Published : 30 Apr 2026, 04:31 PM
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, মামলা, জেল-জুলুম ও আক্রমণের অভিজ্ঞতা টেনে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ শক্তিগুলোর ঐক্য চাইলেন সরকারি দলের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
তিনি বর্তমান সংসদকে ‘মজলুমের সংসদ’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিগুলো এখন ‘পিঁপড়ার বলের’ মতো একসঙ্গে থাকতে চায়।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দলের চিফ হুইপ ঐক্যের এই ডাক দেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, “আমরা কেউ মরতে চাই না। আমরা বাঁচতে চাই সবাই মিলে। আমরা বাঁচতে চাই দেশটাকে নিয়ে। আমরা বাঁচতে চাই দেশটাকে বাঁচিয়ে তারপর আমরা বাঁচতে চাই। সেই দায়িত্ব নিয়ে এখানে বসেছি।”
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, টানা দেড় দশকের এই সরকারকে ‘ফ্যাসিস্ট সরকার’ বলে থাকে বিরোধীরা।
আওয়ামী লীগের মতো ‘কর্তৃত্ববাদী’ সরকার যাতে আর না আসতে পারে সে জন্য রাষ্ট্রসংস্কারের উদ্যোগ নেয় মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। দীর্ঘ আলোচনার পর জুলাই সনদ গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নের গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায় নেওয়া হয়।
এ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে টানাপড়েন চলছে। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট গণভোটের ‘গণরায়’ বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এর অংশ হিসেবে আগামী ১৬ মে থেকে ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে বিভাগীয় শহরগুলোতে সমাবেশ করবে দলগুলো।
এ অবস্থায় জাতীয় সংসদে চিফ হুইপ মনির কাছ থেকে ঐক্যের ডাক এল।
তার আগে তিনি বলেন, একসময় সংসদের ভেতরে-বাইরে ‘জামায়াত-বিএনপি’ বলেই তাদের আক্রমণ করা হত।
তার ভাষায়, “এই সংসদের বিরুদ্ধে যে কথা বলত, সবসময় বলত জামায়াত-বিএনপি। এই কথা বলেই আমাদের আক্রমণ করা হতো। শুরুই হতো এটা দিয়ে, জামায়াত-বিএনপি।
“আমাদের বিরুদ্ধে স্লোগান তৈরি করল, ‘৭১-এর রাজাকার’, ‘এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়’, এটা টেলিভিশন-রেডিওতে বলা হতো এবং ‘তুই রাজাকার’, ‘তুই রাজাকার’ এটা পত্রিকাতে হেডলাইন ছিল। এরকম পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছি আমরা দীর্ঘদিন। আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকার চেষ্টা করেছি বিপদ থেকে বাঁচার জন্য।”
সেই ঐক্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি পিঁপড়ার উদাহরণ টানেন।

চিফ হুইপ বলেন, যখন পানি আসে তখন পিঁপড়ারা একত্রিত হয়, একটা বলের আকারের মতো হয়, আপনারা দেখেছেন কিনা জানি না, আমি সাগরের পারের মানুষ আমি দেখেছি, একটা বল হয়ে যায়। নিচে যে পিঁপড়াটা পড়ে সেটা আবার ওপরে ওঠে, ওপরের পিঁপড়াটা নিচে যায়।
“এরকম তারা শ্বাস করতে করতে বেঁচে থাকে, একটা বলের মতন করে। তারা কেউই মারা যায় না, সবাই বেঁচে থাকে।”
তিনি বলেন, “আমি মনে করি আজকের বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ, আজকের এইখানে দাঁড়িয়ে, এই পিঁপড়ার বলের মতনই।”
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, বর্তমান সংসদে যারা আছেন, তাদের অনেকেই মামলা, জেল, নির্যাতন, এমনকি মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হয়েছেন। বিরোধী দলের বেঞ্চের দিকেও ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এ সংসদে এমন মানুষ খুব কমই আছেন, যারা রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হননি।
তিনি বলেন, “এটা মজলুমের সংসদ।”
চিফ হুইপ তার বক্তব্যে বিএনপি ও জামায়াতের দীর্ঘদিনের একসঙ্গে পথচলার কথাও তোলেন। তার ভাষায়, কঠিন সময় পার হতে গিয়ে তারা ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রয়োজন অনুভব করেছেন।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, দেশে আবারও অন্ধকার নেমে আসুক, তা তারা চান না। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, না হলে আবারও বিপদের মুখে পড়তে হবে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
চিফ হুইপ বলেন, সংসদকে কার্যকর করতে হবে। শুধু প্রাণবন্ত হলেই চলবে না, জনগণের সমস্যার সমাধানে সংসদকে বাস্তব ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি বলেন, সংসদে ভিন্নমত থাকবে, এক পক্ষ আরেক পক্ষকে আক্রমণও করতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশের মানুষ, গণতন্ত্র ও অভাবী মানুষের স্বার্থে ঐকমত্যের জায়গা খুঁজে বের করতে হবে।
সংসদের সাম্প্রতিক কার্যক্রম নিয়েও কথা বলেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিল ও অধ্যাদেশ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে চাপ ছিল। ১৩৩টি অধ্যাদেশের কাজ স্বল্প সময়ে সামলাতে গিয়ে বিরোধী দলের সদস্যদের পর্যাপ্ত আলোচনা-সুযোগ না পাওয়ার বিষয়েও দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, আইন মন্ত্রণালয়, সংসদ সচিবালয়, বিজি প্রেস এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কয়েকদিন ধরে ঘুমহীন পরিশ্রম করেছেন। এত কাজের মধ্যে ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে সে জন্যও তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, বিরোধী দলীয় সদস্যদের আলোচনা-সুযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ার বিষয়টি তিনি বুঝতে পারছেন। তবে সংসদের কাজ এগিয়ে নিতে সবাইকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
বক্তব্যের চিফ হুইপ বলেন, তারা প্লট নেবেন না, গাড়ি নেবেন না, এমন কিছু সিদ্ধান্তও জাতীয় স্বার্থে নিয়েছেন। তেল-গ্যাসসহ বিভিন্ন জাতীয় সংকটে বিরোধী দলের প্রস্তাব সরকার গ্রহণ করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তার ভাষায়, সংসদে ভালো কথা বলা গেলে, একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে তার প্রভাব বাইরে পড়ে।
নূরুল ইসলাম মনি বিরোধী দলসহ সব পক্ষের সহযোগিতা চান। তিনি বলেন, এ সংসদকে কার্যকর ও টেকসই করতে হলে এবং গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সবাইকে একসঙ্গে পথ চলতে হবে।