Published : 08 Jun 2026, 02:44 PM
ঢাকা জজ কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী আমিনুল গণী টিটোর মৃত্যুতে শোক জানিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম একদিন বদ্ধ রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম এক শোক বার্তায় এ কথা জানিয়েছেন।
আইনজীবী টিটো ট্রাইব্যুনালে চলমান কয়েকটি মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী ছিলেন।
হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রোববার রাত ১১টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান; তার বয়স হয়েছিল ৬১ বছর।
আমিনুল ইসলাম শোক বার্তায় বলেন, ডিফেন্স আইনজীবী জনাব আমিনুল গণী টিটোর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর কার্যক্রম মুলতবি রাখা হয়েছে।
“তার মৃত্যুতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গভীর শোক প্রকাশ করছে।”
আইনজীবী ও পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, সোমবার সকাল ৮টায় মোহাম্মদপুরের কাদেরিয়া মাদ্রাসায় তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ঢাকা জজ কোর্ট প্রাঙ্গণে সকাল পৌনে ১১টায় আরেকটি জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। কর্মস্থল ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তার মরদেহ জন্মস্থান টাঙ্গাইলের নাগরপুরে নেওয়া হবে এবং সেখানে বাদ আসর জানাজা হওয়ার কথা রয়েছে। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
জানাজার আগে ঢাকা আদালত প্রাঙ্গণে বাবার স্মৃতিচারণ করে তাকে ক্ষমা করে দেওয়ার আকুতি জানান এই আইনজীবীর দুই ছেলে।
বড় ছেলে আমিনুল গণী রুদ্র বলেন, "আমার বাবা আপনাদেরই একজন আইনজীবী ছিলেন। আপনাদের জন্যই কাজ করতেন আজীবন, এই আইন আদালতই তার লাইফ ছিল। কাউকে যদি মন খারাপ করে থাকে, কাউকে যদি ভুল করে থাকে কোনোভাবে — সবাই তাকে মাফ করে দিবেন।”
ছোট ছেলে সামিল গণী শুদ্ধ বলেন, "আমার বাবার সাথে টাকা-পয়সা, ফাইনান্সিয়াল কোনো যদি লেনদেন হয়ে থাকে, আর যদি কোনো কিছু বাকি থেকে থাকে — ওইটা আমি আর আমার বড় ভাই আমরা দায়িত্ব নিয়ে সর্ট আউট করে ফেলব। এখানে সবার কাছ থেকে আমি খালি আমার বাবার জন্য দোয়া চাই।"
আইন পেশায় আমিনুল গণী টিটোর নিষ্ঠা, সততা ও মানবিক গুণাবলীর স্মৃতিচারণ করেন তার দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক নেতা গোলাম মোস্তফা খান বলেন, "আজকের উপস্থিতি, কোর্টের আইনজীবীদের এই জানাজায় উপস্থিতি প্রমাণ করে যে মানুষের সাথে, আইনজীবীদের সাথে তার কি রকম সম্পর্ক ছিল।"
ঢাকা আইনজীবী সমিতির আরেক সাবেক নেতা ফয়সাল মাহমুদ বলেন, "আমিনুল গণী টিটো একজন ভালো মানুষ ছিলেন, ভালো আইনজীবী ছিলেন। বিচারপ্রার্থীরা একজন ভালো আইনজীবীর কাছ থেকে, সুষ্ঠু বিচার থেকে বঞ্চিত হলো এবং বিচার বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।"
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম স্মৃতিচারণ করে বলেন, "তিনি একটি মামলার বিষয় নিয়ে যখন পাবলিকলি কথা বলতেন, অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে কথা বলতেন। তিনি কোনোদিনও কারো সাথে কোনো খারাপ ব্যবহার করেননি। স্বভাবে তিনি একদমই ভদ্রলোক ছিলেন।"
কবি ও গায়ক টিটোকে স্মরণ করে তিনি বলেন, "তার কবিতা আমি মিস করব, তার গান আমি মিস করব।"
ফৌজদারি আইনে টিটোর গভীর দক্ষতার প্রশংসা করে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল প্রকাশ বিশ্বাস বলেন, "উনি ফৌজদারি মামলাটা একটা শিল্প, একটা পেইন্টিং, একটা মুভি তৈরির মতো দেখতেন এবং জাস্টিসকে সেটা বুঝাতেন। যেকোনো ইন্সিডেন্টে অন ফ্যাক্টস অফ ইস্যুতে কী কী ডিসিশনস অ্যাপ্লিকেবল, সেই জিনিসগুলোকে খুঁজে খুঁজে সমুদ্র সেঁচে মনিমুক্তা খোঁজার মত যে ধৈর্য, স্থিতধী — তার মধ্যে সেটি ছিল।"
কাজের প্রতি এই আইনজীবীর একনিষ্ঠতার কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, "এই যে ক্লান্তিহীন নিরলস যে পরিশ্রম উনি করতেন... উনি অনিয়ম করতেন না, দুর্নীতি সহ্য করতেন না। কোনো বিচারকের কাছে কোনোদিন কোনো অনুরোধ করেননি। আমি জানি ওনার একটু অবহেলা ছিল শরীরের প্রতি। শরীরকে উনি মোটেই প্রশ্রয় দিতেন না। মক্কেলদের সেবায় নিয়োজিত থাকতেন শরীরকে অবহেলা করে।"
আইন পেশায় আমিনুল গণী টিটো ছিলেন পরিচিত মুখ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আবু সাঈদ হত্যা মামলার আসামি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম এবং গুম-খুনের ঘটনায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের বেশ কয়েকটি মামলায় তিনি আসামিপক্ষের আইনজীবী ছিলেন।
এর আগে আদালত অবমাননার মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে নিযুক্ত আইনজীবীর দায়িত্ব পেলেও গত বছরের ২৫ জুন ট্রাইব্যুনালে শুনানিকালে তিনি নিজেকে ওই দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে নেন।
আইনজীবীর পাশাপাশি আমিনুল গণী টিটো কবি হিসেবে পরিচিতি পেশেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষার্থী আশির দশকের প্রথমভাগ থেকে লেখালেখি শুরু করেন। তৎকালীন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে কাব্যানাটক ও গণসংগীতে তিনি সক্রিয় ছিলেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পিতা ধর্ম মাতা বসুমতী’ এবং দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ক্ষরণের একতারা’।
১৯৬৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলের নাগরপুরে জন্ম নেওয়া আইনজীবী টিটো দুই পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের বাবা।
তার আকস্মিক মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন আইনাঙ্গনের বিশিষ্টজনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা।
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল তার ফেইসবুকে এক শোকবার্তায় বলেন, “এই সময়ের অন্যতম সেরা ট্রায়াল আইনজীবী জনাব আমিনুল গণী টিটো গতকাল ইন্তেকাল করেছেন। আইনজীবীর পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন লেখক, গায়ক ও শুদ্ধ চিন্তক। আমি তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছি।”
এছাড়া তার প্রয়াণে পৃথক শোকবার্তায় গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং কোর্ট রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান।