“এই দুই নম্বরি করে যে বিদেশে ১০-২০টা, ৩৭০টা বাড়ি করতে পারে তার মর্যাদা বেশি,” বলেন তিনি।
Published : 14 Feb 2025, 11:28 PM
‘হারাম উপার্জন’ থাকলে তাদের ইবাদত আল্লাহ কবুল করেন না এবং সেই শরীর বেহেশতে যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন।
চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর হজে যাওয়া, মসজিদ ও মাদ্রাসা কমিটির নেতা হওয়া- এসব সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়ে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শুক্রবার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে শবে বরাত উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত ওয়াজ ও দোয়া মাহফিলে সুদ ঘুষসহ হারাম উপার্জনের নানা দিক তুলে ধরেন ধর্ম উপদেষ্টা।
অসৎ রোজগারের কুফল নিয়ে দীর্ঘসময় বক্তব্য দেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, “আমাদের দেশে চাকরি শেষ হলে হজে যায়। দাড়ি-টাড়ি রাখে, জোব্বা গায়ে দিয়ে মসজিদ কমিটির সভাপতি, মাদ্রাসা কমিটির সেক্রেটারি- ঈদগা কমিটির অর্থ সম্পাদক হয়।
“অথচ সারা জীবন দুই নম্বর। এটা আমাদের সমাজের খুব সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা শহরে সাততলা বাড়ি হয় কী করে? আপনার বেতন কতো, স্কেল কতো?”
‘হারাম টাকা’ মসজিদে দিলে কবুল হবে না, কোরবানি দিলে কবুল হবে না, এমনকি হজও কবুল হবে না বলে মন্তব্য করেন উপদেষ্টা।
বহু বছর শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত থাকা খালিদ হোসেন শবে বরাতে হালুয়া-রুটির আনুষ্ঠানিকতাকে বাড়াবাড়ি বলে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “মূলত শিয়াদের একটি উপলক্ষ্য থেকে হালুয়া-রুটির বিষয়টি বাংলাদেশের মুসলমানদের সংস্কৃতিতে ঢুকেছে, যেহেতু শিয়ারা বহু বছর এই দেশ শাসন করেছে।
“কোন ফেকাহ কিতাবে- কোন হাদিসে হালুয়া বানাও, রুটি বানাও, গোস্ত-পরাটা খাও এরকম কোন বর্ণনা নাই। শবে বরাতের সাথে হালুয়া রুটির কোন সম্পর্ক নাই। এবাদতের রাতে সারা দিন রুটি বানাও, হালুয়া পাকাও, গরু গোস্ত পাক কর- মেয়েরা এসব করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায়। রাতের বেলা আর বেশি এবাদত করতে পারে না।”
তাহলে এই সংস্কৃতি এলো কোথা থেকে তার ব্যাখ্যা দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, “আপনারা জানেন এদেশ বহু বছর শাসন করেছে বৌদ্ধরা, পাল বংশের সময়। এরপর এই দেশ শতবছর শাসন করেছেন সনাতন ধর্মের লোকেরা, সেনরা (সেন বংশ)। এই দেশে শিয়ারা শাসন করেছে, মুর্শিদ কুলি খান- এই বাংলার রাজা, তিনি শিয়া ছিলেন। মুঘল সম্রাট জহিরউদ্দীন মুহাম্মদ বাবর সুন্নি, কিন্তু হুমায়ুন শিয়া ছিলেন। আলীবর্দী খান শিয়া, সিরাজউদ্দৌলা শিয়া ছিলেন। ফলে আমাদের এই দেশে বহু বছর ধরে শিয়াদের প্রভাব ছিল।
“এক কিতাবে আছে আজকের রাতে বহু বছর আগে শিয়াদের এক ইমামের জন্ম হয়েছে। কাজেই শিয়ারা খুশী হয়ে এই রাতে হালুয়া-রুটি বিতরণ করে। যেহেতু আমাদের দেশে বহুদিন যাবত শিয়াদের রাজত্ব ছিল কাজেই শবে বরাতের মাঝে ইমামের জন্মের হালুয়া-রুটি ঢুকে গেছে। আমাদের দেশে কিছু শিয়া আছে তারা এটা করুক, কিন্তু আমরা হালুয়া-রুটির পেছনে পড়ব কেন।”
শবে বরাতের সঙ্গে হালুয়া রুটির ন্যায্যতা দিয়ে ব্যাখ্যাগুলোকে ‘বেদআতি’ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, “আরেকটা দুর্বল বর্ণনা আছে যে, ওহুদের যুদ্ধে আমাদের নবী করিম (সা.) এর দাঁত ভেঙে গিয়েছিল। তো তিনি তখন শক্ত খাবার খেতে কষ্ট হবে বলে, নরম হালুয়া দিয়ে নরম রুটি খান- এরকম অনেকে বলেন। তো কোথায় ওহুদের যুদ্ধ আর কোথায় ১৪ শাবান এর শবে বরাতের রাত। হালুয়া-রুটি জায়েজ করার এসমস্ত তরিকা বেদাতি তরিকা, এগুলোর সাথে কোনো সম্পর্ক নাই।”
“তবে আরেকটা বর্ণনা আছে। এটা ফেকাহর বর্ণনা নয়, হাদিসের বর্ণনা নয়। একজন বুজুর্গ বলেছেন, এই রাতে অন্যান্য রাতের চেয়ে তুলনামূলক বেটার খাবার- মাছ, পোলাও, কাচ্চি এ জাতীয় একটু ভালো খাবার খায় বা মানুষকে একটু দেয় তো সারা বছর আল্লাহ ‘ফারাবত’ দেন।”
আমরা কি সৎ হতে পারি না?
উপদেষ্টা বলেন, “মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করেছি আজ ৫৪ বছর। যতটুকু আমাদের অগ্রসর হওয়ার কথা ছিল ততটুকু পারি নাই। আসুন না আগামী দিনগুলোতে আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশকে সুখী, সমৃদ্ধশালী ও স্থিতিশীল দেশ হিসেবে পরিচিত করি।”
তিনি বলেন, “মসজিদের ভেতর কাতারে কাতারে জুতার বাক্স আছে, আরএফএল কোম্পানি জুতার বাক্স বানাইতেছে। পৃথিবীর বহু দেশে জুতার বাক্স নাই। ইংল্যান্ডে নাই, নরওয়েতে নাই, সিঙ্গাপুরে নাই, এমনকি কলকাতায়ও। (কলকাতা) নিউমার্কেটের পূর্ব দিকে (মসজিদে) আমি একসময় ওযু করে জুতা হাতে নিয়ে ঢুকছি। মুয়াজ্জিন আমাকে বলেন- আমি জুতা নিয়ে ঢুকছি কেন? আমি বললাম, বাক্স খুঁজতেছি।
“মুয়াজ্জিন বললেন, বাক্সতো বাইরে, ওজুখানায়- মসজিদের ভেতরে কিছু নাই। ওই দেশের মানুষ মনে করে একটা মানুষ ইবাদত করতে আসছে, তার জুতা চুরি করা তো গুনাহ। কোনো মুসল্লি জুতা চুরি করে না। চোরে মুসল্লি সাজি জুতা চুরি করতে আসে।”
ফিনল্যান্ড, নরওয়ে- পৃথিবীর অনেক দেশ আছে যেখানে দরজা খুলে ঘুমাতে পারার বিষয়টি তুলে ধরে খালিদ হোসেন বলেন, “আমি গতমাসে লন্ডন থেকে আসছি। শীত হওয়ার কারণে চেরি ফলের পাতা নাই, কিন্তু চেরি ফল ধরে আছে গাছভর্তি। খুব উপাদেয় ফল। আমি চিন্তা করি যে, এখানে সেখানে এতো ফল ধরে আছে কেউ খাচ্ছে না কেন। কারণ তাদের পাবলিকের মধ্যে মোরালিটি আছে, নৈতিকতা বোধ আছে। ব্যক্তির বা রাষ্ট্রের একটা চেরি ফল কেন খাব আমি- এটা ভাবে তারা।
“আমেরিকার রাস্তার মাঝখানে আইল্যান্ডে আছে আপেল গাছ, লাল লাল আপেল ধরে আছে, কেউ ধরে না। আপনি এখানে রাখতে পারবেন? একেবারে গাছের গোড়াশুদ্ধ তুলে নিয়ে যাবে।”
লুটপাট করে বিদেশে পাচারের বিষয়টি তুলে ধরে ধর্ম উপদেষ্টা বলেন, “একটা চাকরি করলাম- সরকারি বা বেসরকারি। তারপর টাকা লুট করে বিদেশে বাড়ি বানাইলাম। সম্পূর্ণ অবৈধ টাকায়। মানি লন্ডারিং করে, বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠাইনি। এগুলোর জন্য আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে। হারাম টাকার যারা মালিক, অবৈধ টাকার যারা মালিক তাদের এবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল নাই।”
২৬ বছর ধরে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও ওয়াজ করার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “ওয়াজে তো মানুষ হাদিয়া-তোফা দেয়। আমি তো চট্টগ্রাম শহরে একটা বাড়ি করতে পারি নাই। আমার তো কোন ফ্ল্যাট নাই। হওয়ার সম্ভাবনাও নাই।”
ধন সম্পদ না থাকার জন্য আফসোস নেই তুলে ধরে খালিদ হোসেন বলেন, “আমাদের দেশে সুযোগ পাইলেই আগারটাও খায়, তলারটাও কুড়ায়। এই দুই নম্বরি করে যে বিদেশে ১০-২০টা, ৩৭০টা বাড়ি করতে পারে তার মর্যাদা বেশি। আসুন এই কালচার আমরা বদলে ফেলি। আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে।”
‘হারাম টাকার হজ কবুল হয় না’
‘হারাম টাকা’র হজও কবুল হয় না মন্তব্য করে ধর্ম উপদেষ্টা বলেন, “হারাম টাকা দিয়ে কেউ যদি হজে যায়, মক্কা শরীফে যায়- সেখানে এহরামের কাপড় পড়ে আল্লাহকে হাজিরা দিতে হয়। হারাম টাকা দিয়ে কেউ যদি মক্কা শরীফে গিয়ে বলে ‘লাব্বায়েক, আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক’। তবে আসমানের ফেরেশতারা চীৎকার দিয়ে বলে তোমার হাজিরা কবুল নাই, তোমার জন্য কোন সুসংবাদ নাই। আল্লাহ তোমার হজ তোমারে ফেরত দিছেন। তো জমজমের পানি, টুপি, তসবি, খেঁজুর এগুলো নিয়ে আসতে পারবেন- শুধু হজ হয় নাই।
“হারাম টাকা দিয়ে মসজিদের টাকা দিলে কবুল হবে না, কোরবানি দিলে কবুল হবে না। আসুন না আমরা ভাল হয়ে যাই। আমরা কী ভালো হতে পারি না?”