Published : 05 Apr 2026, 12:18 AM
হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্থান সংকটে এমন উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুদের ভর্তি নিতে পারছে না রাজধানীর দুই হাসপাতাল।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশু স্বাস্থ্য হাসপাতালে গত কয়েকদিনে হামের লক্ষণ নিয়ে আসা শিশুদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথা বলছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
তবে রোগীদের স্বজনরা বলছেন, অসুস্থ শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে ভর্তি করাতে না পেরে তারা পেরেশান। এ কারণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অন্যত্র যাওয়ার পরামর্শ দিলেও তারা সরছেন না। সিট না থাকলেও মেঝেতে থাকার শর্তেও হাসপাতালে থাকছেন তারা।
আজিমপুর মাতৃসদনে মূলত প্রসূতিদের সেবা দেওয়া হলেও অনেকটা বাধ্য হয়ে হাম আক্রান্ত রুগী রাখতে হচ্ছে। ছয়জন শিশুর জন্য আলাদা একটি ওয়ার্ড করা হয়েছে। এর বাইরে কোনো রোগী নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ।
অপরদিকে মিরপুর রোডের বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালের সবগুলো বিভাগই শিশু চিকিৎসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত চিকিৎসা সেবার মধ্যে বেশির ভাগ হামের রোগীকে ভর্তি করা হলে অন্য শিশুরা বড় ধরনের শঙ্কায় পড়বেন।
এ হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ৫৪টি সিট নিয়ে আলাদা একটি ওয়ার্ড করলেও সেখানে ভর্তি আছে ৬৪ জন রোগী। এর বাইরে আর কোনো রোগী নিচ্ছেন না তারা। এমনকি গত দুই দিনে প্রায় অর্ধশতাধিক রোগী আশপাশের হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেওয়ার কথাও বলেছে কর্তৃপক্ষ।
আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশু স্বাস্থ্য হাসপাতালে দেড় বছর বয়সি মেয়ে ফাতিমা ইসলাম আদিবাকে নিয়ে গত রোববার ভর্তি হয়েছেন তার মা মনি আক্তার।

মনি আক্তার বলেন, “মিরপুর থেকে এখানে আসছি। অন্য হাসপাতালে যাওয়ার পর সিট পাই নাই। পরে একজন কইলো- এখানে পাব। এখানে এসেও দেখি খারাপ অবস্থা। অনেক কাকুতি মিনতি করে ভর্তি হয়েছি। পাঁচ দিন পরে এখন শরীর কিছুটা ভালো। জ্বর আসে, আবার ওষুধ দিলে ভালো হয়ে যায়।”
শরীয়তপুর থেকে ১৪ মাসের ছোট ছেলে মো. হাসানকে নিয়ে আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশু স্বাস্থ্য হাসপাতালে এসেছেন সালমা আক্তার।
তিনি বলেন, “আমার বড় ছেলেরে এই হাসপাতালে চিকিৎসা করাইছি। হাসানের বাবা বিদেশে থাকে, ছেলেটার জ্বর ঠান্ডা অনেক বেশি হওয়ার পরে চার দিন অপেক্ষা করেছি। শরীরে হামের অবস্থা দেখে সরাসরি এখানে আসছি। আমি তো এই হাসপাতাল ছাড়া আর কিছু চিনি না। তাই ডাক্তারদের অনেক অনুরোধের পর ভর্তি করেছে। এখন ছেলেটা সুস্থ হচ্ছে।”
এ হাসপাতালের পরিচালক রাশিদুল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের এখানকার চিকিৎসাতো মূলত প্রসূতিদের এবং নবজাতকদের সেবা দেওয়া। তারপরও শিশু বিভাগ থাকার কারণে শিশু চিকিৎসাও দেওয়া হয়। অনেকে এখানে আসেন, বলতে গেলে বাধ্য হয়েই আমরা ছয়টা সিট দিয়ে একটা ওয়ার্ড চালু করেছি। এর বাইরে আর কোনো রোগী নিচ্ছি না।”
শিশুদের জন্য বিশেষায়িত ঢাকার শিশু হাসপাতালে হাম আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত চারজন মারা গেছেন।
রোগীর প্রচণ্ড চাপ থাকলেও এখানে ভর্তি নিতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আউটডোর সেবা দিলেও ভর্তির জন্য পরামর্শ দিচ্ছে ঢাকার অন্য হাসপাতালে যাওয়ার।
গাজীপুরের একজন পোশাক কারখানার কর্মীর স্ত্রী মঞ্জিলা আক্তার চার দিন আগে ৮ মাসের বাচ্চা নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ঢাকার শিশু হাসপাতালে।
তিনি বলেন, “সরকারী হাসপাতাল ছাড়া আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই। এখানে নিয়ে আসছি, প্রথমে ডাক্তাররা বলছে, সিট নাই। পরে অকেক্ষণ বসে থেকে হাতে পায়ে ধরে এখানে ভর্তি হয়েছি। এখন ছেলেটার শরীর কিছুটা ভালো।”
একই কথা বলেন গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে আসা এক মাদ্রাসা শিক্ষকের স্ত্রী মাহফুজা আক্তার। তিনি বলেন, “আজকে ১২ দিন হইলো ভর্তি হইছি, ৭ মাসের মেয়েটার শরীর অনেক খারাপ হয়ে গেছিল। প্রথম দিকে আইসাও ভর্তি হইতে কষ্ট হইছে। এখন কিছুটা ভালো।”

হাসপাতালের পরিচালক মো. মাহবুবুল হক বলেন, “এখানে নিচতলায় ২ নম্বর ওয়ার্ড পুরোটা হামের জন্য দিয়েছি। সেখানে ৫৪টি সিট আছে। শনিবার বিকাল পর্যন্ত ৬৪ রোগী ভর্তি আছে। আর কোনো রোগী নিচ্ছি না, ভর্তি নেওয়ার সুযোগও নাই।”
এ পর্যন্ত শিশু হাসপাতালে ১৭২ জন্য হামের রোগী চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য দেন তিনি।
ভর্তি না হতে পেরে আর্তনাদ
হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে আসার পর চিকিৎসককে দেখাতে পেরেছেন তারা। চিকিৎসক ভর্তির পরামর্শ দিলেও ভর্তি হতে না পেরে শিশুদের মায়েদের অনেককে আর্তনাদ করতে দেখা গেছে শিশু হাসপাতালে।
সেখানে ৯ মাসের শিশুকে নিয়ে আসা টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের বাসিন্দা রিকশাচালক সুমন মিয়া বলেন, “টাঙ্গাইল সদর হাসপাতাল থেকে বলছে এখানে আসতে। এখানে ডাক্তার দেখে বললো ঢাকা মেডিকেল, সোহরাওয়ার্দী বা অন্য কোনো জায়গায় যেতে। কই যামু, ৯ মাসের মেয়েটার অবস্থা ভালো না স্যার। একটু বলে দেখেন ভর্তি করে কি না।”
একইভাবে এক বছরের ছেলেকে নিয়ে কাঁদতে দেখা যায় মানিকগঞ্জ থেকে শামীম ইসলামের স্ত্রী আসমা আক্তারকে।
তিনি বলেন, “এখান থেকে তো না করে দিছে, এখন কই যামু। কামালের বাপতো সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে গেছে ওইখানে সিট আছে কি না দেখতে। আমরা গরীব মানুষ, আর কই যামু।”
এক শিশু থেকে অন্যরা আক্রান্ত হচ্ছে
দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ বাড়ার পেছনে এক শিশুর মাধ্যমে অন্য শিশুর আক্রান্ত হওয়ার কথা বলেছেন আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশু স্বাস্থ্য হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক সুমনা খন্দকার শিমু।
তিনি বলেন, অভিভাবকদের সচেতনতার ওপরও নির্ভর করে আক্রান্তের সংখ্যা। বিশেষ করে এখন জ্বরে আক্রান্ত কোনো শিশু স্কুলে নেওয়া উচিৎ না। এ ক্ষেত্রে যারা টিকা নিয়েছে তারাও আক্রান্ত হতে পারে। কারণ আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নির্ভর করে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর।
শিশু হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন, হাম প্রতিরোধে প্রথমে দরকার সচেতনতা বাড়ানো। প্রাদুর্ভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাক প্রাথমিক স্কুল বন্ধ করে দেওয়া দরকার ছিল।