Published : 24 Dec 2025, 10:54 AM
কার্যক্রমে নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গেরিলা প্রশিক্ষণের ঘটনায় ভাটারা থানার সন্ত্রাস বিরোধী আইনের মামলায় মেজর মো. সাদিকুল হককে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে।
এদিকে এদিকে সন্ত্রাস বিরোধী আইনের দুই মামলার পর এবার হত্যা মামলায় তার স্ত্রী সুমাইয়া জাফরিনকে গ্রেপ্তারের আবেদন করেছে পুলিশ।
বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তাদের উপস্থিতিতে গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়ে শুনানি হবে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন পুলিশের এসআই জাকির হোসেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের গুলশান বিভাগের ইন্সপেক্টর মো. জেহাদ হোসেন গত ১৫ ডিসেম্বর মেজর সাদিককে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন। আর জুলাই আন্দোলনের সময় কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম হত্যা মামলায় গত ১১ ডিসেম্বর জাফরিনকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন ভাটারা থানার এসআই সুমন বিশ্বাস।
আসামিদের উপস্থিতিতে শুনানির জন্য এদিন ঠিক করা হয়।
মেজর সাদিককে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদনে বলা হয়, “সামরিক আদালত থেকে গত ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে চাকুরিচ্যুত করে মেজর সাদিককে তিন মাসের কারাদণ্ড প্রদান করে ঢাকা কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরণ করেছেন মর্মে জানা যায়। তিনি এ মামলার জড়িত সন্দেহভাজন আসামি। সেনাবাহিনীতে চাকরি করা অবস্থায় গত ৩ জুলাই এবং ৮ জুলাই সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দিনব্যাপী ভাটারা থানাধীন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা সংলগ্ন কেবি কনভেনশন হলের ভেতর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, যার কার্যক্রম বর্তমানে স্থগিত ও নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগ একত্রিত হয়ে একটি গোপন সভা অনুষ্ঠিত করে তাদের কর্মকাণ্ডকে গতিশীল ও সমর্থকদের উৎসাহিত এবং দেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি বিষয়ক আলোচনা এবং প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে একত্রিত হয়েছিল।
“মেজর সাদিক প্রধান প্রশিক্ষক এবং কানেক্টরের ভূমিকায় থেকে রুপগঞ্জ থানাধীন পূর্বাচল সি-সেল নামক রিসোর্ট, পূর্বাচল নামক রিসোর্টে, কাটাবনের একটি রেস্টুরেন্ট, মিরপুর ডিওএইচএস সহ উত্তরায় ১২নং নম্বর সেক্টর, আঞ্চলিক পাসপোর্টের বিপরীতে প্রিয়াংকা সিটিতে ২নং গেইট সংলগ্ন তার স্ত্রী সুমাইয়া জাফরিনসহ তার ফ্ল্যাট বাসায় একাধিকবার এ ধরনের গোপন প্রশিক্ষণ/ওয়ার্কশপ করেছিল।”
আবেদনে আরও বলা হয়, “মেজর সাদিক অপারেশন ঢাকা ব্লকেড'র কানেক্টরের ভূমিকায় ছিলেন। এ আসামি ওই সংগঠনের মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন নেতাকর্মীদের সংগ্রহ করে ডাটা এন্ট্রি, বিভিন্ন গোপন কোড তৈরিতে সহায়তা করে। তিনি অন্যান্য আসামিদের গোপন কোড এবং ওই কোডের অনুকূলে ছদ্মনাম প্রদানসহ অনলাইন সিগন্যাল অ্যাপ ও হোয়াটসঅ্যাপ এবং গুগলের মাধ্যমে ওই সংগঠনকে একত্রিত করার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে নিযুক্ত ছিল। কেবি কনভেনশন হলে থাকা সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে তার উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া যায়। তিনি গত ৩ জুলাই ও ৮ জুলাই মামলার ঘটনাস্থলে স্বশরীরে উপস্থিত থেকে সেখানে উপস্থিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যার কার্যক্রম বর্তমানে স্থগিত ও নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৩০০/৪০০ জন নেতাকর্মীসহ প্রশিক্ষণ প্রদান এবং অনুষ্ঠানে প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন মর্মে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। গ্রেপ্তার কয়েকজন আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তার সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেছেন।”

সুমাইয়া জাফরিনকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদনে বলা হয়, “প্রাথমিক তদন্তে এ আসামি মামলার ঘটনার সাথে জড়িত থাকার তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে এবং অর্থের যোগান দেওয়াসহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র জনতাকে নিবৃত্ত করার জন্য মামলার ঘটনা ঘটায় মর্মে গোপন তদন্তে প্রকাশ পায়। ভদন্তকালে জানা যায়, ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশের কোটা বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সাধারণ ছাত্র-জনতার ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে রাস্তায় অবস্থান করলে এজাহারনামীয় আসামিদের মধ্যে সিনিয়র নেতাদের নির্দেশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার আন্দোলন নস্যাৎ করার জন্য এজাহার নামীয় আসামিদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সমর্থিত এ আসামিসহ অজ্ঞাতনামারা তাদের হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র-সস্ত্রসহ ধাওয়া করে আগ্নেয়াস্ত্রে মাধ্যমে এলোপাতারি গুলি করলে সাইফুল ইসলাম আহত হয়।
“তাকে চিকিৎসার জন্য কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা ১২টার সময় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ আসামি মামলার ঘটনার আগেই ঘটনাস্থলের আশপাশে সন্দেহজনক অবস্থান করছিল বলে জানা যায়।
“সন্ত্রাসবিরোধী মামলার বিবরণীতে বলা হয় গত ৮ জুলাই বসুন্ধরাসংলগ্ন কে বি কনভেনশন সেন্টারে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ একটি গোপন বৈঠকের আয়োজন করে। সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বৈঠকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা মিলে ৩০০-৪০০ জন অংশ নেন। তারা সেখানে সরকারবিরোধী স্লোগান দেন। বৈঠকে পরিকল্পনা করা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ পাওয়ার পর সারা দেশ থেকে লোকজন এসে ঢাকায় সমবেত হবেন। তারা ঢাকার শাহবাগ মোড় দখল করে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে দেশে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করবেন।”
এ ঘটনায় ১৩ জুলাই ভাটারা থানার এসআই জ্যোতির্ময় মন্ডল সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলাটি দায়ের করেন।
সাইফুল হত্যা মামলায় বলা হয়েছে, “জুলাই আন্দোলনের শেষ দিন ৫ অগাস্ট বেলা ১১ টা থেকে ১২ টার মধ্যে ভাটারা থানাধীন কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন সাইফুল। তাকে চিকিৎসার জন্য কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা ১২টার সময় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।”
এ ঘটনায় সাইফুলের বোন মৌসুমী নাসরীন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১৭ জন আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গেরিলা প্রশিক্ষণের ঘটনায় ভাটারা থানার মামলায় গত ৬ অগাস্ট সুমাইয়া জাফরিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৭ অগাস্ট তার পাঁচ দিনের রিমান্ড হয়।
রিমান্ড শেষে ১২ অগাস্ট সুমাইয়া জাফরিন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। গত ১৭ ডিসেম্বর গুলশান থানার সন্ত্রাস বিরোধী মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় সুমাইয়া জাফরিনকে।