Published : 14 Aug 2025, 11:14 PM
জুলাই-অগাস্টের আন্দোলনে চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার মামলার একজন সাক্ষী ‘নিরাপত্তা হুমকির’ অভিযোগ করায় তাকে সুরক্ষার নির্দেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
একই সঙ্গে বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল-১ এ আদেশ দেয়।
পরে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম সাংবাদিকদের বলেন, চানখাঁরপুলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুদিন আগে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন একজন। তিনি এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার দিনই তার বিরুদ্ধে অপ্রীতিকর-অসম্মানজনক ও নিরাপত্তায় হুমকিস্বরূপ কার্যক্রম করেছেন একই প্রতিষ্ঠানের কিছু ব্যক্তি। ব্যানার টানানোসহ সাক্ষীর বিরুদ্ধে মিছিলও করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত কিছু ছবি-ভিডিও প্রসিকিউশনকে দিয়েছেন ওই সাক্ষী।
“এর পরিপ্রেক্ষিতে সাক্ষী সুরক্ষার আবেদন করা হয়। আবেদনটির ওপর আজ শুনানি হয়েছে। একইসঙ্গে সাক্ষীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন ট্রাইব্যুনাল। তার কাছে থাকা ছবি-ভিডিও দেখেছেন। শুনানি শেষে সাক্ষীর সুরক্ষায় আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।”
তামিম বলেন, আদেশে ওই সাক্ষীর সুরক্ষা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট থানার ওসি ও কর্মরত প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানসহ আশপাশের এলাকায় তাকে নিয়ে কোনো ধরনের অবমাননাকর পোস্টার-ব্যানার থাকলে দ্রুত অপসারণ করতে বলা হয়েছে।
এছাড়া প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। কমিটিকে অতি শিগগিরই তদন্ত প্রতিবেদন জমার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান এই প্রসিকিউটর।
তিনি বলেন, সাক্ষীর নিরাপত্তা বা সুরক্ষা দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আর এ জন্য যে-কোনো আদেশই দিতে পারবে ট্রাইব্যুনাল। ওই আইনের বিধানমতেই আজ আবেদনটি করা হয়েছে।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের দিন ৫ অগাস্ট চাঁনখারপুল এলাকায় শিক্ষার্থী শহীদ আনাসসহ ৬ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা গত ১১ এপ্রিল এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনে জমা দেয়। নথিপত্র পর্যালোচনা করে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ২৫ মে ফরমাল চার্জ আকারে তা দাখিল করেন।
এ মামলায় আসামি করা হয়েছে আটজনকে। তাদের মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে শাহবাগ থানার সাবেক পুলিশ পরিদর্শক আরশাদ হোসেন, কনস্টেবল মো. সুজন, কনস্টেবল ইমাজ হোসেন ইমন ও কনস্টেবল নাসিরুল ইসলামকে।
বাকি চার আসামি ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম এবং রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুল পলাতক রয়েছেন।
অভিযোগ আমলে নিয়ে সেদিন ট্রাইব্যুনাল হাবিবুর রহমানসহ পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, চানখাঁরপুল এলাকায় আসামিরা নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর ‘প্রাণঘাতী’ অস্ত্র ব্যবহার করে শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ মেহেদী হাসান জুনায়েদ, মো ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক এবং মানিক মিয়াকে গুলি করে হত্যা করে।

তদন্ত সংস্থা এই মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ট্রাইব্যুনালে তদন্ত সংস্থার দেওয়া এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদনটি ৯০ পৃষ্ঠার। তদন্ত করতে সময় লেগেছে ৬ মাস ১৩ দিন।
তদন্ত প্রতিবেদনে ৭৯ সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। এছাড়া ১৯টি ভিডিও, পত্রিকার ১১টি রিপোর্ট, ২টি অডিও, বই ও রিপোর্ট ১১টি এবং ৬টি ডেথ সার্টিফিকেট সংযুক্ত করা হয়েছে।
তাজুল ইসলাম সেদিন বলেন, “এর মধ্যে একটি অডিও কল রয়েছে হাবিবুর রহমানের, যিনি পুলিশ কমান্ড সেন্টার থেকে ওয়ারল্যাসের মাধ্যমে ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে দমাতে চায়নিজ রাইফেল দিয়ে সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ দেন পুলিশ সদস্যদের। উনার এই নির্দেশের পরই প্রাণঘাতি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছেন পুলিশ সদস্যরা।”
গত বছরের জুলাই-অগাস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠিত করে বলে একের পর এক অভিযোগ জমা পড়ে। এসব অপরাধের বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।