Published : 22 Oct 2025, 11:57 PM
সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ সংবিধান লঙ্ঘন করার কারণে দেশে এক-এগারো সৃষ্টি হয়েছিল বলে আদালতকে বলেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলকারীর আইনজীবী শরীফ ভুঁইয়া।
সংবিধানের যে সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল, সেই ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি শুরু হয় মঙ্গলবার। বুধবার দ্বিতীয় দিনের মতো শুনানি করেন শরীফ ভূঁইয়া।
প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন ৭ বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চে এই শুনানি চলছে। বৃহস্পতিবারও চলবে।
আপিলকারী বদিউল আলম মজুমদারের আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া শুনানি করছেন। তার শুনানি শেষ হলে অন্য আপিলকারীদের আইনজীবীরা শুনানি করবেন। পরে হবে রাষ্ট্রপক্ষের শুনানি।
মঙ্গলবার ও বুধবার শুনানিকালে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক, আব্দুল জব্বার ভূঁইয়া, আরশাদুর রউফসহ কয়েকজন ডেপুটি অ্যটর্নি জেনারেল উপস্থিত ছিলেন।
বুধবার শুনানি শেষে শরীফ ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বে যে বেঞ্চ তত্বাবধায়ক বাতিল করেছিল, সে রায়ের অনেকগুলো ত্রুটি গত দিনের শুনানিতে তারা আদালতে তুলে ধরেছেন।
বুধবার রায়ের আরও অনেকগুলো ত্রুটি আদালতের সামনে তুলে ধরার কথা জানিয়ে তিনি বলছে, এ রায় দিতে গিয়ে ওনারা (খায়রুল হকের আদালত) বিচার বিভাগকে যেভাবে কাজ করার কথা, সেভাবে করেননি। তারা বিচারিক ক্ষমতার বহির্ভূত কাজ করেছেন। ওনারা এই রায় দিতে গিয়ে সংসদ বা নির্বাহী বিভাগের যে কাজ, সে দায়িত্বও নিয়েছেন।
তারা তাদের যে ক্ষমতা, তা ছাড়িয়ে অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন, যার ফলে এই রায়টা হয়েছে – এটা রায়ের আরেকটা ভুল দিক ছিল বলে আদালতে বলেছেন শরীফ ভূঁইয়া।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, পত্রপত্রিকায়ও লেখালেখি হয়েছে যে, তত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যেভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তাতে হয়তো কিছু ভুল-ত্রুটি আছে, সেটাকে আরও ইমপ্রুভ করা সম্ভব।
“বিশেষ করে আমাদের ২০০৬-০৭ সালের অভিজ্ঞতার আলোকে এটা অনেকে বলার চেষ্টা করেন যে, এই তত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ত্রুটির কারণে দেশে ২০০৬-০৭ সালে সেনা সমর্থিত সরকার হয়েছিল। এটাকে অনেকে মনে করেন যে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার ত্রুটি।
“আমরা এটা আদালতকে আজ যারা মাইনরিটি বিচারক ছিলেন – বিচারপতি ওয়াহাব মিয়া এবং বিচারপতি ইমান আলী, তাদের রায় দেখে আদালতকে আমরা দেখিয়ে দিয়েছি যে, সেনা সমর্থিত সরকার যেটা ওয়ান-ইলেভেনে হয়েছে, এটার জন্য অনেক সময় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে দায়ী করা হয়। এটা তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার কোনো ত্রুটির কারণে নয়; বরং ওই সময়কার রাষ্ট্রপতি (ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ) সংবিধান না মেনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে সংবিধানের কয়েকটা সাব-আর্টিক্যাল ফলো না করে সংবিধান লঙ্ঘন করে নিজে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়েছেন।
“সেই থেকে সংকটের শুরু হয়েছে। কাজেই এক-এগারো সংকট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার ত্রুটির কারণে নয়, বরং তৎকালীন রাষ্ট্রপতির সংবিধান লঙ্ঘনের কারণে।”
এই বিষয়টা তিনি আদালতের নজরে এনেছেন বলে জানান।
তবে ত্রুটি-বিচ্যুতি যদি কিছু থাকে, তার ব্যাপারে আদালত কোনো পর্যবেক্ষণ দিতে পারে কিনা, সেই ব্যাপারেও শরীফ ভূঁয়া আদালতে বলেছেন।
“আমরা বলেছি, আদালতের যে এখতিয়ার, তা কোনো একটা আইন বা সংবিধান সংশোধন, এটা সঠিক কিনা, এটা আইনগতভাবে সিদ্ধ কিনা, তা বলা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। আইনকে ইমপ্রুভ করার দায়িত্ব আইনপ্রণেতাদের। এ দায়িত্ব বিচার বিভাগ নিতে পারে না। এটা আমরা আদালতের নজরে এনেছি।”
যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এ রায়ের ফলে ফিরে আসে তাহলে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে কিনা, এ বিষয়ে শরীফ ভূঁইয়া আদালতে বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরলে সেটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। কারণ বর্তমান সরকার গঠিত হয়েছে একটা ভিন্ন সাংবিধানিক ব্যবস্থায়। এটা কিন্তু সংবিধানের কোনো লিখিত অনুচ্ছেদের অধীনে গঠিত হয়নি। এটা গঠিত হয়েছে বিপ্লব পরবর্তী জনগণের আকাঙ্ক্ষা, দেশের সরকার পালিয়ে যাওয়ায় তৈরি হওয়া শূন্যতা এবং দেশে একটা সরকার গঠিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে। এসব বিষয় সংবিধানের বৃহত্তর রীতিনীতিতে স্বীকৃত। তার ভিত্তিতে এ সরকার গঠিত হয়েছে।
“অন্তর্বর্তী সরকারকে জনগণ একটা জিনিস করার জন্য দিয়েছে। এটা হলো, দেশ পরিচালনা করা এবং তারপর হলো বিপ্লব পরবর্তী আকাঙ্ক্ষাকে রূপায়ন করার জন্য সংস্কার করা। তারপরে হলো একটি নির্বাচন করে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তানর করে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়া। কাজেই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফিরে আসার সঙ্গে ওনাদের ক্ষমতায় থাকা না থাকার কোনো সম্পর্ক নেই।”
তত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফিরলে নির্বাচনের আগেই একটা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হবে কিনা, এ ব্যাপারেও তিনি আদালতে বলেছেন।
“আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি, এটা করা প্রয়োজন হবে না বা এটা করা সম্ভবও হবে না। কারণ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার যে বিধান ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তার মধ্যে একটা হচ্ছে ৫৮ এর সি, তার ২ উপ-অনুচ্ছেদ। এবং ওই উপ-অনুচ্ছেদে খুবই স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা হবে সংসদ ভেঙে দেওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে। কাজেই ত্রয়োদশ সংশোধনীর তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা চালু করতে হলে এবং ওই রকম একটা সরকার গঠন করতে হলে এটা শুধুমাত্র সংসদ ভেঙে দেওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে করতে হবে “
তিনি বলেন, “ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে যে সংসদ হবে, সে সংসদ যখন ভেঙে যাবে, তখন আপনি ওই ৫৮ সি ধারা ট্রিগার করতে পারবেন। ১৫ দিনের মধ্যে একটা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যস্থা চালু করতে পারবেন।”
তাই ড. মুহম্মদ ইউনূসেৎর অধীনে আসন্ন ফেব্রুয়ারির নির্বাচন করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় যদি আপিল বিভাগ বাতিল করে তাহলে কি আপনাআপনিভাবে ত্রয়োদশ সংশোধনী সংবিধানের অংশ হয়ে যাবে, নাকি রায়ের ভিত্তিতে পার্লামেন্টে একটা আইন করতে হবে-এমন প্রশ্নও ওঠে।
জবাবে তিনি বলেন, এই ব্যাপারে কিছু কনফিউশন আছে আইনজীবী ও জনগণের মধ্যে। অষ্টম সংশোধনীর মামলা, ষোড়শ সংশোধনীর মামলার নজিরের ভিত্তিতে তারা আদালতে বলেছেন যে, এটা একটা ‘স্টাবলিশড’ আইনই আছে যে, কোনো কিছু বাতিল হয়ে গেলে তার আগেরটা আপনাআপনিভাবে পুনরুজ্জীবিত হয়।
“যেহেতু এটা আমাদের দেশে নাই এভাবে পুনরুজ্জীবিত হওয়া, কাজেই ওনাদের আদেশের মাধ্যমে যদি ত্রয়োদশ সংশোধনী পুনরুজ্জীবিত হয়, তাহলে সংসদের ক্ষমতা খর্ব হবে না।”
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে একাধিক রিভিউ আবেদনের শুনানি শেষে গত ২৭ অগাস্ট আপিলের অনুমতি দিয়ে শুনানির জন্য ২১ অক্টোবর দিন ঠিক করেছিল পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের চাপে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান এনে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী সংসদে পাস করে তৎকালীন বিএনপি সরকার।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ১৯৯৮ সালে ওই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন এম সলিম উল্লাহসহ তিনজন আইনজীবী।
পরে বিএনপি সরকারের সময়ে ২০০৪ সালের ৪ অগাস্ট সেই রিট খারিজ হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বৈধই থাকে।
হাই কোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালে আপিল করেন রিট আবেদনকারীরা। ২০০৬ সালে রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে জরুরি অবস্থা জারির পর গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুই বছর ক্ষমতায় থাকার পর এ পদ্ধতির দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
পরে আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলে ২০১০ সালের ১ মার্চ আপিল বিভাগে ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার শুনানি শুরু হয়। শুনানিতে আপিল আবেদনকারী এবং রাষ্ট্রপক্ষ ছাড়াও অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে শীর্ষস্থানীয় ৮ জন আইনজীবী বক্তব্য দেন।
তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দেন। এমনকি তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও এর পক্ষে মত দেন।
ওই আপিল মঞ্জুর করে সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ ২০১১ সালের ১০ মে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে রায় দেয়। তখন প্রধান বিচারপতি ছিলেন এ বি এম খায়রুল হক।
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হওয়ার আগেই ২০১১ সালের ৩০ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলুপ্তিসহ ৫৫টি সংশোধনীসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী প্রস্তাব জাতীয় সংসদে পাস হয়। একই বছরের ৩ জুলাই তাতে অনুমোদন দেন রাষ্ট্রপতি।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে একাধিক রিভিউ আবেদন জমা পড়ে।
গত বছরের ২৭ অগাস্ট একটি আবেদন করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, তোফায়েল আহমেদ, এম হাফিজউদ্দিন খান, জোবাইরুল হক ভূঁইয়া ও জাহরা রহমান। একই বছরের ১৬ অক্টোবর আরেকটি আবেদন করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এরপর ২৩ অক্টোবর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও একটি রিভিউ আবেদন করেন। এছাড়া নওগাঁর বীর মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেনও আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে গত বছর একটি আবেদন করেন।
এ চার রিভিউ আবেদনের একসঙ্গে শুনানি শেষে নতুন করে আপিল শুনানির সিদ্ধান্ত দেয় আপিল বিভাগ।
গত ১৭ ডিসেম্বর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাই কোর্ট বেঞ্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করে রায় দেয়। ফলে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ফেরার পথ তৈরি হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি ফের বুধবার