Published : 01 Oct 2025, 12:48 AM
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ঢাকার ধানমন্ডিতে সচিব পদমর্যাদার যে কর্মকর্তাদের ১২টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিয়েছিল, সেই বরাদ্দ নিয়ে দুদক অনুসন্ধান শুরু করার পর গৃহায়ন কর্তৃপক্ষকেই দুষছেন ওই কর্মকর্তারা।
সম্প্রতি দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে নিজেদের এ অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন সাবেক এ সরকারি কর্মকর্তারা।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুদকে আসা অভিযোগে বলা হয়, ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘দিনের ভোট রাতে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত’ সচিব পদমর্যাদার ১২ কর্মকর্তাকে ‘পুরস্কার হিসেবে’ শেখ হাসিনার আমলে ‘পরিকল্পিতভাবে’ এসব ফ্ল্যাট দেওয়া হয়। প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগের ‘সত্যতা পাওয়ার’ কথা জানিয়েছে দুদক।
সংস্থাটির অধিকতর অনুসন্ধানের মধ্যে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের একটি তদন্ত কমিটির সুপারিশ আমলে নিয়ে ৮ জুলাই এসব বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বরাদ্দ বাতিল করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
ফ্ল্যাট বরাদ্দ নেওয়ার ক্ষেত্রে নীতিমালা ভঙ্গের অভিযোগের বিষয়ে জানতে বরাদ্দপ্রাপ্তদের গত ১৭, ১৮ ও ২১ সেপ্টেম্বর ডেকেছিল দুদক। তাদের মধ্যে কয়েকজন দুদকে সরাসরি হাজির হয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন। কেউ কেউ লিখিত বক্তব্য জমা দিয়েছেন। আবার অনেকে হাজির হননি; লিখিত বক্তব্যও জমা দেননি।
যারা নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন, তাদের ভাষ্য—ফ্ল্যাট বরাদ্দের তারা নিয়ম মাফিক আবেদন করেছেন, প্রাতিষ্ঠানিক কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তার জন্য দায়ী গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে জানতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগে যোগাযোগ করা হলে তাদের তরফে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সাবেক সচিবদের ফ্ল্যাট বরাদ্দে অনিয়ম সংক্রান্ত তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) আলমগীর হুসাইন। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
এরপর গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের সচিব মনদীপ ঘরাইকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
এরপর চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগমের সঙ্গে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এসএমএস ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
যাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়, তারা হলেন—দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত বিচারক জহুরুল হক, সাবেক সিনিয়র সচিব ইউনুসুর রহমান, সাবেক সিনিয়র সচিব ও দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক কমিশনার মোজাম্মেল হক খান, সাবেক সচিব এম এ কাদের সরকার, সাবেক সিনিয়র সচিব এম আসলাম আলম, সাবেক সচিব আকতারী মমতাজ, সাবেক সচিব সিরাজুল হক খান, সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মঞ্জুরুল বাছিদ, সাবেক রেজিস্ট্রার জেনারেল ও সাবেক সিনিয়র জেলা জজ সৈয়দ আমিনুল ইসলাম, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ, সাবেক সিনিয়র সচিব ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান এবং সাবেক সিনিয়র সচিব এস এম গোলাম ফারুক।

‘ডুপ্লেক্স’ ফ্ল্যাট পান কেবল দুদক কমিশনাররা
দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কমিশনের জিজ্ঞাসাবাদে উপস্থিত হয়েছিলেন সাবেক সচিব আকতারী মমতাজ ও সিরাজুল হক খান। আর লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন সাবেক সিনিয়র সচিব এম আসলাম আলম।
তবে দুদকের সাবেক দুই কমিশনার কেউই হাজির হননি। জহরুল হক লিখিত বক্তব্য পাঠিয়ে দাবি করেছেন যে, ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট বরাদ্দের ক্ষেত্রে তিনি কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি করেননি। অন্যদিকে মোজাম্মেল হক খান উপস্থিত হননি, লিখিত বক্তব্যও পাঠাননি। অন্যরা একটি করে ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিলেও দুদকের সাবেক এই দুই কমিশনারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুটি করে ফ্ল্যাট বরাদ্দ নেন। পরে সেগুলোকে ডুপ্লেক্স ঘোষণা করা হয় এবং সেই অনুযায়ী নির্মাণকাজ চলতে থাকে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নীতিমালা ভেঙে ১২ কর্মকর্তার নামে ফ্ল্যাট বরাদ্দের বিষয়ে গত ৫ মে একটি বেসরকারি টিভি স্টেশন খবর প্রচার করে। এতে বলা হয়, ধানমন্ডি-৬ এর প্লট নম্বর ৬৩ মূলত সরকারি খাস জমি, যার বাজারমূল্য অত্যন্ত বেশি। অভিযোগ রয়েছে, শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশে এই জমি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং সেখানে ১৪ তলা একটি ভবন নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়। ভবনটিতে রয়েছে দুটি ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট ও নিচতলাসহ দুই তলা গাড়ি পার্কিং।
এই অভিযোগ আমলে নিয়ে ৮ মে অভিযান চালায় দুদক; জানায়— প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগের ‘সত্যতা মিলেছে’। এরপর ৯ জুলাই সংস্থাটি জানায়, অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য দুদকের সহকারী পরিচালক আল-আমিনকে প্রধান করে দুই সদস্যের একটি তদন্ত দল গঠন করেছে। দলের অন্য সদস্য হলেন উপসহকারী পরিচালক নাহিদ ইমরান। আর আগের দিন ফ্ল্যাট বরাদ্দের কথা জানায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুরুতে অন্যদের মতো দুদকের সাবেক দুই কমিশনারও একটি করে ফ্ল্যাটের জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তারা ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট বরাদ্দ নেন। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ওই প্রকল্পের মূল পরিকল্পনা ও নীতিমালায় কোথাও ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটের উল্লেখ ছিল না।
এ বিষয়ে জানতে দুদকের সাবেক কমিশনার জহরুল হক ও মোজাম্মেল হক খানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সাড়া মেলেনি।
জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাবেক ১২ আমলাকে তলবের বিষয়ে দুদকের মহাপরিচালক আক্তার হোসেন বলেন, “অনিয়মের মাধ্যমে ফ্ল্যাট বরাদ্দ পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য দেওয়ার জন্য তলব করা হয়েছিল। কেউ কেউ এসেছেন, বক্তব্য দিয়েছেন, কেউ আবার লিখিত বক্তব্য পাঠিয়েছেন।
“এখন অনুসন্ধান কর্মকর্তা সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং যাচাই-বাছাই শেষে পরবর্তী আইনানুগ পদক্ষেপের জন্য সুপারিশ করবেন। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে কমিশন।”
আরও পড়ুন:
ফ্ল্যাট বরাদ্দে 'অনিয়ম': সচিব পদমর্যাদার সাবেক ১২ কর্মকর্তাকে দুদকে তলব
নির্মাণাধীন ভবনে সাবেক সচিব, বিচারক ও কর্মকর্তার ফ্ল্যাট, অনুসন্ধানে দুদক
সাবেক সচিব, বিচারক ও কর্মকর্তাদের ১২ ফ্ল্যাটের বরাদ্দ বাতিল
‘নিয়ম ভেঙে’ সচিব মর্যাদার ১২ কর্মকর্তাকে ফ্ল্যাট, সত্যতা পাওয়ার দাবি দুদকের