Published : 11 Nov 2025, 02:08 PM
নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যদি ফেরে, তারপরও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এ ব্যবস্থায় হওয়ার সুযোগ দেখছেন না আইনজীবীরা।
তাদের ভাষ্য, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এ ব্যবস্থায় করতে গেলে সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি শেষে মঙ্গলবার আইনজীবীরা এ মত প্রকাশ করেন।
শুনানি শেষে এ মামলার রায় ঘোষণার জন্য আগামী ২০ নভেম্বর দিন ধার্য করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে ৭ বিচারকের পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ মঙ্গলবার রায়ের এ তারিখ ধার্য করে দেয়।
পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের কিছু অংশ বাতিল করে হাই কোর্টের দেওয়া এক রায়ের ফলে ইতোমধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ফেরার পথ তৈরি হয়েছে।
এখন ত্রয়োদশ সংশোধনীর এ মামলায় সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে স্পষ্ট হবে– তত্ত্বাবধায়ক সকার ব্যবস্থা ফিরবে কি না এবং ফিরলে কবে, কীভাবে তা চালু হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে একাধিক রিভিউ আবেদনের শুনানি শেষে গত ২৭ অগাস্ট নতুন করে আপিলের অনুমতি দেয় পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ।
মঙ্গলবার রায়ের তারিখ ঘোষণার পর আপিলকারী বদিউল আলম মজুমদারের আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া বলেন, “আমরা এখন যে অবস্থায় আছি সাংবিধানিকভাবে সেটা কর্যকর করা সম্ভব নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরে এলেও এবার, অর্থাৎ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এই ব্যবস্থায় করার সুযোগ নেই। কারণ সংবিধান অনুযায়ী সংসদ ভেঙে যাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হয়। কিন্তু সংসদ ভেঙে গেছে এক বছরের বেশি হয়ে গেছে।”
একই মত প্রকাশ করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং জামায়াতে ইসলামির আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।
আদালতের নির্দেশনার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে অ্যাডভোকেট শরীফ ভূঁইয়া বলেন, “কনফিউশন এড়ানোর জন্য আদালত এ বিষয়টা পর্যবেক্ষণ দিয়ে স্পষ্ট করে দিতে পারে। না হলে দেখা যাবে যে আদালতের রায়ের বিভিন্ন ব্যাখ্যা হতে পারে। এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
“আদালত ব্যাখ্যা না দিলেও ব্যাখ্যা এটাই দাঁড়ায়। অনিশ্চয়তা অস্থিরতা এড়ানোর জন্য আদালত এ ব্যাখ্যাটা দিয়ে দিতে পারে। আরও কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয় এসেছে যেগুলো আদালত নিষ্পত্তি না করলেও চলবে। যেমন একটা প্রশ্ন এসেছে যে বিচারপতি খায়রুল হক অবসরে যাওয়ার পর যে রায় দিয়েছেন, সেটা অবৈধ হয়েছে। আমরা বলেছি বিচারকদের উপর অনেক কাজের চাপ। হঠাৎ এমন একটি সিদ্ধান্ত দিলে এক ধরনের সমস্যা তৈরি করবে। এ বিষয়টা নিষ্পত্তি না করলেও চলবে।”
এর আগে ৫ নভেম্বরের শুনানির পর বিএনপির আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, “আগামী যে নির্বাচন ফেব্রুয়ারির মধ্যে তার (তত্ত্বাবধায়ক) অধীনে এ নির্বাচন হবে এমনটা আমি মনে করি না। আদালতের যে রায়, যেটা আমি বলেছি পরবর্তী নির্বাচন, সুতরাং এ নির্বাচনের পরবর্তী থেকে এ বিধানটি কার্যকর হবে এমনটি আমি আদালতের সামনে উপস্থাপন করেছি।”
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের চাপে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান এনে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী সংসদে পাস করে তৎকালীন বিএনপি সরকার।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ১৯৯৮ সালে ওই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন এম সলিম উল্লাহসহ তিনজন আইনজীবী।
পরে বিএনপি সরকারের সময়ে ২০০৪ সালের ৪ অগাস্ট সেই রিট খারিজ হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বৈধই থাকে।
হাই কোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালে আপিল করেন রিট আবেদনকারীরা। ২০০৬ সালে রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে জরুরি অবস্থা জারির পর গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর ক্ষমতায় থাকার পর এ পদ্ধতির দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
পরে আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলে ২০১০ সালের ১ মার্চ আপিল বিভাগে ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার শুনানি শুরু হয়। শুনানিতে আপিল আবেদনকারী এবং রাষ্ট্রপক্ষ ছাড়াও অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে শীর্ষস্থানীয় ৮ জন আইনজীবী বক্তব্য দেন।
তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দেন। এমনকি তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও এর পক্ষে মত দেন।
ওই আপিল মঞ্জুর করে সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ ২০১১ সালের ১০ মে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে রায় দেয়। তখন প্রধান বিচারপতি ছিলেন এ বি এম খায়রুল হক।
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হওয়ার আগেই ২০১১ সালের ৩০ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলুপ্তিসহ ৫৫টি সংশোধনীসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী প্রস্তাব জাতীয় সংসদে পাস হয়। একই বছরের ৩ জুলাই তাতে অনুমোদন দেন রাষ্ট্রপতি।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে একাধিক রিভিউ আবেদন জমা পড়ে।
গত বছরের ২৭ অগাস্ট একটি আবেদন করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, তোফায়েল আহমেদ, এম হাফিজউদ্দিন খান, জোবাইরুল হক ভূঁইয়া ও জাহরা রহমান। একই বছরের ১৬ অক্টোবর আরেকটি আবেদন করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এরপর ২৩ অক্টোবর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও একটি রিভিউ আবেদন করেন। এছাড়া নওগাঁর বীর মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেনও আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে গত বছর একটি আবেদন করেন।
এ চার রিভিউ আবেদনের একসঙ্গে শুনানি শেষে নতুন করে আপিল শুনানির সিদ্ধান্ত দেয় আপিল বিভাগ।
গত ১৭ ডিসেম্বর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাই কোর্ট বেঞ্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করে রায় দেয়। ফলে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ফেরার পথ তৈরি হয়।
পুরনো খবর