Published : 10 Mar 2026, 12:20 AM
অমর একুশে বইমেলার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বর্ধমান ভবনের তথ্যকেন্দ্রের সামনে রয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের স্টল। সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলেন দুজন তরুণ। পাশেই একটি পরিবারের চারজন সদস্য অপেক্ষায় ছিলেন ছবি তোলার জন্য।
দুই তরুণের একজন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী শামীম আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বললেন, "স্টলের ডিজাইনটা ভালো লাগছে। এজন্য ছবি তুলেছি।"
ষোড়শ শতকে তৈরি টাঙ্গাইলের আতিয়া মসজিদের আদলে তৈরি হয়েছে এবারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের স্টল। টাঙ্গাইলের লৌহজং নদীর তীরে ১৬০৯ সালে আতিয়া মসজিদ নির্মাণ করা হয়। মসজিদটি নির্মিত হয় মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে।
সেই ঐতিহাসিক আতিয়া মসজিদকে নতুন প্রজন্মের মাঝে তুলে ধরার ভাবনা থেকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের স্টলের এই নকশা করার কথা জানালেন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী মডেলার শামীমা হক। তিনি স্টলটি নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

শামীমা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "আমরা মূলত আতিয়া মসজিদের একটা রেপ্লিকা তৈরি করেছি। প্রতি বছরই আমাদের উদ্দেশ্য থাকে দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে তুলে ধরা। এবার আমরা চেয়েছি ১৬ শতকে তৈরি হওয়া আতিয়া মসজিদকে তুলে ধরতে, যাতে নতুন প্রজন্ম এই মসজিদটি সম্পর্কে জানতে পারে।"
এ প্রজন্মের অনেকেই স্টলের সামনে এসে ছবি তুলছেন এবং আতিয়া মসজিদ সম্পর্কে তথ্য জানতে চাইছেন।
শামীমা হক বলেন, "আমরা চাই দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক জায়গাগুলো নিয়ে যেন মানুষের মাঝে আগ্রহ জাগে এবং এগুলো রক্ষায় সচেতনতা তৈরি হয়।"
মেলা ঘুরে দেখা যায়, নানা রকম প্রতিপাদ্য নিয়ে স্টল সাজিয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। কেউ পাইরেসির বিরুদ্ধে বার্তা দিয়েছেন। কেউ আবার স্টলের মধ্যেই তুলে ধরেছেন প্রতিবাদ। কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি তুলে ধরেছেন চিত্রকর্মে।
দেশের সবচেয়ে বড় চেইন বুক শপ বাতিঘর। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেটে রয়েছে তাদের কয়েকটি শাখা। মেলার টিএসসি প্রবেশ গেইট দিয়ে ঢুকেই সামনে পড়বে বাতিঘরের স্টলটি।
বাতিঘর এর স্বত্ত্বাধিকারী দীপঙ্কর দাশ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "প্রতি বছরই আমরা ভিন্ন ভিন্ন থিমের ওপর স্টল নির্মাণ করি। এবার মেলার তারিখ নিয়ে কিছু জটিলতার কারণে স্টল নিয়ে ভাবার সময় ছিল না। মেলা হবে কিনা, তা নিয়ে দ্বিধা ছিল।

“পরে আমরা বাতিঘরের বিভিন্ন শাখার নকশাকে মূল থিম ধরে স্টলের নকশা করেছি। প্রতিবারের মতই স্টলের নকশা করেছেন শিল্পী শাহীনুর রহমান।"
বেঙ্গলবুকসের হলদে রঙের স্টলে রয়েছে কর্পোরেট আবহের ছোঁয়া। স্টলের ভেতরে ঢুকে পাঠকেরা ঘুরে ঘুরে বই দেখছেন, কিনছেন; কেউ কেউ আবার ছবি তুলছেন।
ছাপাখানা প্রকাশনীর স্টলের দেয়ালে বাংলাদেশের পতাকা, মুক্তিযুদ্ধ এবং একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে বিভিন্ন চিত্র এঁকেছেন শিল্পী মাইশা মোবাশ্বেরা।
মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মন্দিরের গেইট দিয়ে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের স্টলটি। এই স্টলে জুলাই গণঅভ্যুথানে আহতদের ছবি দিয়ে সাজানো হয়েছে। তবে মূল থিমে দেখা যায় ৫ অগাস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জনতার উল্লাসের চিত্রটি।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের স্টলে বইয়ের কাটআউট আর ‘আলোকিত মানুষ চাই’ লেখা চোখে পড়ে দূর থেকেই।
পাঠক সমাবেশ, বাংলা প্রকাশ, নবকথনসহ আরও বেশ কয়েকটি প্রকাশনীর স্টলেও নান্দনিক সাজসজ্জা নজর কাড়ছে দর্শনার্থীদের।
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে নজরুল মঞ্চের পেছনের দিকটাই বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর স্টল। পোড়া হারমোনিয়াম, তবলা আর নথিপত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে স্টলটি।
গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর তোপখানা রোডে উদীচী কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বাদ্যযন্ত্র, নথিপত্রের প্রদর্শনীর পাশাপাশি স্টলটিতে আছে কিছু বইও।
উদীচীর একাংশের সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "উদীচী কার্যালয়ে হামলার প্রতিবাদ জানাতেই আমরা স্টলটিকে এভাবে সাজিয়েছি।"
অন্যদিকে বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশের লেকের পাশে রয়েছে বিদ্যানন্দ প্রকাশনীর স্টল। অর্ধেক শাটার নামানো স্টলটি সেজেছে ভাঙা চেয়ারে। সেখানে রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের ছবির ফ্রেমও রয়েছে ভাঙা অবস্থায়। ধুলোয় ঢাকা রয়েছে শৈশবের ঠাকুরমার ঝুলির বই।

স্টলটির দুই পাশে লেখা সাইনবোর্ড, "সাহিত্য মরে যাচ্ছে, বন্ধ হচ্ছে প্রকাশনী। আপনি আমিই বইয়ের চুম্বক অংশ অনলাইনে শেয়ার করে দিচ্ছি দেদারসে। এতে লেখার প্রচার হলেও বইয়ের কদর কমে। দিনশেষে লেখকের পরিবর্তে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে সোশ্যাল নেটওয়ার্ক কোম্পানি গুলো।"
আরেকটি সাইনবোর্ডে লেখা, "অনলাইনে প্রকাশিত সাহিত্যকর্মের ৮০% পাইরেসির শিকার হয়। আসুন আমরা এই পাইরেসি থেকে বিরত থাকি। ৩০% লেখক হারিয়ে গেছে ফেইসবুক টুইটার আসার পর, প্রাপ্য সম্মানী না পেলে লেখক বাঁচবে কীভাবে।"
বিদ্যানন্দের ইভেন্ট ব্যবস্থাপক মনজুর আলম রবি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "আমরা মূলত বই নিয়ে পাইরেসি রোধে সচেতনতার বার্তা দিচ্ছি।"
সোমবার ছিল বইমেলা’র দ্বাদশ দিন। দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা চলে। 'লেখক বলছি' অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন অনুবাদক ফয়েজ আলম এবং জাভেদ হুসেন।
মেলার তথ্যকেন্দ্রে সোমবার নতুন বই জমা পড়েছে ১৬৩টি। এ পর্যন্ত মোট বই জমা পড়েছে ৯৯৬টি।
শহীদুল্লা কায়সার স্মরণ
বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হয় ‘শহীদুল্লা কায়সার’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রাবন্ধিক শিবলী আজাদ। আলোচনায় অংশ নেন কথাসাহিত্যিক প্রশান্ত মৃধা। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।
শিবলী আজাদ বলেন, "পূর্ববাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঔপন্যাসিক শহীদুল্লা কায়সার। বামপন্থি রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও লেখকবৃত্তি শহীদুল্লা কায়সারের খ্যাতির মূল কারণ হলেও স্বাধীনতার প্রাক্কালে তার শাহাদাতবরণ তাকে দিয়েছে অনন্য এক মর্যাদা।"
"রোজনামচা, ভ্রমণকাহিনি ও উপন্যাস মিলিয়ে নয়টি পূর্ণাঙ্গ ও একটি অসমাপ্ত গ্রন্থের লেখক শহীদুল্লা কায়সার মূলত একজন প্রথিতযশা ঔপন্যাসিক হিসেবেই বেশি পরিচিত।"
শিবলী আজাদ বলেন, সারেং বৌ (১৯৬২) এর মাধ্যমে হাতেখড়ি হলেও উপন্যাসে শহীদুল্লা কায়সারের দক্ষতার ছাপ ‘প্রথম গ্রন্থেই প্রমাণিত’।
"সংশপ্তক (১৯৬৫) উপন্যাসের প্রকাশ তার ঔপন্যাসিক সক্ষমতার ধারণা দৃঢ় করেছে, বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঔপন্যাসিকের অধিষ্ঠান দিয়েছে। শহীদুল্লা কায়সারের জীবদ্দশায় পূর্ববাংলায় ঘটেছে ব্যাপক সামাজিক, রাজনৈতিক ও আর্থিক ভাঙচুর, পাশাপাশি ঘটেছে সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর। আর সেইসব সামাজিক রূপান্তরের চিহ্ন শহীদুল্লা কায়সারের সাহিত্যে উঠে এসেছে।"
প্রশান্ত মৃধা বলেন, শহীদুল্লা কায়সারের সৃষ্টিকর্মকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করার অবকাশ রয়েছে।
“সমকালীন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাই তার উপন্যাসের পটভূমি নির্মাণ করেছে। এজন্য প্রায়শই তার রাজনৈতিকসত্তা তার সাহিত্যিকসত্তাকে অতিক্রম করে গেছে। তিনি তার উপন্যাসে অত্যন্ত শিল্পসফলভাবে গ্রামীণ জীবনের চিত্র তুলে ধরেছেন।"
অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, "শহীদুল্লা কায়সার বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে অন্যতম প্রধান চরিত্র। তার সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন। তার উপন্যাসগুলোকে যদি জাতীয় চেতনার দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠ করা হয়, তাহলে নিশ্চয় অধিকতর সুফল পাওয়া যাবে।"

গান-কবিতার আয়োজন
বিকেল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি নাঈমা খানম এবং সেলিনা আক্তার। আবৃত্তি পরিবেশন করেন প্রদীপ মিত্র, সৈয়দ রনো, মাহিনুর মুমু, মো. এনামুল হক এবং ইকবাল আলী।
সংগীত পরিবেশন করেন আশরাফ মাহমুদ, সনৎকুমার বিশ্বাস, জাবীর ইমাম খান, এ টি এম আশরাফ হোসেন, জামাল দেওয়ান, আশরাফুজ্জামান, মফিজুর রহমান, মো. ওবায়দুর রহমান, সুমন চন্দ্র দাস এবং আহমেদ শাকিল হাসমী।
যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন স্বপন কুমার দাস (তবলা), ইফতেখার হোসেন সোহেল (কী-বোর্ড), মো. শহিদুল ইসলাম (বাঁশি), লক্ষ্মী প্রসাদ দাস (অক্টোপ্যাড) এবং সুমন কুমার শীল (দোতারা)।
মঙ্গলবার যা থাকছে
মঙ্গলবার মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত।
বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হবে ‘স্মরণ: সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। সেখানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন আহমাদ মোস্তফা কামাল। আলোচনায় অংশ নেবেন হরিশংকর জলদাস। সভাপতিত্ব করবেন খালিকুজ্জামান ইলিয়াস।
বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।