Published : 06 Oct 2025, 01:47 AM
সরকারি হিসাবে দেশে ১৪১৫টি নদী থাকার কথা বলা হলেও সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, অন্তত ৮১টি নদী ইতোমধ্যে মরণাপন্ন হয়ে পড়েছে। জীবন-জীবিকা ও নৌপথের অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং পরিবেশ-প্রতিবেশগত কারণে নদী বাঁচানোর কথা প্রায় উঠলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই সরকারের।
নদীমাতৃক দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ জুড়ে মোটাদাগে তিনটি নদী প্রণালী রয়েছে। এগুলো হল- গঙ্গা-পদ্মা, বহ্মপুত্র-যমুনা ও মেঘনা প্রণালী।
এই নদীগুলো সারাদেশ জুড়ে এঁকেবেঁকে গিয়ে ৪০৫টির বেশি নদ-নদীকে অতিক্রম করে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। এর মধ্যে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা নদীর রয়েছে অসংখ্য শাখা-উপশাখা নদী।
সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন যৌথভাবে জেলা প্রশাসন, বিভাগীয় কমিশনার ও নদী কর্মীদের নিয়ে বাংলাদেশের নদ-নদীর একটি তালিকা করেছে চলতি বছরের এপ্রিলে।
তালিকা অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নদ-নদী রয়েছে ১৪১৫টি। নতুন করে কোনো নদনদীর সন্ধান পেলে এই তালিকায় যুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে।
নদীর তালিকা হলেও বিপরীতে কতগুলো নদ-নদী মৃত বা প্রায় মৃত অবস্থায় রয়েছে তার কোনো সরকারি পরিসংখ্যান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তৈরি হয়নি।
তবে এই এপ্রিলেই নদ-নদী বিষয়ক বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি) তাদের গবেষণায় বলেছে, দেশে অন্তত ৮১টি নদী পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে বা চরম সংকটাপন্ন হয়ে শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে।
২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে সরকারি তথ্য, বিভিন্ন গবেষণাপত্র ও সাময়িকী এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে তথ্য নিয়ে ‘ড্রাইড-আপ রিভার্স অব বাংলাদেশ’ শিরোনামে এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আরডিআরসি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের নদীগুলো ‘বিপজ্জনকভাবে’ বাস্তুসংস্থানজনিত সংকটের মুখে আছে। তার ফলে নদীকেন্দ্রিক বিস্তীর্ণ এই অঞ্চলে মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ‘হুমকির’ মধ্যে পড়েছে।
মৃত ও মৃতপ্রায় নদ-নদী
আরডিআরসির ওই প্রতিবেদন অনুসারে, খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজশাহী ও কুষ্টিয়া অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য হারে নদ-নদী মরে গেছে বা সংকটাপন্ন অবস্থায় পৌঁছেছে।
এর কারণ হিসেবে প্রকট দূষণ, নদীতে অতিরিক্ত সেডিমেন্ট (পলি, কাদা, নুড়িপাথর, বালু) জমে যাওয়া, দ্রুত নগরায়ণ এবং অববাহিকার সঙ্গে সংযোগ হারানোর কারণে প্রাকৃতিকভাবে নদীপ্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার কথাই ঘুরে-ফিরে এসেছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ওই ৮১টি নদীর মধ্যে খুলনা বিভাগে সর্বাধিক ২৫টি নদ-নদী রয়েছে। এরপর রয়েছে রাজশাহীতে, ২০টি। এছাড়া রংপুরে ১৫টি, চট্টগ্রামে ৬টি, ময়মনসিংহে ৫টি, ঢাকায় ৪টি, বরিশালে ৩টি এবং সিলেটে ৩টি নদী রয়েছে। এগুলোর বাইরে কিছু নদী সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে।
মৃত এবং সংকটাপন্ন নদ-নদীগুলো হলো: আলাই, আত্রাই, বেগবতী, বাঙালি, বড়াল, বেতনা, ভৈরব, ভোদরাবতী, ভোলা, ভুলি, বিলাশ, বুড়িখোড়া, চন্দনা, চন্দ্রাবতী, চিকনাই, চিত্রা, চুনা, ধলাই, ধলেশ্বরী, ধরলা, ঢেপা, দুধকুমার, ফটকি, গলঘেসিয়া, গাঙ্গিনা, ঘাঘট, গোমতী, গনেশ্বরী, গড়াই, গুমানি, হানু, হরিহর, হিসনা, হোজা, হুরা সাগর, ইছামতি, যমুনা, কাহুয়া, কাকশিয়ালী, কালিগঙ্গা, কালপানি, করতোয়া, কাটাখালী, খাকদোন, খোলপেটুয়া, কোহেলিয়া, কপোতাক্ষ, কুলিক, কুমার, কুশিয়ারা, মহানন্দা, মানস, মাথাভাঙ্গা, মহিষাবান, মরিচ্চাপ, ময়ূর, মুহুরী, মুরাদিয়া, নবগঙ্গা, নাগর, নারদ, নরসুন্দা, পদ্মা, পাগলা, পুনর্ভবা, সন্ধ্যা, সেলোনিয়া, সাগরখালী, শালিখা, শিব, শোলমারী, শুক, সোমেশ্বরী, সোনাই, সুখদহ, সুরমা, টাঙ্গন, তিস্তা, তিতাস, তুলসীগঙ্গা ও লেংগা।
এসব নদ-নদীর অনেকগুলোই সেই ব্রিটিশ শাসন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত নানা সংগ্রাম, ইতিহাস আর ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষী হয়ে আছে।
কেন নৌপথ গুরুত্বপূর্ণ?
আরডিআরসি তাদের গবেষণায় বলেছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথ দেশের বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং পণ্য ও গণপরিবহন নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক নদী ব্যবস্থার একটি বাংলাদেশ; যেখানে মোট ২৪ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি নদী, খাল ও জলাশয় রয়েছে।
বর্ষাকালে এই নৌপথের প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার নৌযান চলাচলের উপযোগী থাকে; যেখানে শুষ্ক মৌসুমে এটি কমে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটারে নেমে আসে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, নৌপথ পণ্য পরিবহনের জন্য সড়ক ও রেলপথের তুলনায় ব্যয় সাশ্রয়ী। কারণ, নদী পথে পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত নৌকা সড়ক ও রেলপথের যানবাহনগুলোর তুলনায় জ্বালানি সাশ্রয়ী।

আরডিআরসি তাদের প্রতিবেদনে বলছে, সড়ক পথে প্রতি টন মালামাল পরিবহনে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয় ২ টাকা ৮১ পয়সা থেকে ৩ টাকা ৫১ পয়সা। আর রেলপথে খরচ হয় ১ টাকা ৯৬ পয়সা।
অন্যদিকে, নদীপথে এই খরচ ১ টাকা ১২ পয়সার মতো; যা বিভিন্ন সময়ে সামান্য ওঠানামা করে।
একেকটি বার্জ কয়েক ডজন ট্রাকের সমান পণ্য পরিবহন করতে পারে, যা পণ্য পরিবহনে রীতিমতো এককপ্রতি খরচ কমিয়ে দেয়।
নৌপথের আরেকটি সুবিধা হচ্ছে, সড়ক পথের মতো যানজটের ঝুঁকি নেই, ফলে পণ্য পরিবহনে বিলম্ব হয় না বললেই চলে। তাছাড়া সড়ক বা আকাশপথের যানবাহনের তুলনায় জলযান অধিক পরিবেশবান্ধব হয়ে থাকে।
দেশের দক্ষিণ এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলে অনেকগুলো দুর্গম এলাকা রয়েছে, যেখানে অন্যান্য বাহনের চেয়ে নদীপথে সংযোগ স্থাপন সহজ। ফলে শস্য, কয়লা, নির্মাণ সামগ্রী এবং শিল্পজাত পণ্য পরিবহনের জন্য নৌপথ যেমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই এটি এই অঞ্চলে কৃষিকাজ, মাছ ধরা এবং অন্যান্য বাণিজ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
যেসব কারণে সংকটে নদী
নদ-নদী মরে যাওয়া বা সংকটাপন্ন হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ উঠে এসেছে আরডিআরসির গবেষণায়।
• ব্যারেজ, বাঁধ এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের ফলে উজানে পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহে ব্যাঘাত ঘটায় নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে।
• নিয়মিত খননের অভাবে নদীগুলোতে অতিরিক্ত পলি জমা হচ্ছে। এটি নদ-নদীর গভীরতা এবং নাব্যতা কমিয়ে দিয়েছে; যার ফলে বর্ষাকালে বন্যা এবং শুষ্ক মৌসুমে নদী শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
• শিল্প স্থাপনার বর্জ্য, গৃহস্থালির বর্জ্য এবং কৃষিজ বর্জ্যের (রাসায়নিক সার, কীটনাশকের অধিক ব্যবহার) কারণে নদীগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে দূষিত হচ্ছে। বিষাক্ত রাসায়নিক, অপরিশোধিত পয়ঃনিষ্কাশন এবং সার থেকে অতিরিক্ত ক্ষতিকারক পরিস্থিতি তৈরি করছে, যার ফলে জলজ বাস্তুতন্ত্রের অবনতি ঘটছে এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হচ্ছে।
• অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং কৃষি সম্প্রসারণের ফলে নদীতীরে দখলদারিত্ব বেড়েছে। এই কার্যকলাপগুলো নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহকে সংকুচিত এবং সীমাবদ্ধ করেছে; যা নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
তিনভাবে মরেছে নদীগুলো
আরডিআরসির গবেষণাটি যখন হয়, তখন সংস্থাটির চেয়ারম্যান ছিলেন বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নিয়মিত প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য এই নদীগুলোকে খনন করতে হবে; যা করা হয় না। আবার বরেন্দ্র অঞ্চলে ফারাক্কার কারণে নদীগুলোর প্রবাহ নেই, এটাও একটা বড় সমস্যা। এছাড়া দখল তো আছেই।”
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের মতে, তিনটি কারণে নদী মরে যাচ্ছে। প্রথমত, আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোতে উজানের বাঁধ। দ্বিতীয়ত, ক্ষতিকর স্থাপনা। তৃতীয়ত, দখল-দূষণ।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যখন পানিপ্রবাহ কমে আসে, মানুষ এমন দখল করেছে, যে ওই নদীগুলো মরে গেছে বা বেদখল হয়ে গেছে। যেমন-তিস্তা। দেখা যায়, প্রভাবশালীরা এগুলো করছে। আর একটি হচ্ছে, দূষণ। প্রচণ্ড পরিমাণে শিল্প দূষণ হচ্ছে।
“যদি ১০০টা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কথা বলি, ১০ শতাংশ বাদে বাকি সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানই তাদের অপরিশোধিত তরল বর্জ্য নদী বা খালে ফেলছে। যার কারণে এগুলো দূষিত হয়ে গেছে। যাকে বলে বায়োলজিক্যালি ডেড। অর্থাৎ, এখানে কোনো প্রাণই থাকতে পারবে না।”

পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, “আবার স্থাপনার কথা যদি বলি, কিছু নদীতে ব্রিজ হচ্ছে। যেখানে নদী হচ্ছে ১০ ফুট, দেখা যাচ্ছে ব্রিজ হয়েছে পাঁচ ফুট।
“ফলে নদীর অনেকটা জায়গা তখন ভরাট করতে হচ্ছে। নদীর প্রবাহ তখন কমে যাচ্ছে। এসব কারণেই আমাদের নদীগুলো মারা যাচ্ছে।”
পানি সম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আইনুন নিশাতের ভাষ্য, “তিনভাবে একটি নদী মরে যেতে পারে; ফিজিক্যালি, বায়োলজিক্যালি ও কেমিক্যালি।”
এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “নদ-নদীর তিন ধরনের পরিমাপ আছে। এর মধ্যে প্রথম হচ্ছে ভৌত পরিমাপ। আপনি যদি এটাকে আটকে দেন, কিংবা নদীর দুই পাড়কে আস্তে-আস্তে সংকুচিত করে নিয়ে আসেন, তাহলে একসময় নদী মারা যাবে।
“তারপর হচ্ছে অববাহিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে। যেমন: আমাদের উত্তরবঙ্গের বহু নদী; বর্ষায় পানি থাকে। শীতকালে পানি নেই। কারণ তার অববাহিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেখান থেকে পানি উৎপাদন হত, সেটি মৃত। একটা নদীর যদি জীবন শেষ হয়ে যায়, তাহলে সেটা মৃত। যেমন-বুড়িগঙ্গা। ওর জীবন শেষ। তৃতীয় হচ্ছে কেমিক্যাল বা দূষণ।
“নদীর মৃত্যু হতে পারে তিনটি উপায়ে; তার পানিপ্রবাহের যে ক্ষমতা ছিল সেটি নষ্ট হলে, তার জীবনপ্রবাহের যে ক্ষমতা ছিল সেটি নষ্ট হলে, আর হচ্ছে কেমিক্যালি বা দূষিত হয়ে।”

করণীয় কী
সংকটাপন্ন নদী রক্ষায় সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, এ প্রশ্নের জবাবে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “আমাদের ২০১৩ সালের পানি আইনের অধীনে আজ পর্যন্ত একটা ছোট্ট কাজও হয়নি। মূলত পরিবেশকে প্রাধান্য দিয়ে কৃষি, মৎস্য, পরিবেশসহ সবগুলো মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটা ব্যাপক পরিকল্পনা নিতে হবে।”
নিজেদের গৃহীত উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা ২০টা নদী নিয়ে বিস্তারিত কাজ করছি। এর মধ্যে দেশের সবচাইতে দূষিত তিনটা নদী লবনণদহ, হাঁড়িধোয়া, সুতাং নদী; এগুলো জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড থেকে খননের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
“আর পরিকল্পনা কমিশনে জমা আছে নয়টি প্রকল্প। তাছাড়া, ঢাকার চারটি নদী নিয়ে আমরা বিস্তারিত কাজ করছি। ওটা নিয়ে বিশ্ব ব্যাংক এবং এডিবির সাথে আমরা কথা বলছি; আমাদেরকে সাহায্য করার জন্য।”
রিজওয়ানা বলেন, “আমরা কয়েকভাবে কাজ করার চেষ্টা করছি, একটা হচ্ছে সমন্বয় বাড়ানো, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা করে কাজগুলো শুরু করে দেওয়া। একটা ব্যাপক ‘ইকো-রেস্টোরেসন’ পরিকল্পনা আমাদের প্রয়োজন।
“কিছু নদীতে বাঁধের ক্ষতিকর রেগুলেটরের স্থাপনার আমরা একটা তালিকা করেছি। যেগুলোর কারণে পানির প্রবাহ কমে গেছে। সেগুলো আমরা খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। আমি মনে করি, এই সরকার নীতি এবং আইনে কিছু পরিবর্তন এনে দিয়ে যাবে। অর্থাৎ, কাজটা শুরু করে দিয়ে যাবে। নদীর ক্ষেত্রে আমরা ইতোমধ্যে কর্মপরিকল্পনা শুরু করেছি।”

পর্যাপ্ত সময় না পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা তো অন্তর্বর্তী সরকার, আমরা একটা দেড় বছরের সরকার। ফলে, আমরা তো সব কাজ করতে পারব না, আমরা যেটা করতে পারি কিছু-কিছু জায়গায় উন্নয়নের নদী ব্যবস্থাপনার যে ধারা আছে, সেগুলো আমরা বদলাতে পারি।”
মোহাম্মদ এজাজ বলেন, “নৌপথগুলো গুরুত্ব দিয়ে তৈরি করতে হবে। এটার জন্য স্থায়ী এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করে, ধরে-ধরে কাজ করতে হবে।”
তিনি বলেন, “আমাদের এখানে প্রচুর সেডিমেন্ট (পলি) নদীতে পড়ে। তাই বারবার স্টাডি করে কতটুকু সেডিমেন্ট পড়ল, সেটি ধরে ধাপে-ধাপে কেটে প্রবাহগুলো ঠিক রাখার কাজ করতে হবে।”
নদী গবেষণা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘রিভারাইন পিপলের’ পরিচালক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দেশজুড়ে যত নদ-নদী আছে, সবগুলোই কোনো কোনো সংকটের মধ্যে রয়েছে। তার মধ্যে চরম সংকটাপন্ন দেশের অন্তত অর্ধেক নদ-নদী।”
তার দাবি, নদ-নদীর সরকারি তালিকাটি অসম্পূর্ণ। এর বাইরেও আরও অনেক নদ-নদী আছে।
তিনি বলেন, “নদীগুলোর জন্য কয়েকটা পদক্ষেপ জরুরি। এক হচ্ছে শুধু নদীর দেখভাল করবে এরকম একটা দপ্তর লাগবে। জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন যদি হয়, তাহলে জেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে তাদের কাজ লাগবে। তাদের নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার আছে, এরকম জনবল লাগবে। দুই-একটা নীতি বদলাতে হবে।”
এই নদী গবেষক বলেন, “দখল করলেও সেটা উদ্ধার করা যাবে। যদি সরকার চায়, সচেষ্ট হয়, তাহলে বাংলাদেশের সব নদীই উদ্ধার করা সম্ভব, দখলমুক্ত করা সম্ভব, দূষণমুক্ত করা সম্ভব। এবং সবগুলো নদীর প্রবাহ পুরোপুরি আগের মতো না হলেও অনেকটা প্রাণ ফেরানো সম্ভব।”
তবে এই নদীগুলো আর পুনরুজ্জীবিত করা যাবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা আছে আইনুন নিশাতের।
তিনি বলেন, “নদীর মাঝখানে অনেকগুলো নির্দিষ্ট এলাকা বানিয়ে প্রবাহ নষ্ট করেছে মানুষ। প্রবাহ নষ্ট হওয়া মানে এই নদী মৃত।
“তাহলে করণীয় কী, যে বাধাগুলো আছে প্রবাহের, এগুলো সব ভেঙ্গে ফেলতে হবে। প্রবাহকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে।”
আইনুন নিশাত বলেন, “পানির দূষণটা দূর করতে হবে, ফিজিক্যালি তার মূল আকৃতিটা ফেরত আনতে হবে। আর বহু নদী এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সংযুক্ত।
“সে সংযোগগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেগুলো মুক্ত করতে হবে। প্রাকৃতিকভাবে অববাহিকা বা ওয়াটারশেড রক্ষা করতে হবে।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে জনসংখ্যাও অনেক বেড়েছে। এত মানুষের জন্য তো জায়গা লাগবে। সেটা করার জন্য বন উজাড় করা হচ্ছে। জলাভূমি, নদী, প্লাবনভূমি ভরাট করে ফেলা হচ্ছে।
“এই অভ্যাস না বদলালে আমার বলতে কষ্ট হচ্ছে, এই নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা, কোনোদিনই সম্ভব হবে না।”
বাংলাদেশ নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (সেডিমেন্ট, কেমিকেল অ্যান্ড ওয়াটার পলিউশন) ফাতেমা রোকশানা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নদী সংকটাপন্ন হওয়ার পেছনে যে তিনটি কারণ উঠে এসেছে এগুলো পুরোপুরি সঠিক। হয়তো এখন সংকটাপন্ন আছে। তবে, কাজ করলে আমরা আশা করি এটা কমিয়ে করতে পারব।
“আমাদের অনেকগুলো নদীই আন্তঃসীমান্ত নদী। এসব নদীর ৯০ শতাংশ পানির উৎসই থাকে উজানে; আমাদের দেশের বাইরে। যেখানে আমাদের নিয়ন্ত্রণ কম। এ কারণে আমাদের নদীগুলোতে প্রবাহ কম থাকে। সেকারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যেটা হয়, আমাদের শাখা নদীগুলোর মুখ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে যায় শুষ্ক মৌসুমে৷ তখন আমাদের দূষণ সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেটা সংকটাপন্ন নদীতে পরিণত হয়।”
তিনি বলেন, “তাছাড়া আমাদের যে অনিয়ন্ত্রিত অবকাঠামো আছে এবং অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য আছে, এটা আমাদের নদীগুলোর ইকোসিস্টেমে মারাত্মক ক্ষতি করছে।
“এটা আমাদের সরকার এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যদি আরেকটু সচেতন হয়, তাহলে আমি মনে করি এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব৷ সংকটাপন্ন নদীগুলো দিয়ে আমাদের একটা প্রকল্প আছে, যেটা প্রাথমিক পর্যায়ে আছে।”
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মকসুমুল হাকিম চৌধুরী সোমবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি গত পরশু যোগ দিয়েছি এখানে। অনেকগুলো ম্যান্ডেট আছে, অনেক কাজ।
“সুপারিশকারী সংস্থা হিসেবে আমরা এগুলো শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। সে কাজগুলো চলছে এবং অনেকক্ষেত্রে কিছুটা কাজও হয়েছে। আমি খোঁজ-খবর নিচ্ছি সব বিষয়ে। কাজ শুরু করব।”
আরডিআরসির যত পরামর্শ
সংকটাপন্ন নদ-নদীগুলোর প্রাণ ফেরাতে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছে আরডিআরসি। এগুলো হলো–
১. গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর জন্য বৃহৎ পরিসরে খনন কার্যক্রম শুরু করা। অতিরিক্ত পলি অপসারণ, পানির প্রাকৃতিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার করা। ভবিষ্যতে পলি জমা রোধ এবং দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও খননকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
২. নদীতে ক্ষতিকারক দূষণকারী পদার্থের নিঃসরণ কমাতে শিল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কঠোর নিয়মকানুন প্রয়োগ করা। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে যথাযথ বর্জ্য শোধন সুবিধা স্থাপন এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাধ্য করা এবং পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা।
৩. নদী সংরক্ষণ উদ্যোগে স্থানীয় সম্প্রদায় এবং অংশীদারদের সক্রিয়ভাবে জড়িত করা। তাতে করে এসব প্রচেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে আরও কার্যকর এবং টেকসই হবে।
৪. পানি সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করার জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত চুক্তি জোরদার করা। উজানের ঢল মোকাবেলা এবং পারস্পরিক সুবিধা বাড়ানোর জন্য সহযোগিতামূলক পানি ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি, স্বচ্ছ এবং ন্যায্য নীতি তৈরির উপর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করা।