Published : 25 Jul 2025, 01:10 AM
দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো প্রধান বিচারপতিকে গ্রেপ্তার হয়ে দাঁড়াতে হল আসামির কাঠগড়ায়।
সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে বৃহস্পতিবার রাতে ‘হত্যা আসামি’ হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন জানিয়ে আদালতে হাজির করা হয়।
এর আগে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা অন্য মামলায় দণ্ডিত হয়েছেন। তবে তিনি গ্রেপ্তার করা যায়নি।
এদিন সকালে দেশের ঊনবিংশতম প্রধান বিচারপতি খায়রুল হককে ধানমন্ডির বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তবে কোন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তা তখন স্পষ্ট করা হয়নি।
পরে জানানো হয়, ৬ জুলাই যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের করা যুবদল কর্মী আহাদ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে সাবেক এই প্রধান বিচারপতিকে। রাত পৌনে ৮ টার দিকে তাকে আদালতে হাজির করা হয়।
মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতের হাজতখানায় রাখা হয় খায়রুল হককে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ি থানার ইন্সপেক্টর খালেদ হাসান তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন।
সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় দিয়ে আলোচিত-সমালোচিত বিচারপতি খায়রুল হককে আদালতে হাজির করার আগে থেকেই বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা সিএমএম আদালতের সামনে অবস্থান নেন। তারা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। তার ফাঁসিও দাবি করেন বিক্ষোভ দেখানো সেই আইনজীবীরা।
এদিকে খায়রুল হককে আদালতে আনার পর চলাচল কিছুটা সীমিত করা হয়। সিএমএম আদালতের দুই পাশের প্রধান দুটি ফটক বন্ধ রাখা হয় কিছু সময়ের জন্য।
তার আগেই তাকে আদালতে হাজির করাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশও মোতায়েন করা হয়। ছিলেন সেনাসদস্যরাও।
কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সোয়া ৮টার দিকে তাকে ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম মো. ছানাউল্ল্যাহর আদালতে আসামির কাঠগড়ায় তোলা হয়।
এ সময় কাঠগড়ার সামনে এবং ভেতরে কয়েকজন পুলিশ সদস্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। ৮টা ১৬ মিনিটে বিচারক এজলাসে উঠেন৷
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুল হক দিদার, ঢাকা বারের সভাপতি খোরশেদ মিয়া আলম, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম ঢাকা বার ইউনিটের আহবায়ক খোরশেদ আলম সাবেক এই প্রধান বিচারপতিকে কারাগারে আটক রাখার পক্ষে শুনানি করেন।
তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেন এই আইনজীবীরা। এ সময় খায়রুল হককে হাসতে দেখা যায়। কয়েকবার মাথা উঁচু করে দেখেন, তার বিরুদ্ধে কে কী অভিযোগ করছেন।
তবে শুনানিতে খায়রুল হকের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না।
শুনানির এক পর্যায়ে ৮টা ৩২ মিনিটে বিদ্যুৎ চলে যায়৷ তখন মোবাইল ফোন সেটের বাতি জ্বালিয়ে বাকি শুনানি নেওয়া হয়।
শুনানি শেষে ৮টা ৩৪ মিনিটের দিকে আদালত সাবেক প্রধান বিচারপতিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ৮টা ৩৫ মিনিটের দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে তাকে আবার হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
গত বছর গণঅভ্যুত্থানের সময় ১৮ জুলাই ঢাকার যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে নিহত হন যুবদল কর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদ। ওই ঘটনায় তার বাবা আলাউদ্দিন যাত্রাবাড়ী থানায় এ মামলা দায়ের করেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪৬৭ জনকে সেখানে আসামি করা হয়। এজাহারে আসামির তালিকার ৪৪ নম্বরে রয়েছে বিচারপতি খায়রুল হকের নাম। এখন সেই মামলায় তাকে কারাগারে পাঠানো হল।
এর আগে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের করা মামলায় রায় এসেছে। ২০২১ সালের ৯ নভেম্বর দেওয়া রায়ে পৃথক দুই ধারায় তাকে ১১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে ওই মামলায় গ্রেপ্তার হননি এস কে সিনহা। মামলা দায়েরের আগেই তিনি দেশ ছাড়েন।
এ বি এম খায়রুল হক ২০১০ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০১১ সালের ১৭ মে পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তার নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ ২০১১ সালের ১০ মে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেয়। তার মধ্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবৈধ হয়ে যায়।
খায়রুল হক অবসরে যাওয়ার পর ২০১৩ সালের ২৩ জুলাই তাকে তিন বছরের জন্য আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই মেয়াদ শেষে কয়েক দফা পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয় তাকে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ১৩ অগাস্ট আইন কমিশন থেকে পদত্যাগ করেন খায়রুল হক। এরপর তার বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
কারাগারে খায়রুল হক: মোবাইলের বাতি জ্বালিয়ে শুনানি
'হত্যার আসামি' হয়ে কারাগারে সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক