নিষিদ্ধ পলিথিন: ৫ বছরে দণ্ড পেয়েছে ১৭০ জন

প্রতি বছর ১৩ কোটি টন কৃষি মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে ইটভাটায়। এখন পরিবেশবান্ধব ব্লক ইট ব্যবহার বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 6 Feb 2024, 05:30 PM
Updated : 6 Feb 2024, 05:30 PM

নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন শপিং ব্যাগের উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার বন্ধে পরিচালিত অভিযানে গত ৫ বছরে ৬ কোটি টাকার বেশি জরিমানা করা হয়েছে।

এই সময়ে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ১৭০ জনকে; জব্দ করা হয়েছে দুই হাজার টনের বেশি মালামাল।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তরে এ তথ্য জানান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী।

দেশে ২০০২ সালে পলিথিনের শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ করে আইন করা হয়। সেখানে বলা হয়, “পলিথিনের শপিং ব্যাগ বা অন্য যে কোনো সামগ্রী, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর, সেসব উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রয়, বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শন, মজুদ, পরিবহন ইত্যাদি নিষিদ্ধ।”

এরপর দুইযুগ পেরিয়ে গেলেও যত্রতত্র পলিব্যাগের ব্যবহার বন্ধ হয়নি। বিভিন্ন সময়ে অভিযান চললেও উৎপাদন ও সরবরাহ কমেনি।

লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য নূর উদ্দিন চৌধুরী নয়নের এক প্রশ্নের জবাবে পরিবেশ মন্ত্রী বলেন, পরিবেশ বিনষ্টকারী পলিথিনের উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রম এবং ব্যবহার বন্ধে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এ বিধিনিষেধ আরোপ করা আছে। আইন অনুযায়ী বিভিন্ন পুরুত্বের পলিথিনের উৎপাদন, বিপণন কার্যক্রম ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে পরিবেশমন্ত্রী বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন শপিং ব্যাগ বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর নিজস্ব নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আসছে।

২০১০ সালের জুলাই থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রমের আওতায় নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন উৎপাদনকারী কারখানাগুলোকে উচ্ছেদ, মালিকের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হচ্ছে।

সাবের হোসেন চৌধুরী জানান, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ২ হাজার ৫১৬টি অভিযান পরিচালনা করে ৪ হাজার ২০৭টি মামলা করে ৬ কোটি ১৭ লাখ ৮৭ হাজার ২৫০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

এসব অভিযানে ১৭০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ২ হাজার ৭১ দশমিক ৩৭ টন পলিথিন, দানা ও কাঁচামাল জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়াও ১৬টি নিয়মিত মামলা করা হয়েছে। জনসচেতনতা বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে পরিবেশের ওপর প্লাস্টিক পণ্যের বিরূপ প্রভাব নিয়ন্ত্রণে প্লাস্টিক পণ্যের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব পচনশীল প্লাস্টিকের ব্যবহার প্রচলনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সরকার ‘কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২১’ প্রণয়ন করেন।

পরিবেশমন্ত্রী বলেন, ‘সিঙ্গেল ইউজ’ প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধে হাই কোর্টের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালের ২১ জুন উপকূলীয় অঞ্চলের ১২ জেলার ৪০টি উপজেলাকে কোস্টাল এরিয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেসব এলাকায় ‘সিঙ্গেল ইউজ’ প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধে ৩ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।

বছরে ৩০০ কোটি ব্লক ইট উৎপাদন সম্ভব

সংসদ সদস্য নূর উদ্দিন চৌধুরী নয়নের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে পরিশেমন্ত্রী বলেন, “ইটভাটা বন্ধ করা বা গুঁড়িয়ে দেওয়া-সেটা শুধু সমাধান নয়। বর্তমান সনাতন পদ্ধতিতে যেভাবে ইট তৈরি হয়, সেখান থেকে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে আমাদের যেতে হবে।

“আমরা ব্লক ইটের দিকে তাকিয়ে আছি। ৫০০টি ইটভাটা প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করেছি (গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য)। সেখানে প্রতিটি ইটভাটা গড়ে বছরে ৫০ লাখ ইট উৎপাদন করে, অর্থাৎ ২৫০ কোটি।”

বর্তমানে ব্লক তৈরি করার যে সক্ষমতা রয়েছে, সেখানে বছরে ৩০০ কোটি ইট উৎপাদন সম্ভব বলে তথ্য দেন মন্ত্রী।

তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা দিয়েছেন, আমরা পরিবেশবান্ধব ইটের দিকে অগ্রসর হব। বর্তমানে যে ইটভাটাগুলো আছে, সেগুলো আমরা পরিকল্পিতভাবে বন্ধ করব- যাতে উন্নয়ন ব্যাহত না হয়, ইটের দাম যেন বেড়ে না যায়।”

আগামী ১-২ বছরের মধ্যে ব্লক ইটের ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে সংসদ সদস্যদের সহযোগিতা চান মন্ত্রী।

সৈয়দ সায়েদুল হকের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে সাবের হোসেন বলেন, পরিবেশ ছাড়পত্র সহজীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৩ কোটি টন কৃষি মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে ইটভাটার জন্য, যার প্রভাব রয়েছে খাদ্য নিরাপত্তার উপর। এজন্যে ব্লক ইটের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বেদখল আড়াই লাখ একর বনভূমি

সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে পরিবেশমন্ত্রী বলেন, দেশের মোট আয়তনের ১৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ এলাকায় বনভূমি রয়েছে। বন অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রিত বনভূমির পরিমাণ ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশ। দেশের বনভূমির পরিমাণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে জবরদখল হওয়া বনভূমি উদ্ধারে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য মুজিবুল হকের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে সাবের হোসেন চৌধুরী জানান, ২ লাখ ৫৭ হাজার একর বনভূমি জবরদখল হয়েছে। এর পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২৭ হাজার একর বনভূমি পুনরূদ্ধার করা হয়েছে। বাকিগুলো উদ্ধারে কার্যক্রম চলছে।

“অনেক ক্ষেত্রে রাস্তা, উন্নয়ন প্রকল্প, বিদ্যুৎ লাইন বনের জমির ওপর দিয়ে যাচ্ছে। আগামীতে কোনো প্রকল্পে এ ধরনের বিষয় থাকলে তা প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করতে হবে।”

বিকালে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।