১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

‘জীবনের শেষ পেইন্টিং এটা, পারলে যত্ন করে রেখে দিও’

“আর ভালো লাগের না, আমি ক্লান্ত। কী আর করার এত অসুখ নিয়ে?”

‘জীবনের শেষ পেইন্টিং এটা, পারলে যত্ন করে রেখে দিও’

অনিকের আঁকা ছবি।

অনুপম মল্লিক আদিত্য

Published : 16 Sep 2026, 11:19 PM

Updated : 16 Sep 2026, 11:19 PM

রাজধানীর চাঁনখারপুল এলাকা থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী অনিক চন্দ্র পালের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের সময় তার হাতে আঁকা ছবি ও কয়েকটি চিরকুট পাওয়া গেছে। 

মঙ্গলবার রাতে লাশ উদ্ধারের সময় সতীর্থ ও পুলিশ বলেছিল, অনিক দীর্ঘদিন ধরে ‘হতাশায় ভুগছিলেন’। তার ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া চিরকুটেও যেন একই হতাশার ছাপ ফুটে উঠেছে।   

সতীর্থরা বলছেন, চিরকুটে জীবনের শেষ পেইন্টিং আঁকার কথা লিখে সিলিংয়ের সঙ্গে ফাঁস নেন অনিক। চিরকুটে তিনি লেখেন, “আমার জীবনের শেষ পেইন্টিং এটা। কেউ পারলে নিজের কাছে যত্ন করে রেখে দিও। ইচ্ছা ছিল এটা প্রদর্শনীতে দেব। কিন্তু এটা আর হবে না। কেউ পারলে আমার শেষ ইচ্ছা পূরণ করিও…”

অনিক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুরে। অনিকের বাবা অরবিন্দু পাল ও মা শিলা রানী পাল সিলেটের শিবগঞ্জ এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকেন।

আরেকটি চিরকুটে অনিক নিজের সিলেটি ভাষায় লিখেন, “সবাই খুশি থাকিও…। আর ভালো লাগের না, আমি ক্লান্ত। কী আর করার এত অসুখ নিয়ে? এমনিতেই কয়েকদিন পর মারা যাইমু। কয়েক বছর পর আমি অন্ধ হয়ে যাইমু, যা আমি মানতে পারতাম নায়। তাই এই সিদ্ধান্ত।”

সিলেট ও সেখানকার সকল মানুষকে মনে পড়ছে জানিয়ে তিনি লিখেন, এখন তিনি সবচেয়ে সুখী মানুষ।

দুটি চিরকুটের নিচে নিজের নামের স্বাক্ষরও দিয়েছিলেন অনিক। তিনি একটি কোচিং সেন্টারে ক্লাস নিতেন, সেখানে হাজিরা দিতে হতো তাকে। সেই হাজিরার স্বাক্ষরের সঙ্গে চিরকুটের স্বাক্ষরের অনেকটা মিল খালি পাওয়া যায়।

এর আগে অনিকের মেসমেট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জয় ভূঁইয়া বলেন, “অনিক বেশ কিছুদিন ধরে হতাশায় ভুগছিলেন। পারিবারিক ও আর্থিক সমস্যার পাশাপাশি প্রেমিকার সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তিনি আরও চুপচাপ হয়ে পড়েছিলেন। বিচ্ছেদের পর অনিকের মোবাইল ফোন বন্ধ ও ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়। এরপর থেকেই তিনি মেসে একা চুপচাপ থাকতেন।”

ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী পায়েল দাস বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অনিক চুপচাপ স্বভাবের ছিল। প্রায় সময়ই কানে হেডফোন লাগিয়ে দীর্ঘ সময় নিজের মত রুমের মধ্যে থাকত। মেসমেটরা দুপুরে নক করে ওর সাড়া না পেয়ে সেটি স্বাভাবিক বলেই ধরে নিয়েছিল। আর ওর রুমমেটও বাসায় ছিল না, সে ভারতে গেছে।”

তার ভাষ্য, রাতে অনিককে ফোনে না পেয়ে তার বান্ধবী মেসমেটদের জানায়। তখন দীর্ঘক্ষণ দরজায় নক করেও সাড়া না পাওয়ায় তাদের সন্দেহ হয়। পরে জানালা ভেঙে ঘরের ভেতর তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।

বুধবার দুপুরে সিলেট থেকে তার বাবা আসার পর তিনি ময়নাতদন্ত ছাড়াই ছেলের মৃতদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ির দিকে রওনা দেন।

অনিকের সঙ্গে একই মেসে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী অঙ্কুর কর্মকার। দুটি চিরকুট ও পেইন্টিংয়ের বিষয়ে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পেইন্টিং ও চিরকুট দুটো তার রুম থেকেই পাওয়া যায়। আর এটা অন্য কারও লেখা হতে পারে, এরকম কোনো সন্দেহ কারও মধ্যে নেই। সবারই মনে হচ্ছে এটা অনিকের শেষ বার্তা।”

Image

অনিক চন্দ্র পাল।

অনিকের আঁকা ছবি প্রসঙ্গে একই বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই পেইন্টিংয়ে অনিক কিছু বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে মনে হচ্ছে। এখানে সে মোট তিনটি ঘড়ি এঁকে তিনটি ভিন্ন সময় দিয়েছে। হয়ত এই তিনটি সময় দিয়ে সে বুঝিয়েছে, কখন কখন সে আত্মহননের চেষ্টা করেছে। কিংবা কখন সে মারা যাবে এরকম কিছু। আর চোখগুলো ছোট ছোট করে আঁকা, হতে পারে এটা তার চিরকুটের লেখার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। তাদের রুমের রং ছিল হলুদ আর সে পেইন্টিংয়ে হলুদ রঙের ব্যবহার করেছে।

“আরেকটি বিষয়, পেইন্টিংয়ে কিন্তু তেল রং ব্যবহার করা; যা দেখে মনে হচ্ছে সে সময় নিয়ে কাজটি করেছে। কারণ তেল রং শুকাতে সময় লাগে।”

বংশাল থানার ওসি আশিক ইকবাল সকালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ছেলেটি শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিন হতাশায় ভুগছিল বলেও আমরা জানতে পেরেছি। সে জন্য আত্মহত্যা করে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।”

ঝুলন্ত লাশ: জবির অনিক ‘হতাশায় ভুগছিলেন’

চাঁনখারপুলের মেস থেকে জগন্নাথ ছাত্রের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার