Published : 20 Apr 2025, 10:22 PM
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে ‘প্রাচীনতম’ এই প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন পদ্ধতি, রাজস্বনীতি ও কর্মপরিধিতে আমূল পরিবর্তন আনার সুপারিশ করেছে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন।
এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইউনিয়ন ও উপজেলায় চেয়ারম্যান না রেখে নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে কাউন্সিল বা পরিষদ গঠন।
রোববার বিকালে অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে কমিশনের সদস্যরা তাদের দুই খণ্ডের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে তুলে দেন।
পরে সন্ধ্যায় সাড়ে ৬টার দিকে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে আসেন তারা।
সেখানে কমিশনের সুপারিশগুলো সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরেন তোফায়েল আহমেদ।
তিনি বলেন, “আদিমতম রাষ্ট্র হচ্ছে স্থানীয় সরকার। বৃটিশ আমল থেকে এর পরিচালন নীতি ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এখনও সেটা বলবৎ, ডিসি অফিস এর নিয়ন্ত্রণ করে। এখনকার সরকার ব্যবস্থাটা রেডিক্যাল (আমূল) চেঞ্জ করতে হবে। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা পর্যায়ে গণতান্ত্রিক রূপ দিতে বলেছি।”
স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের প্রধান বলেন, “এখন ইউনিয়ন, উপজেলা পরিষদ ও এ ধরনের স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত চেয়ারম্যানের হাতে অধিকাংশ ক্ষমতা থাকে। সদস্যদের হাতে তেমন ক্ষমতা থাকে না। সেজন্য নির্বাচন থেকে চেয়ারম্যান পথ বাদ দিতে বলেছি। নির্বাচিত সদস্যরা তাদের পরিষদ প্রধান নির্বাচিত করবেন।
“প্রয়োজনের ছোট পরিসরের একটি পর্ষদ গঠন হবে। তাহলে স্থানীয় সরকার পরিচালনায় সব নির্বাচিত প্রতিনিধি ভূমিকা রাখতে পারবেন। এক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা যাবে না।”
স্থানীয় সরকার নির্বাচন পদ্ধতিতে সংস্কার আনার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “পৌর ও সিটি করপোরেশনেই একই সিস্টেম করতে হবে। এখন পাঁচটি মৌলিক আইনে স্থানীয় সরকার চলে। এটাকে একটা আইন ও কিছু বিধি দিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব।
“২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে হিসাব করে দেখা গেছে ২২৫ দিন চলে যায় এই নির্বাচন শেষ করতে। এটা ৪০ দিনে নামিয়ে আনা সম্ভব। এই নির্বাচনে ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল। সেটাও কয়েকগুণ কমে যাবে।”
স্থানীয় সরকারের অর্থায়ন পদ্ধতিতে সংস্কার আনার পরামর্শ দিয়ে তোফায়েল আহমেদ বলেন, নিজস্ব সম্পদ বৃদ্ধি ও ব্যয়ের খাত বাড়ানোর পরিকল্পনা করতে হবে। অর্থায়নের একটা বড় অংশ দিবে কেন্দ্রীয় সরকার। কেন্দ্রীয় সরকার এখন মোট জাতীয় বাজেটের দশমিক ৫ শতাংশের কম ব্যয় করে স্থানীয় সরকারের পেছনে, এটা বাড়াতে হবে। কারণ, জনগণ কেন্দ্রীয় সরকারকেও কর দিচ্ছে। এক তৃতীয়াংশ মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট স্থানীয় সরকারকে দিতে হবে। অর্থ ব্যয় নজরে রাখতে হবে।

জনশক্তির কর্ম বণ্টনের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু সংস্কারের প্রস্তাব করেছে কমিশন।
কমিশনের প্রধান বলেন, “একই দায়িত্ব স্থানীয় সরকার আবার কেন্দ্রীয় সরকারকে দেওয়া আছে। কিন্তু স্থানীয় সরকারকে বাজেট দেওয়া হয় না, কাজ দেওয়া হয়। ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ন্যস্ত সরকারি কর্মচারীদের বেতন স্থানীয় সরকার দেবে। সেজন্য কেন্দ্র থেকে অর্থ বরাদ্দ থাকবে।”
তিনি বলেন, “উপজেলায় ১৭টা সরকারি দপ্তর আছে, ইউনিয়নে সাতটা মন্ত্রণালয়ের নয়জন কর্মকর্তা কাজ করেন। কিন্তু এখানে কোনো তৎপরতা নেই, কাজ নেই, বাজেট নেই। এগুলো সক্রিয় করতে হবে। ইউনিয়নে একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল করতে হবে। যেখানে তিনজন ডাক্তার থাকবেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১২ জন ডাক্তার থাকার কথা। কিন্তু থাকছেন না। সরকার এটা চালাইতে না পারলে প্রাইভেটাইজেশন করুক।”
স্থানীয় বিচার ব্যবস্থা সংস্কারের প্রস্তাব দিয়ে কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপজেলায় ফৌজদারি ও দেওয়ানি পূর্ণাঙ্গ আদালত স্থাপন করতে হবে। এটা নতুন কিছু নয়, এর চর্চা এক সময় ছিল। গ্রাম আদালতের ‘অপব্যবহার’ হচ্ছে। মানুষ সলিশে ফিরে গেছে।
কমিশনের প্রস্তাব হল- “গ্রাম আদালত বিলুপ্ত করতে হবে। উপজেলায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। নির্বাহী বিভাগের মাধ্যমে বিচার চালানোর প্রয়োজন নেই। থানায় সালিশের নামে আদালত বসানো হয়, এটা বন্ধ করতে হবে।”
স্থানীয় সরকারের জনবল নিয়োগ ও বেতনের জন্য একটা নিয়োগবিধি করার সুপারিশ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “সরকার ৭০ ভাগ, স্থানীয় সরকার ৩০ শতাংশ বেতন দেবে। গ্রাম পুলিশ ও টাউন পুলিশ গঠন করতে হবে।”
কমিশনের সভাপতি তোফায়েল আহমেদ বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা চালু করতে বলেছি। সেখানে জেলা পরিষদ নির্বাচন চালু করা দরকার। সেখানে সরকারি কাজে ভ্যাট টেক্স মওকূফ হচ্ছে, এটা বাতিল করতে বলেছি।”
সংবাদ সম্মেলনে সংস্কার কমিশনের সদস্য ফেরদৌস আরফিনা ওসমান, আবদুর রহমান, মাহফুজ কবীর, মাশহুদা খাতুন শেফালী, মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম, ইলিরা দেওয়ান ও কাজী মারুফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
গত ১৮ নভেম্বর দ্বিতীয় ধাপে গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য, শ্রম, নারী বিষয়ক এবং স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনসহ আরো পাঁচটি সংস্কার কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার।
স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী ও কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাব প্রণয়ন করার লক্ষ্য নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদকে প্রধান করে এই সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এই অধ্যাপকের নেতৃত্বে কাজ করেন সাত সদস্য।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের হাল ধরা অন্তর্বর্তী সরকার দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাত সংস্কারের উদ্যোগ নেয়।
এরই ধারাবাহিকতায় প্রথম ধাপে গঠিত ছয়টি সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ইতোমধ্যে প্রকাশ করা হয়েছে। কমিশনগুলো হলো: সংবিধান সংস্কার, বিচার বিভাগ সংস্কার, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার, জনপ্রশাসন সংস্কার, পুলিশ সংস্কার ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার।
দ্বিতীয় ধাপে গঠিত পাঁচটি কমিশন হচ্ছে: স্বাস্থ্যখাত সংস্কার, শ্রম সংস্কার, নারী বিষয়ক সংস্কার, স্থানীয় সরকার সংস্কার ও গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন।
এসব কমিশনকে ৯০ দিনের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও কমিশনের মেয়াদ বাড়িয়ে প্রথমে ৩১ মার্চ এবং দ্বিতীয় দফায় ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়।
কমিশনগুলোর মধ্যে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা পড়ে ২২ ফেব্রুয়ারি।
এরপর ২২ মার্চ জমা দেওয়া হয় গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন।
শনিবার নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর বাকি রইল স্বাস্থ্য ও শ্রম কমিশনের প্রতিবেদন।
পুলিশ সংস্কার ছাড়া অন্য পাঁচ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছতে ২০ মার্চ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
আরো পড়ুন:
স্থানীয় সরকার সংস্কার: চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার হাতে