Published : 03 Jun 2026, 09:31 PM
অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া আশ্বাস অনুযায়ী এবতেদায়ী মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত করার দাবি বর্তমান সরকার বৃহস্পতিবারের মধ্যে মেনে না মেনে নিলে রোববার থেকে 'আমরণ অনশন' কর্মসূচি শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা।
এই দাবিতে মাদ্রাসা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে তারা ১৪ দিন ধরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছেন।
বুধবার ওই অবস্থান কর্মসূচি থেকে ‘স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা শিক্ষক কল্যাণ কমিটি’র ব্যানারে শিক্ষকরা সচিবালয় অভিমুখে লংমার্চ করলেও পুলিশের বাধায় সে কর্মসূচি পণ্ড হয়ে যায়।
পরে পুলিশের মধ্যস্ততায় শিক্ষকদের সাত সদস্যের প্রতিনিধি দল শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সঙ্গে দেখা করেত সচিবালয়ে গেলেও তারা মন্ত্রীর সাক্ষাৎ পাননি।
এমন পরিস্থিতিতে বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে ফিরে এসে সংগঠনের সদস্য সচিব আব্দুল হান্নান হোসেন রোববার থেকে আমরণ অনশন কর্মসূচি চালানোর ঘোষণা দেন।
তিনি সন্ধ্যায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "আমাদের এমপিওভুক্তি আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই শেষ। ১ হাজার ৮৯টি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা এমপিওভুক্তির নীতিগত অনুমোদনও পেয়েছে। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এমপিওভুক্তির প্রশাসনিক আদেশ জারি করছে না।
“অর্থ বিভাগে এমপিওভুক্তির টাকা বরাদ্দ দিতে এমপিও ঘোষণার প্রশাসনিক আদেশসহ বিভিন্ন তথ্য চেয়ে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে গত মার্চ মাসে চিঠি দিলেও এ বিভাগ প্রশাসনিক আদেশ জারি করেনি।”
আব্দুল হান্নান বলেন, "এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের সাক্ষাৎ চেয়ে আমরা সচিবালয় অভিমুখে পদযাত্রার চেষ্টা করলে পুলিশ তা আটকে দেয়। পরে তারা আমাদের সাতজন প্রতিনিধিকে ভেতরে নিয়ে গেলেও মন্ত্রী মহোদয় সচিবালয়ে না থাকায় আমরা হতাশ হয়ে ফিরে আসি।
“বৃহস্পতিবারের মধ্যে সরকার এবতেদায়ী মাদ্রাসা এমপিওভুক্তির দাবি না মানলে রোববার থেকে আমরা কাফনের কাপড় পরে আমরণ অনশন কর্মসূচি শুরু করব।"
গত ২১ মে থেকে শিক্ষকরা জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। ঈদের দিনও তারা অবস্থান কর্মসূচিতে ছিলেন। গত ২৫ মে তারা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত মাদ্রাসা বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন।

যদিও ঈদুল আজহা ও গ্রীষ্মকালীন অবকাশ উপলক্ষে বর্তমানে দেশের সব পর্যায়ের আলিয়া মাদ্রাসায় বন্ধ। ১৪ জুন (রোববার) থেকে পুনরায় এ প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রেণিকক্ষ খুলবে।
তবে আব্দুল হান্নান হোসেনের ভাষ্য, এমপিওভুক্তির দাবি সরকার মেনে না নিলে এবতেদায়ী মাদ্রাসাগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।
ইসলামি ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বয়ে যে শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে, সেই আলিয়া মাদ্রাসা পদ্ধতিতে পঠন-পাঠন হয় এবতেদায়ী মাদ্রাসায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমমান এই ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন হয় ১৯৮৪ সালে। এরপর চার দশক কেটে গেলেও শিক্ষকরা মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।
মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে অনুদানভুক্ত ১ হাজার ৫১৯টি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা এবং সহকারী শিক্ষকরা তিন হাজার টাকা করে অনুদান পেয়ে থাকেন।
এর বাইরে দেশে আরও ৫ হাজার ৯৩২টি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা রয়েছে, যেগুলো সরকারি কোনো অনুদান পায় না।
শিক্ষকদের আন্দোলনের মুখে ২০২৫ সালের শুরুতে স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসাগুলোকে প্রথমে এমপিওভুক্ত করে পর্যায়ক্রমে জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
ওই বছরের ২৫ জুন এবতেদায়ী মাদ্রাসা এমপিওভুক্তির নীতিমালা জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ। নীতিমালা অনুযায়ী, এ মাদ্রাসাগুলোর মোট ছয়টি পদ এমপিওভুক্ত হবে।
এবতেদায়ী প্রধান বেতন পাবেন দশম গ্রেডে। আর সাধারণ, বিজ্ঞান ও আরবি বিষয়ের সহকারী শিক্ষকের বেতন হবে ত্রয়োদশ গ্রেডে।
আর ক্বারী বা নূরানী বিষয়ের সহকারী শিক্ষকরা ষোড়শ গ্রেডে বেতন পাবেন। আর প্রতিটি এবতেদায়ী মাদ্রাসার অফিস সহায়ক পদ সৃষ্টি করা হয়েছে, যে পদে নিয়োগপ্রাপ্তরা ২০ তম গ্রেডে বেতন পাবেন।
নীতিমালা অনুসারে, মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষক পদে এনটিআরসিএর সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ হবে। নীতিমালায় মাদ্রাসাগুলোর ম্যানেজিং কমিটি গঠনের নির্দেশনা এসেছে।
দেড় হাজারের বেশি অনুদানভুক্ত স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত করতে গতবছরের ৮ থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ।
গতবছরের ৩ নভেম্বর শর্তসাপেক্ষে অনুদানভুক্ত ১ হাজার ৮৯টি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত করার নীতিগত সিদ্ধান্তে অনুমোদন দিয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
তবে এ মাদ্রাসাগুলো এমপিওভুক্ত করে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি।
এ অবস্থায় মাদ্রাসাগুলো এমপিওভুক্ত করা এবং নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষকদের বেতনের সরকারি অংশ ছাড় করার দাবিতে লাগাতার অবস্থান করা শিক্ষকরা রোরবার থেকে অনশন শুরুর ঘোষণা দিলেন।
সংগঠনের আহ্বায়ক শামসুল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "২০২৫ সালের জুলাই মাসে মাদ্রাসাগুলো এমপিওভুক্তির আবেদন নেওয়ার প্রায় ১০ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরেও এখন পর্যন্ত একটি মাদ্রাসাও এমপিওভুক্ত করা হয়নি। এতদিন পরেও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর একজন শিক্ষকের বেতনও ছাড় করেননি। ফলে শিক্ষকরা মানবতার জীবনযাপন করছেন।
"এবতেদায়ী মাদ্রাসাগুলো বরাবরই অবহেলিত থেকেছে। সরকার ২০১৩ সালে ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন অথচ একটি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা জাতীয়করণ বা এমপিওভুক্ত করার কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেন নাই। ফলে শিক্ষকরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন এবং শিক্ষার্থীরা ও আধুনিক ও ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
“অন্তবর্তীকালীন সরকার স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসাগুলোকে এমপিওভুক্ত করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মত জাতীয়করণের ঘোষণা দিলেও আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি।"
এ মাদ্রাসাগুলোর এমপিওভুক্তি নিয়ে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের মাদ্রাসা অনুবিভাগের কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করতে চাননি। কথা বলার জন্য শিক্ষামন্ত্রীকে একাধিকবার টেলিফোন করা হলেও তারা ধরেননি।