Published : 18 Feb 2026, 04:13 PM
দৈনিক প্রথম আলো ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে এল ‘নতুন প্রাণশক্তি উত্থানের’ বার্তা। বলা হল স্বাধীন সাংবাদিকতার ‘দৃঢ় ঐক্য সৃষ্টির’ প্রত্যয়ের কথাও।
যে ভবনটি আগুনে পুড়েছিল, সেই ভবন থেকেই ছড়ালো ‘আলো’। সেই আলো থেকে মুক্ত সাংবাদিকতায় দিশারী হওয়ার প্রত্যাশার কথাও বললেন অনেকে।
বুধবার বসন্তের সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম আলোর অগ্নিদগ্ধ ভবনে শুরু হয়েছে ‘আলো’ শিরোনামে শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন শিল্পী মাহবুবুর রহমান।
আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সবার জন্য প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে বেলা ১টা এবং বিকাল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত প্রদর্শনী খোলা থাকবে।
গেল ১৮ ডিসেম্বর রাত পৌনে ১১টায় একদল উগ্রবাদী লোক প্রথম আলো কার্যালয়ে হামলা চালায়। তারা ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়ে প্রথম আলো কার্যালয়ের শার্টার ও বড় বড় কাচের দরজা ভেঙে ফেলে। ভেতরে ঢুকে তারা লুটপাট চালায়। জিনিসপত্র ভাঙচুর করে ও আগুন ধরিয়ে দেয়।
এরপর তারা দ্য ডেইলি স্টার ভবনে হামলা করে। তারা ডেইলি স্টার ভবনেও ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। একই রাতে সাংস্কৃতি সংগঠন ছায়ানট এবং পরদিন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়েও আগুন দেয় তারা।
প্রথম আলোতে হামলার ফলে সেই রাতে দৈনিকটির অনলাইন সংবাদ প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। প্রথম আলোর ২৬ বছরের প্রকাশনার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১৯ ডিসেম্বর ছাপা পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ থাকে। তবে এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যেও প্রথম আলো ঘুরে দাঁড়ায় এবং মাত্র ১৭ ঘণ্টার মধ্যে আবার অনলাইন কার্যক্রম শুরু হয়। ২০ ডিসেম্বর সকালে সারা দেশে পাঠক ছাপা পত্রিকা হাতে পান।
ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ভবনের সামনে বুধবার সকালে দেশের সংবাদপত্রের মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ ও গণমাধ্যমের কর্মীরা প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
‘আলো’ প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সঞ্চালক প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, “আমরা এখানে শুধু বিধ্বস্ত ভবন দেখব না। চিন্তাকে রুদ্ধ করার ঘৃণ্য হামলা এবং সেখান থেকে উত্তরণে চেষ্টাও দেখব। আমাদের কথা বলার অধিকারে সোচ্চার থাকার প্রেরণাও জোগাবে এই প্রদর্শনী।”
শিল্পী মাহবুব রহমান বলেছেন, “এখানে যেসব বস্তু দগ্ধ হয়েছে, সেগুলো যেন এই কর্মস্থলের প্রাণস্পন্দনের কথা ও দগ্ধ হওয়ার যন্ত্রণার কথাই বলেছে। সেই যন্ত্রণা ও সেখান থেকে প্রতিষ্ঠানটির ঘুরে দাঁড়ানো—এই উভয় বিষয়কে তুলে ধরেছি।”
বাংলাদেশ সংবাদপত্র মালিক সমিতির সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, “পুড়িয়ে প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা যায় না। এই পোড়া ভবন নতুন করে শিল্পকর্ম হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে। এর পাশাপাশি সাংবাদিকেরা এই হামলায় ভয় পেয়ে পালিয়ে যাননি। পরিস্থিতি মোকাবিলা করে তারা সাহসের সঙ্গে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।”

তিনি মনে করেন, ভবিষ্যতেও হয়তো সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের ওপর আঘাত আসতে পারে। এই শঙ্কা থেকেই পরিস্থিতি প্রতিহত করার জন্য সাংবাদিকদের প্রস্তুতি নিতে হবে, ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ বলেন, “এই প্রদর্শনীটি গভীর অর্থময়তা প্রকাশ করে।”
তিনি এই প্রদর্শনীটির ভিডিওচিত্র ও বিষয়বস্তু বাংলা–ইংরেজি উভয় ভাষায় সারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানান।
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম বলেন, “প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে আগুন দেওয়ার ঘটনাটি কেবল এই দুটি প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ নয়। এটা স্বাধীন সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে আগুন। চিন্তার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে আগুন।”
এই হামলার বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করার জন্য নতুন সরকারের কাছে দাবি জানান তিনি।
মাহফুজ আনাম বলেন, “আমি এই সরকারের কাছে অনুরোধ করব, কারা এর সঙ্গে জড়িত, কারা উস্কানি দিয়েছেন এখানে আগুন দিতে, তাদের যেন বিচার করা হয়।”
সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান মোহাম্মদ হানিফ বলেন, “সংবাদপত্র কার্যালয়ে হামলার ঘটনার মতো নিকৃষ্ট ঘটনা একটি সমাজে আর হতে পারে না। ১৯৭১ সালে দৈনিক সংবাদ কার্যালয়ে হামলা হয়েছে। গত ডিসেম্বরে প্রথম আলো, ডেইলি স্টারে হামলা হল। বিশ্বের কাছে এটা আমাদের দেশ সম্পর্কে অত্যন্ত খারাপ ধারণা সৃষ্টি করেছে।”

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেন, “সকল ভেদাভেদ ভুলে সাংবাদিকদের দৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।”
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকলে সমাজ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান প্রদর্শনীর জন্য শিল্পী মাহবুবুর রহমানকে ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, “এই প্রদর্শনীর মধ্যে দিয়ে শিল্পী ধ্বংসের মধ্যেও একটি গভীর প্রাণশক্তি ও আশাবাদের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। আমাদের এখন এই আশা ও শক্তিকে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।”
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম, ফটোসাংবাদিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কে এম মহসীন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মঈনুল হাসান সোহেল।