প্রিন্সের ক্যামেরায় জলবায়ু সংকটে নারীর জীবন

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নারী ও কিশোরীদের ভুগতে হচ্ছে অনেক বেশি; সেই গল্প তুলে এনেছেন আলোকচিত্রী নাইমুজ্জামান প্রিন্স।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 15 Nov 2022, 03:31 PM
Updated : 15 Nov 2022, 03:31 PM

জলবায়ু পরিবর্তনে বৈরী হয়ে উঠছে প্রতিবেশ, মানুষ হারাচ্ছে বাস্তুভিটা, সবচেয়ে বেশি ভুগতে হচ্ছে নারীদের। আলোকচিত্রী নাইমুজ্জামান প্রিন্স মানুষের সেই সঙ্কটের গল্প ক্যামেরাবন্দি করে চলেছেন প্রায় দুই দশক ধরে।

তার তোলা ছবি নিয়ে জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে চলছে আলোকচিত্র প্রদর্শনী ‘জলবায়ু সংকট এবং বাংলাদেশে নারী ও মেয়েদের অধিকার সমুন্নত রাখা’।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাড়তে থাকা ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ও খরাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে নারী ও কিশোরীদের ওপর পড়া প্রভাব এ প্রদর্শনীর মূল বিষয়।

ঢাকা, খুলনা, সাতক্ষীরা, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ ও চট্টগ্রামে বিভিন্ন সময়ে তোলা এসব আলোকচিত্রে সিডর, আইলা, আম্পানের মত ঘূর্ণিঝড় আর সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট, সুনামগঞ্জের ভয়াবহ বন্যায় উদ্বাস্তু হওয়া মানুষের গল্পও এসেছে।

বাছাই করা ৮৮টি আলোকচিত্র নিয়ে গত শনিবার শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী ১৬ নভেম্বর পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে প্রিন্স বলেন, সুনামগঞ্জে বন্যার প্রভাবে এক হাজারেরও বেশি মানুষ তাহিরপুর উপজেলা থেকে স্থায়ীভাবে ঢাকার কামরাঙ্গীর চরে এসেছেন। মাসখানেক আগে কামরাঙ্গীর চরে গিয়ে তাদের ছবি তুলেছেন তিনি। প্রদর্শনীতে সেসব ছবিও রয়েছে।

দেশের ৬ শতাংশের বেশি মানুষ এখন শহরের বস্তিতে বাস করে। তাদের একটি অংশও জলবায়ু উদ্বাস্তু বলে প্রিন্সের ভাষ্য।

“সাধারণত মানুষ কাজের খোঁজে শহরে আসে। জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষের একটি বড় অংশ শহরে আসা ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছে না। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদী সংলগ্ন ভোলা জেলা থেকে বাস্তুচ্যুত অনেক মানুষ ঢাকার মিরপুরে এসে আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে তারা গড়ে তুলেছে ভোলা বস্তি।

প্রিন্স বলেন, সাধারণত একটি পরিবারের পুরুষ সদস্য জীবিকা ও বসবাসের জায়গা খুঁজতে শুরুতে শহরে আসেন। স্ত্রী ও সন্তানদের তারা ফেলে আসে। তাদের অনেকে নিখোঁজ হয়, পাচার হয় কিংবা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়।

“বিশেষ করে যখন সামাজিক ব্যবস্থা ভেঙে যায়, তখন এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে,” বলেন এ আলোকচিত্রী।

তিনি বলেন, জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) ও অস্ট্রেলিয়া সরকারের সহযোগিতায় বাংলাদেশ সরকার দুর্গম এলাকার নারী ও কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করছে।

“এই প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের বিভিন্ন দুর্যোগে নারী, কিশোরী ও বিপন্ন জনগোষ্ঠীর লড়াই ও সংগ্রামের মুহূর্তগুলো একগুচ্ছ আলোকচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।”

পাশাপাশি ইউএনএফপিএ এবং অন্যান্য দাতা সংস্থা, স্থানীয় বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর দুর্যোগ মোকাবেলার কার্যক্রমও উঠে এসেছে প্রদর্শনীতে।

উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের গল্পও বেশ কয়েকটি আলোকচিত্রে এসেছে জানিয়ে প্রিন্স বলেন, “সমুদ্র পৃষ্ঠার উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বাড়ছে। ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার কারণে লবণাক্ত পানি বেড়িবাঁধ উপচে কৃষিজমিতে প্রবেশ করছে, যার ফলে কৃষিজমিতে লবণাক্ততা বেড়ে ফসলের স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

“ফলাফল হিসেবে প্রতিদিন লবণাক্ত পানি ব্যবহারে নারীরা জরায়ুর বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ, প্রজনন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছেন।”

খুলনা অঞ্চলে ছবি তোলার অভিজ্ঞতা জানিয়ে প্রিন্স বলেন, “একের পর এক ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় বারবার তাদের বাড়ি-ঘর হারাচ্ছে, শত শত মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। যাদের মধ্যে নারী, কিশোরী ও বিপদাপন্ন জনগোষ্ঠী রয়েছে।

“বছরে অন্তত একটি করে স্বাভাবিকের চেয়ে উঁচু জোয়ার শহরকে প্লাবিত করে। জরুরি পরিস্থিতিতে প্রায়ই নারী-কিশোরীরা সবচেয়ে বেশি হুমকিতে পড়ে। যেহেতু হাসপাতাল থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জায়গা, খাবার ও পানি পাওয়ার সুযোগ সীমিত বা কমে যায়, তাই নারী ও কিশোরীরা বিভিন্ন ধরণের সহিংসতা ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির আশংকায় থাকে।”

ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা ও আম্পানের সময় মানুষ কীভাবে বিপন্ন হয়েছিল, সেই ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরে প্রিন্স বলেন, “ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকা। বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় ঘূর্ণিঝড়ের মাত্রা ও তীব্রতা বেড়ে যাচ্ছে, যা উপকূলীয় এলাকাগুলোকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলেছে।”

জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের উচ্চ ঝুঁকিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তানের পরই যে বাংলাদেশের অবস্থান, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে প্রিন্স বলেন, “এই ঝুঁকিতে নারী ও মেয়েরা  রয়েছে। যদিও নারী এবং কিশোরীরা এই বৈশ্বিক উষ্ণতা বা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী নয়- তবুও তারাই বন্যা, নদী-ভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং অন্যান্য প্রতিকূল আবহাওয়ার নেতিবাচক প্রভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

“নারী ও শিশুরা ক্রমবর্ধমান হারে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, তারা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে দুর্যোগের পর শিশুদের বিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক