”
জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য, বিবৃতি ও উস্কানি নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আপত্তি থাকার কথাও তুলে ধরেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, “ইদানিং কিছু কিছু বিষয়ে আমাদেরও আপত্তি আছে, তাদেরও নিজস্ব অবস্থান আছে। আমরা জানি যে শেখ হাসিনা ভারতে বসে, এর আগে একটা বিষয় ছিল যে তিনি বক্তব্য দিতেন শুধু আপনার সোশ্যাল মিডিয়াতে।
“কিন্তু পরবর্তীতে আমরা দেখলাম যে, মূলধারার সংবাদমাধ্যমে তার বক্তব্য এসেছে এবং সেই বক্তব্যের মধ্যে প্রচুর উসকানি আছে। এটা আপনারাও দেখেছেন, আমরাও দেখেছি। তো, আমরা এটা যিনি এখানে একটা আদালত থেকে শাস্তি প্রাপ্ত হয়েছেন, তিনি আমাদের পাশের দেশে বসে এখানে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন, এটা আমরা আপত্তি করব, বা তাদের সহায়তা চাইব যে, তাকে ফেরত পাঠান। এটা খুব অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু তারা সেদিকে যাননি।”
শেখ হাসিনার ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্য থামানোর জন্য ঢাকার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “দেখুন, ভারত যদি তাকে থামাতে না চায়, আমরা থামাতে পারব না। এটা আমাদেরকে বুঝে নিতে হবে আমাদেরকে।
“আমরা চাইব যে, ভারত তাকে থামাক, যাতে এখানে একটা পরিবেশ সৃষ্টি যেটা হচ্ছে নির্বাচনের জন্য, সেখানে যেন তার বিস্ফোরক বক্তব্য যেগুলো উনি দিচ্ছেন, সেটা যাতে খারাপ করার মত কোনো পরিবেশ যাতে সৃষ্টি না হয়। এটা আমরা তাদের কাছে চাইব এবং তারা যদি সেটা করেন, তাহলে সেটাকে আমরা একটা ভালো পজিটিভ পদক্ষেপ হিসেবে নেব। না করলে তো, আমি তাকে জোর করতে পারব না।”
কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা, ঘেরাও কর্মসূচি প্রসঙ্গে
বাংলাদেশ হাই কমিশনারকে তলবের তথ্য জানিয়ে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকায় হাই কমিশন অভিমুখে কর্মসূচি দিয়ে ‘উগ্রবাদী শক্তি নিরাপত্তা পরিস্থিতির’ অবনতি ঘটাতে চাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে ভারত। একইসঙ্গে, সব কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বান জানানো হয় সেখানে।
সব কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিতের যে আহ্বান ভারত জানিয়েছে, সেই প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “যখন একটা প্রোগ্রাম থাকবে, যে তাদের ওই মিশন অভিমুখে যাত্রা করবে একটা গ্রুপ, তখন তাদের একটু উদ্বেগ থাকবে, এটা খুব অস্বাভাবিক কিছু না।”
ভারতে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে এমন পরিস্থিতি হলে একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “এটা কলকাতায় যখন আমরা খবর পাই যে, তারা একটা মিছিল নিয়ে আসবে, আমরা তাদের পুলিশকে বলি এবং তারা ব্যবস্থা নেয়। ক্ষেত্রবিশেষে এটা সফল হয় না, যেমন আগরতলাতে আমাদের মিশনের ওপর আক্রমণ হয়েছিল।
“কলকাতাও একবার আমার মিশনের, আমি তখন ডেপুটি হাই কমিশনার, ঠিক বাইরে এসে তারা ট্রাকের উপর থেকে আতশবাজি করেছে, এগুলো হয় ঘটনা। কিন্তু এটা অবহিত করা হয় এবং সাধারণত পুলিশ ব্যবস্থা নেয়।”
ভারতীয় ভিসা সেন্টার বন্ধের বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “ভিসা সেন্টার বিষয়টা হল যে, আজকে যেহেতু একটি কর্মসূচি ছিল কাজেই সেটার ব্যাপারেতো ভারতীয়রা ভারতীয় যে সেন্টার আছে ভিসা, সেটা তারা বন্ধ রাখতে পারে।
“কারণ তাদেরও তো নিরাপত্তার প্রশ্ন আছে। নিরাপত্তা যাতে বিঘ্নিত না হয়, সেটা আমরা চেষ্টা করেছি এবং আমার মনে হয় আমরা সফল হয়েছি।”
এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, “ভিসার ব্যাপারে যেকোন দেশ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এ ব্যাপারে কিন্তু অন্য দেশের কোনো কিছু সত্যিকার অর্থে বলার নেই।”
ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক মিশন সংকুচিত করার কোনো চিন্তা সরকার করছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “যদি দেখা যায় যে আমার কর্মকর্তাদের জন্য পর্যাপ্ত কাজ নাই, তখন আমরা সেটা কমানোর চিন্তা করব। এই মুহূর্তে আমি মনে করি না যে, সেটার প্রয়োজন আছে।”
ঢাকা ৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ইনকিলাব মঞ্চের আহ্ববায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদির ওপর হামলার প্রতিবাদে সোমবার ইনকিলাব মঞ্চ আয়োজিত ‘সর্বদলীয় প্রতিরোধ সমাবেশে’ জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) হাসনাত আব্দুল্লাহ এর একটি বক্তব্য নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে।
ওই সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, “বাংলাদেশে যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, সন্ত্রাস চালায়, ভোটচুরি করে এবং হাদিকে হত্যা করেছে-তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে ভারত। দেশের পরিবেশ অস্থিতিশীল ও নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা চলছে।”
জুলাই আন্দোলনের সামনের সারির এই সংগঠক বলেন, “যারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, ভোটাধিকার ও মানবাধিকারকে বিশ্বাস করে না- তাদেরকে আশ্রয় দিলে আমরাও বাংলাদেশে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় দিয়ে সেভেন সিস্টার্স আলাদা করে দেব।”
হাসনাতের ওই বক্তব্য উদ্ধৃত করে এক প্রশ্নে তৌহিদ হোসেন বলেন, “বাংলাদেশ কোনো সন্ত্রাসবাদে বিশ্বাস করে না, এটা আপনারা জানেন। আমাদের একটা নীতি আছে এ ব্যাপারে সরকারের এবং আমরা কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদীকে আমাদের ভূমিতে আশ্রয় দেব, অবশ্যই এটা এ সরকার করবে না।
“এবং আমি অনুমান করি যে, বাংলাদেশে কোনো সরকারই করবে না। এটা একজন অ্যাক্টিভিস্ট, রাজনীতি করেন, উনি বলতে পারেন। কিন্তু সরকারের অবস্থান অবশ্যই সেটা না।”
তার ওই বক্তব্য নিয়ে আরেক প্রশ্নে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “প্রথমেই তো প্রশ্ন হচ্ছে যে, হাসনাত কি সরকারের অংশ? সে তো সরকারের অংশ না।
“কাজেই সরকারের বক্তব্য যদি হত, সেটা হয় আমি বলতাম আর নয়তো সরকারের যে সর্বোচ্চ অফিস সেখান থেকে বলত। কাজেই, এটা অনেকটাই অবান্তর।”