Published : 23 Aug 2024, 11:08 PM
আর দৈনিক ভাতার ভিত্তিতে কাজ করতে রাজি নন আনসার সদস্যরা; চাকরি স্থায়ী করার দাবিতে তারা অব্যাহত রেখেছেন রাজপথের আন্দোলন।
ঊর্ধ্বতনদের পক্ষ থেকে বার বার বলা হচ্ছে, দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব জানালেও পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লাগবে। কিন্তু রাস্তায় নামা আনসার সদস্যরা তাতে আশ্বস্ত হতে পারছেন না।
চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ঢাকার শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ জানানোর পর শুক্রবার বিকেলেও একই কর্মসূচি পালন করেছেন আন্দোলনরত আনসার সদস্যরা।
এদিন বিকাল ৩টার দিকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা জমায়েত হন শাহবাগে। সন্ধ্যা পর্যন্ত তিন শতাধিক আনসার সদস্য সেখানে বিক্ষোভ দেখান।
পরে তারা মিছিল নিয়ে মৎস্যভবনের দিকে চলে যান বলে জানিয়েছেন রমনা ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. সোহেল রানা জানান।
প্রায় চার ঘণ্টা শাহবাগ মোড় অবরুদ্ধ করে রেখে বিভিন্ন স্লোগান দেন আনসার সদস্যরা। এ সময় যান চলাচল বন্ধ থাকায় আশপাশের সড়কে তৈরি হয় যানজট। একই সময় বিমানবন্দরের সামনেও অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন শতাধিক আনসার সদস্য।
রাজীব নামে এক আনসার সদস্য বলেন, “যখন জীবনের ভয়ে মাঠে পুলিশ-র্যাব কেউ ছিল না, তখন আমরা ছিলাম। ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করি, কিন্তু তারপরেও আমরা সবসময়ই অবহেলিত। চাকরি জাতীয়করণের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।”
ডিএমপির রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. সোহেল রানা বলেন, “সন্ধ্যা ৭টার দিকে তারা শাহবাগের রাস্তা ছেড়ে চলে গেছেন। বর্তমানে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।”
যে কারণে আন্দোলন
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদরদপ্তরে কথা বলে জানা গেছে, আন্দোলনরত এই আনসার সদস্যরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী দৈনিক ৫৪০ টাকা চুক্তিতে কাজ করেন। এছাড়া বাহিনীর পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাদের জন্য রেশন সুবিধা বরাদ্দ থাকে। তারা এখন স্থায়ী নিয়োগ চান।
সদর দপ্তরের সহকারী পরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা রুবেল হোসাইন বলেন, “কোনো প্রতিষ্ঠান যদি মনে করেন, তাদের নিরাপত্তায় তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়ার জন্য জনবল প্রয়োজন। তাহলে তারা নির্দিষ্ট সংখ্যক জনবল চেয়ে আমাদের কাছে আবেদন করেন। পরে ওই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সদস্যদের থাকা-খাওয়া ও অস্ত্র রাখার জায়গা থাকা এবং দুই মাসের অগ্রিম বেতন দেওয়া সাপেক্ষে নির্ধারিত সংখ্যক সদস্যকে তিন বছরের জন্য সেখানে নিয়োগ দেওয়া হয়।”
এমন আনসার সদস্যের সংখ্যা সারাদেশে প্রায় ৭০ হাজার জানিয়ে তিনি বলেন, “এরমধ্যে প্রায় ৫৫ হাজার সদস্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন, যাদেরকে দৈনিক ৫৪০ টাকা হারে বেতন দেয় সংশ্লিষ্ট ওই প্রতিষ্ঠান।”
বাকি ১৫ হাজার সদস্য ‘রেস্ট টাইমে’ থাকেন। কোনো প্রতিষ্ঠানের নতুন চাহিদা পেলে কিংবা আগের কোনো প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বরত সদস্যদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে ‘রেস্টে’ থাকা সদস্যদের পাঠানো হয়। এছাড়া জরুরি প্রয়োজনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে বিভিন্ন দায়িত্বেও পাঠানো হয় ‘রেস্টে’ থাকা সদস্যদেরকে।
গত ৫ অগাস্ট সরকার পতনের পর পর পুলিশবিহীন সড়কে ট্রাফিক সামলানো এবং থানার নিরাপত্তার দায়িত্বে পাঠানো হয়েছিল আনসার সদস্যদের।
আনসারের এই সদস্যদের ‘স্বেচ্ছাসেবী’ হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় জানিয়ে সদরদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, “তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া মানেই চাকরি নয়। এটা আমাদের একটা জাতীয় পলিসির অংশ। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য তাদেরকে প্রশিক্ষণটা দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে বাহিনীর পক্ষ থেকে একটা স্মার্টকার্ড দেওয়া হয়। স্মার্ট কার্ডের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ সফটওয়্যারের মাধ্যমে কোন প্রতিষ্ঠানের চাহিদার প্রেক্ষিতে তাদেরকে বিভিন্নস্থানে দায়িত্বে পাঠানো হয়।

“এই অটোমেশন প্রক্রিয়ায় চাহিদা জানানো প্রতিষ্ঠানও জানে না কোন সদস্য দায়িত্ব পালন করবে এবং সদস্যরাও আগে থেকে জানেন না যে তিনি সেখানে দায়িত্বে যাবেন। পর্যায়ক্রমে রোস্টারের ভিত্তিতে তাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়।”
ওই কর্মকর্তা বলেন, চাকরি স্থায়ী করার যে দাবি আনসার সদস্যরা করছেন, সদরদপ্তরের ঊর্ধ্বতনরাও তাতে সম্মত। কিন্তু বিষয়টি বাস্তবায়নের জন্য সময় দরকার।
“সরকার পরিবর্তনের পরপরই আনসার সদস্যরা কয়েকটি দাবি জানান। গত ১৮ অগাস্ট থেকে তারা চাকরি জাতীয়করণের একদফা দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। এরপর থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা কর্মবিরতিও পালন করছেন।
“তাদের দাবির প্রেক্ষিতে আমাদের ডিজি স্যার স্বরাষ্ট্র উপদ্ষ্টোর সঙ্গে দেখা করে আনুষ্ঠানিক পত্র দিয়েছেন। এরপর নতুন উপদ্ষ্টো এসেছেন, তাকেও বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে কেবিনেটে আলোচনা হবে বলার পরেও আন্দোলনরতদের একটা বড় অংশ দাবির বিষয়ে অনড় রয়েছেন।”

ওই কর্মকর্তা বলেন, “তাদের দাবি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মেনে নিলেও পরে নতুন পদ তৈরির জন্য ফাইল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যাবে, তারপর অর্থ মন্ত্রণালয়ে যাবে। এটি দীর্ঘমেয়াদী একটা প্রক্রিয়া, কিন্তু তাদের আজকেই লাগবে। আমরা বার বার তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছি, তাদের একটি অংশ বুঝলেও অনেকেই এখনও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।”
এই আন্দোলনের কারণে বিমানবন্দর, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা সেবা যে বিঘ্নিত হচ্ছে. তা স্বীকার করেন ওই কর্মকর্তা।
অন্যদিকে আনসার সদস্যরা বলছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে ‘বৈষম্যের’ শিকার। তাদেরকে নানাভাবে ব্যবহার করা হলেও জাতীয়করণ করা হয়নি। কোনো নীতিমালায় তারা আর বিশ্বাসী রাখতে পারছেন না। তাদের একমাত্র দাবি, আনসারকে জাতীয়করণ করতে হবে।