মুক্তিযুদ্ধের শব্দসৈনিক সাংবাদিক তোয়াব খানকে শেষ বিদায়

তোয়াব খানকে শুধু একটি দিনের স্মরণে সীমাবদ্ধ না রেখে তার কর্মের ভিতর দিয়ে তাকে আবিষ্কার করার তাগিদ দিলেন ভাই আবেদ খান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 3 Oct 2022, 09:14 AM
Updated : 3 Oct 2022, 09:14 AM

রাষ্ট্রীয় সম্মানের গান স্যালুট আর শ্রদ্ধা ভালোবাসায় ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিদায় জানানো হল সাংবাদিক তোয়াব খানকে।

সোমবার বেলা ১১টার দিকে তার কফিন শহীদ মিনারে পৌঁছালে প্রথমেই ঢাকা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয় এই মুক্তিযোদ্ধাকে, দেওয়া হয় গার্ড অব অনার।

এরপর রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের পক্ষে তার বঙ্গভবনের কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তার সহকারী সামরিক সচিব লে. কর্নেল জিএম রাজিব আহমেদ তোয়াব খানের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যবস্থাপনায় সংবাদকর্মী থেকে থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতকি ও রাজনৈতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় এরপর।

একুশে পদকপ্রাপ্ত এই সাংবাদিক গত শনিবার রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে মারা যান, তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।

শহীদ মিনারে তোয়াব খানের ভাই সাংবাদিক আবেদ খান বলেন, “আমরা প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে তোয়াব খানকে শুধু একটি দিনে স্মরণ করার মধ্য দিয়ে নয়, তার কর্মের ভিতর দিয়ে তাকে আবিষ্কার করতে হবে, গ্রহণ করতে হবে এবং ধারণ করতে হবে।

"আজকে বাংলাদেশ এক দিকে তাকিয়ে আছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভুলণ্ঠিত হতে দেওয়া যাবে না। একটি বিষয় সবাইকে মনে রাখতে হবে, আমাদের তরুণ প্রজন্ম যারা আসছে তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত করার সময় এখনই।”

আওয়ামী লীগের পক্ষে তোয়াব খানের কফিনে শ্রদ্ধা জানিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন “আবদুল গাফফার চৌধুরীর পর বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যে তোয়াব খান সম্ভবত সবার সিনিয়র ছিলেন। তিনিও অবশেষে চলে গেলেন। তার মৃত্যুতে আমাদের সংবাদপত্র জগতে এক বটবৃক্ষের বিশাল পতন হল।“

সাংবাদিক তোয়াব খানকে দেখার কথা স্মরণ করে কাদের বলেন, “তিনি হাঁকডাক করতেন না, নেতাগিরি করতেন না। নীরেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সাংবাদিকতায় ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। একাত্তরের শব্দ সৈনিক, বাহান্নোর ভাষা সৈনিক এবং বঙ্গবন্ধুর প্রেস সচিব ছিলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে অনেক পছন্দ করতেন। তার মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।"

শহীদ মিনারে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ছিলেন দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক আব্দুস সবুর ও উপ-দপ্তর সম্পাদক সায়েম খান।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, সম্মিলিত সাংস্কৃতি জোট, জাতীয় কবিতা পরিষদ, বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, সম্প্রতি বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা জানানো হয় প্রয়াত এ সাংবাদিকের প্রতি।

শহীদ মিনার থেকে তোয়াব খানের কফিন জাতীয় প্রেস ক্লাবে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে শেষ বিদায় জানান তার নবীন-প্রবীণ সহকর্মীরা।

জাতীয় প্রেস ক্লাব ছাড়াও বিএফইউজে, ডিইউজে, শিল্পকলা একাডেমি, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট, পিআইবি, ঋষিজসহ বিভিন্ন সংগঠন এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে ফুল দেওয়া হয় কফিনে।

সেখানে তোয়াব খানের জানাজার আগে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমীন এবং প্রয়াতের ছোট ভাই ওবায়দুল কবির খান বাচ্চু সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন।

পরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেই জানাজা হয়। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম, ইকবাল সোবহান চৌধুরী, মতিউর রহমান, আবুল কালাম আজাদ, সাইফুল আলমসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রের সম্পাদক, সাংবাদিক ইউনিয়ন নেতা শওকত মাহমুদ, ওমর ফারুক, জলিল ভুঁইয়া, জাকারিয়া কাজল, সোহেল হায়দার চৌধুরী এবং আনিসুল হক, আবদুল কাইয়ুম, সৈয়দ আবদাল আহমেদসহ নবীন-প্রবীণ সাংবাদিকরা অংশ নেন জানাজায়।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম বললেন, “তিনি নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। যে কোনো পরিস্থিতিতে তিনি নিজেকে মানিয়ে নিতেন। আমরা অবাক হতাম। কাছে থেকে চুপচাপ দেখতাম। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তোয়াব ভাই।”

প্রেস ক্লাবে শ্রদ্ধা নিবেদন ও জানাজা শেষে মরদেহ নেওয়া হয় গুলশানে তোয়াব খানের বাসভবনে।  

বাদ আসর গুলশান আজাদ মসজিদে আরেকবার জানাজা শেষে এই প্রবীণ সাংবাদিককে দাফন করা হয় বনানী কবরস্থানে, তার মেয়ে এষা খানের কবরে।

২০১৬ সালে একুশে পদক পাওয়া তোয়াব খানের জন্ম ১৯৩৪ সালের ২৪ এপ্রিল, সাতক্ষীরার রসুলপুর গ্রামে। তার সাংবাদিকতা জীবনের শুরু ১৯৫৩ সালে সাপ্তাহিক জনতার মাধ্যমে। ১৯৫৫ সালে যোগ দেন দৈনিক সংবাদে। ১৯৬১ সালে তিনি দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক হন। এরপর ১৯৬৪ সালে যোগ দেন দৈনিক পাকিস্তানে।

তোয়াব খান ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেস সচিব ছিলেন। তিনি প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ও প্রেস ইনস্টিটিউট অফ বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন। রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের প্রেস সচিবের দায়িত্বও পালন করেছিলেন তোয়াব খান। এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের প্রেস সচিবও ছিলেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শব্দসৈনিকের ভূমিকা পালন করেন তোয়াব খান। সে সময় তার আকর্ষণীয় উপস্থাপনায় নিয়মিত প্রচারিত হয় ‘পিণ্ডির প্রলাপ’।

স্বাধীনতার পরে দৈনিক পাকিস্তান থেকে বদলে যাওয়া দৈনিক বাংলার প্রথম সম্পাদক ছিলেন তোয়াব খান। ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি তিনি দৈনিক বাংলার সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

দৈনিক জনকণ্ঠের শুরু থেকে উপদেষ্টা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সর্বশেষ তিনি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রকাশিত দৈনিক বাংলার সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

Also Read: সাংবাদিক তোয়াব খান আর নেই

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক