Published : 09 Jun 2026, 10:16 PM
অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া আশ্বাস অনুযায়ী এবতেদায়ী মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত করার দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সমানে অনশন চালিয়ে আসা শিক্ষকদের ৭ জন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
তাদের দুইজনের অবস্থা ‘গুরুতর’ এবং অনশনস্থলেই তাদের স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে বলে ‘স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা শিক্ষক কল্যাণ কমিটি’র সদস্য সচিব আব্দুল হান্নান হোসেন জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “গত রোববার সকাল ১০টা থেকে আমরা আমরণ অনশন শুরু করেছি। ৪০ জনের বেশি শিক্ষক অনশন কর্মসূচি পালন করছেন।
“দীর্ঘ সময় পরও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নজরে আমরা আসতে পারিনি। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাবি দাওয়া নিয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি।”
অনশন কর্মসূচিতে অসুস্থ হয়ে পড়া শিক্ষকরা হলেন–ঠাকুরগাঁওয়ের পাটগাছিয়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসার মো. মোক্তার হোসেন, ময়মনসিংহের খুতশিয়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসার আব্দুর রহিম, নাটোরের গৌরীপুর স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসার মামুনুর রশিদ, পটুয়াখালীর শিপপুর স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসার আব্দুস সাত্তার, ভোলার দক্ষিণ-পশ্চিম রাজকৃষ্ণ শেন এবেতেদায়ী মাদ্রাসার নুরুন নবী, কুড়িগ্রামের এবতেদায়ী শিক্ষক মো. গোলাম আযম এবং পটুয়াখালীর দক্ষিণ দাসপাড়া এবতেদায়ী মাদ্রাসার শাহ আলম।
তাদের মধ্যে মো. মোক্তার হোসেন ও আব্দুর রহিমের অবস্থা ‘গুরুতর’ বলে জানিয়েছেন সংগঠনের সদস্য সচিব আব্দুল হান্নান হোসেন।
এমপিওভুক্তির দাবি আদায়ে গত ২১ মে থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে এই শিক্ষকরা। ঈদুল আযহার দিনও তারা অবস্থান কর্মসূচিতে ছিলেন। ২৫ মে তারা এ মাদ্রাসাগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন।
মাঝে একবার মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে সচিবালয়ে গিয়ে ব্যর্থ হন আন্দোলনরত শিক্ষকরা। এরপর গত রোববার সকাল থেকে তারা অনশন শুরু করেন।
আব্দুল হান্নান বলেন, "আমাদের এমপিওভুক্তি আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই শেষ। ১ হাজার ৮৯টি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা এমপিওভুক্তির নীতিগত অনুমোদনও পেয়েছে। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এমপিওভুক্তির প্রশাসনিক আদেশ জারি করছে না।
“অর্থ বিভাগে এমপিওভুক্তির টাকা বরাদ্দ দিতে এমপিও ঘোষণার প্রশাসনিক আদেশসহ বিভিন্ন তথ্য চেয়ে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে গত মার্চ মাসে চিঠি দিলেও এ বিভাগ প্রশাসনিক আদেশ জারি করেনি।”
তিনি বলেন, "এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের সাক্ষাৎ চেয়ে গত বুধবার আমরা সচিবালয় অভিমুখে পদযাত্রার চেষ্টা করলে পুলিশ তা আটকে দেয়। পরে তারা আমাদের সাতজন প্রতিনিধিকে ভেতরে নিয়ে গেলেও মন্ত্রী মহোদয় সচিবালয়ে না থাকায় আমরা হতাশ হয়ে ফিরে আসি।”
ইসলামি ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বয়ে যে শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে, সেই আলিয়া মাদ্রাসা পদ্ধতিতে পঠন-পাঠন হয় এবতেদায়ী মাদ্রাসায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমমান এই ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন হয় ১৯৮৪ সালে। এরপর চার দশক কেটে গেলেও শিক্ষকরা মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।
মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে অনুদানভুক্ত ১ হাজার ৫১৯টি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা এবং সহকারী শিক্ষকরা তিন হাজার টাকা করে অনুদান পেয়ে থাকেন।
এর বাইরে দেশে আরও ৫ হাজার ৯৩২টি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা রয়েছে, যেগুলো সরকারি কোনো অনুদান পায় না।
শিক্ষকদের আন্দোলনের মুখে ২০২৫ সালের শুরুতে স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসাগুলোকে প্রথমে এমপিওভুক্ত করে পর্যায়ক্রমে জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
ওই বছরের ২৫ জুন এবতেদায়ী মাদ্রাসা এমপিওভুক্তির নীতিমালা জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ।
ওই নীতিমালা অনুযায়ী অনুদানভুক্ত স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত করতে গতবছরের ৮ থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ।
গতবছরের ৩ নভেম্বর শর্তসাপেক্ষে অনুদানভুক্ত ১ হাজার ৮৯টি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত করার নীতিগত সিদ্ধান্তে অনুমোদন দিয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
তবে এ মাদ্রাসাগুলো এমপিওভুক্ত করে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি।
সংগঠনের আহ্বায়ক শামসুল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "২০২৫ সালের জুলাই মাসে মাদ্রাসাগুলো এমপিওভুক্তির আবেদন নেওয়ার পর প্রায় ১০ মাস অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত একটি মাদ্রাসাও এমপিওভুক্ত করা হয়নি। এতদিন পরেও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর একজন শিক্ষকের বেতনও ছাড় করেননি।
"এবতেদায়ী মাদ্রাসাগুলো বরাবরই অবহেলিত থেকেছে। সরকার ২০১৩ সালে ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন অথচ একটি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা জাতীয়করণ বা এমপিওভুক্ত করার কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেন নাই। ফলে শিক্ষকরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন এবং শিক্ষার্থীরা ও আধুনিক ও ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্তবর্তীকালীন সরকার স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসাগুলোকে এমপিওভুক্ত করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মত জাতীয়করণের ঘোষণা দিলেও আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি।"