১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ঢাকার জলাবদ্ধতা: প্রকল্প চলে, টাকা যায়, তবু বেরনোর পথ পায় না পানি

“ঢাকা পরিত্যক্ত হতে পারে, তবে অনেকগুলো কারণ থাকবে। এর মধ্যে জলাবদ্ধতাও একটা কারণ হতে পারে,” মনে করেন অধ্যাপক আকতার মাহমুদ।

ঢাকার জলাবদ্ধতা: প্রকল্প চলে, টাকা যায়, তবু বেরনোর পথ পায় না পানি
ঢাকায় গত জুলাইয়ে বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যায় ধানমন্ডি লেকের আশপাশের অনেক দোকান।

বিডিনিউজ২৪

সাখাওয়াত সুপন কৌশিক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 07 Sep 2026, 01:46 AM

Updated : 17 Sep 2026, 02:55 AM

ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেন হয়েছে; খাল উদ্ধারের প্রকল্প হয়েছে; হয়েছে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজও। আর এসব কাজের পেছনে বছর বছর ঢালা হচ্ছে কোটি কোটি টাকাও।

কিন্তু অবস্থা খুব একটা বদলায়নি; ভারি বৃষ্টি এখনও ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে তলিয়ে থাকে ঢাকার বেশির ভাগ রাস্তাঘাট। 

এর কারণ খুঁজতে গিয়ে অনেক কিছুই সামনে আনছেন ঢাকার বাসিন্দা থেকে শুরু করে নগর পরিকল্পনাবিদরা।

সমন্বয়হীনতার কথা এসেছে; পরিকল্পনা ঠিকঠাক বাস্তবায়ন না হওয়ার কথাও এসেছে। কাজে অনিয়ম; জলবায়ু পরিবর্তন; বিচ্ছিন্নভাবে অবকাঠামো নির্মাণ এবং আবাসিক প্রকল্পের অব্যবস্থাপনার কথাও তুলেছেন কেউ কেউ।     

ভারি বৃষ্টিতে ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে মূল সড়কের কী অবস্থা হয়, তা সবশেষ দেখা যায়  গত জুলাইয়ে।

বছরের পর বছর একই চিত্র

১২ জুলাই মতিঝিল, ফকিরাপুল, আরামবাগ, শান্তিনগর, রাজারবাগ, ধানমন্ডি, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকার সড়ক ও অলিগলি ডুবে গিয়েছিল। 

সেদিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঢাকায় ৮২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে আবহাওয়া অধিদপ্তর; ২৪ ঘণ্টায় ছিল ১৭৫ মিলিমিটার। 

সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে নয় বছর বয়সী ছিন্নমূল শিশু সামাদ বলে, “ঘুমানোর জায়গায় পানি উঠলে ফ্লাইওভারের ওপরে গিয়া বইসা থাকি, পানি নামলে আবার ফিরে আসি।”

টানা বৃষ্টিতে ফুটপাত তলিয়ে গেলে মালিবাগ রেল গেইট এলাকার অনেকেই সামাদের মতো রাত কাটান।

জুলাইয়ের ওই বৃষ্টির সময় মালিবাগের একটি বাস স্ট্যান্ডে  গাড়ির অপেক্ষায় ছিলেন সানজিদা সুলতানা। সেদিন এক ঘণ্টা আগে বাসা থেকে বেরিয়েও সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেননি তিনি। মাঝে জুতা হাতে পানির মধ্য দিয়েই হাঁটা দিতে হয়েছে তাকে।

ঢাকায় বৃষ্টিতে শ্রমজীবীদের আয়েও টান পড়ে। মিরপুরের রিকশাচালক আবদুল কাদের বলেন, “বৃষ্টি হলে সাধারণত আয় বাড়ে। কিন্তু জলাবদ্ধতার কারণে রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে যাওয়ায় বসে থাকতে হয়।”

একই অভিজ্ঞতা হকার রুহুল আমিনের। বৃষ্টির সময় সড়কে মানুষ না থাকলে বেচাকেনা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। 

টাকা খরচ থেমে নেই

ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত এক দশকে নালা নির্মাণ ও সংস্কার, খাল পরিষ্কার এবং জলাবদ্ধতা নিরসনসহ নানা কাজে অন্তত ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। 

২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২০— এই পাঁচ অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নালা নির্মাণ ও সংস্কারে ৬০৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা এবং ঢাকা উত্তর সিটি ৭১১ কোটি টাকা খরচ করে। 

প্রায় একই সময়ে ঢাকা ওয়াসার জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যয় ছিল ১০০ কোটি টাকার মতো। তিন সংস্থার ব্যয় মিলে দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা।

এরপর ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে খাল ও পানিনিষ্কাশনের দায়িত্ব যায় দুই সিটি করপোরেশনের হাতে। পরের চার বছরে তারা আরও অন্তত ৭৩০ কোটি টাকা খরচ করে। আগের ১ হাজার ৪১৬ কোটির সঙ্গে এই ব্যয় যোগ করেই ২০২৪ সাল পর্যন্ত অঙ্কটি ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

হিসাব করলে দেখা যায়, এ সময়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৯ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।

এর বাইরে সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই সিটি করপোরেশনের বরাদ্দ ছিল ১৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ডিএসসিসির ১১৫ কোটি টাকা; ডিএনসিসির ৫০ কোটি।

এত অর্থ ঢেলেও কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না। এর কারণ হিসেবে অনিয়ম ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কথা এসেছে।  

খরচের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে শান্তিনগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে ডিএসসিসি প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করে।

মালিবাগ রেলক্রসিং থেকে বিজয়নগর পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার স্টর্ম ড্রেনেজ লাইন নির্মাণে সেই টাকা খরচ করা হয়। 

ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নতুন ড্রেনের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি গন্তব্যে পৌঁছালেও তার পরে আর সরানো যাচ্ছে না। কারণ হিসেবে ঢাকা ওয়াসার ভাটিতে থাকা পাম্প স্টেশনগুলোর পর্যাপ্ত নিষ্কাশনক্ষমতা না থাকার কথা বলেছেন তারা। 

টাকা খরচ হলেও প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার কথা বলেছেন ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়ক এলাকার বাসিন্দারা। 

২০২১ সালে ওই সড়কের নিচ দিয়ে ২০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে এক কিলোমিটারের ড্রেন নির্মাণ করে ডিএসসিসি। 

সেখানে ‘আরসিসি’ ড্রেন নির্মাণের কথা থাকলেও পরে নকশা পরিবর্তন করে কংক্রিটের পাইপলাইন বসানো হয়। 

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রধান ড্রেনটি নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। এতে পলিমাটি ও বর্জ্য জমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। 

প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বেইলি রোডে ডিএসসিসির ফুটপাত ও ড্রেনেজ উন্নয়ন কার্যক্রমে। 

নির্ধারিত নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার না করা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর উপস্থিতি ছাড়া রাতে ঢালাইয়ের কাজ করায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। 

এছাড়া গত ২ অগাস্ট ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনের পর কাজ বন্ধের নির্দেশ দেন।

বিশ্লেষকদের মতে, গেল এক দশকে যে অর্থ বরাদ্দ ছিল, তা মূলত তাৎক্ষণিক ও স্বল্পমেয়াদী প্রয়োজন মাথায় রেখে খরচ করা হয়েছে। জলাবদ্ধতা দূর করতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার কথা বলেছেন তারা। 

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এক দশকে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার বড় অংশ দিয়ে মূলত ড্রেন ও খাল পরিষ্কারের মতো কাজ করা হয়েছে। টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থার জন্য ভবিষ্যৎ বিবেচনায় যে বিনিয়োগ প্রয়োজন, সেখানে পর্যাপ্ত অর্থ ব্যয় হয়নি।

“ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানের যেসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে ভালো ফল পাওয়া যেত, সেগুলো খুব কমই বাস্তবায়িত হয়েছে। বিশেষ করে ওয়াটার রিটেনশন পন্ড, অর্থাৎ জলাধার তৈরি করা, লেক তৈরি করা, এই জায়গাগুলোতে খরচ নেই। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি।” 

হটস্পট ১৪১টি, উদ্যোগও চলমান

গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৪১টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ ‘হটস্পট’ রয়েছে। এর মধ্যে ডিএনসিসিতে ১০৮টি এবং ডিএসসিসিতে ৩৩টি স্থান রয়েছে।

জলাবদ্ধতা নিরসনে ডিএনসিসি তাদের ১০টি অঞ্চলে ২১টি কুইক রেসপন্স টিম গঠন করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটি ১১৫ কিলোমিটার রাস্তা এবং ১২০ কিলোমিটার নর্দমা নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি ২৯টি খাল উদ্ধার এবং সীমানা নির্ধারণে পিলার স্থাপন করা হয়েছে।

অন্যদিকে ডিএসসিসি এলাকার পানি কমলাপুর-টিটিপাড়া, ধোলাইখাল ও হাতিরঝিলের আউটলেট দিয়ে নিষ্কাশিত হয়। ধারণক্ষমতা অপ্রতুল হওয়ায় সংস্থাটি নতুন দুটি আউটলেট নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ‘মেট্রো ঢাকা রেজিলেন্স প্রকল্পের’ অধীনে গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত আরেকটি আউটলেট নির্মাণের পরিকল্পনা প্রক্রিয়াধীন।

খাল পুনরুদ্ধারে ৮৯৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে কালুনগর, জিরানি, মান্ডা এবং শ্যামপুর খাল সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

গত ২৪ জুন অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এর অনুমোদন দেয়। প্রকল্পটি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অধীনস্থ ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড বাস্তবায়ন করবে।

দায়িত্ব হস্তান্তর ও সমন্বয়ের অভাব

নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের একটা বড় বাধা হিসেবে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যকার সমন্বয়হীনতাকেও দেখা হয়। 

ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “১৯৯০ সাল পর্যন্ত জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা চালাত। ১৯৮৮ সালের বন্যার পর দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার কাছে যায়। ২০২০ সালের শেষে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।”

দায়িত্ব হস্তান্তর প্রক্রিয়া নিয়ে ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ রাকিবুল হাসান বলেন, ঢাকা ওয়াসা ৪৩টির মধ্যে ২৯টি খাল হস্তান্তর করলেও সীমানা এবং আয়তনের কোনো দালিলিক হিসাব দেয়নি।

তবে ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আব্দুল মজিদ সীমানাসংক্রান্ত দাবি অস্বীকার করে বলেন, পাম্পহাউস থেকে শুরু করে ম্যানহোলের কাভার পর্যন্ত সবকিছু আনুষ্ঠানিকভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। 

ঢাকার জলাবদ্ধতার জন্য আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার দুষছেন ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “পুরো মহানগরটাই একটা অব্যবস্থাপনার মধ্যে ছিল। যেহেতু তারা পুরোপুরি দলীয়ভাবে ব্যবহার করেছে, সে কারণেই নাগরিক সুযোগ-সুবিধাগুলো নিশ্চিত হয়নি। এখন সবকিছু জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে।”

জলাবদ্ধতাসহ নানা সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাওয়া নাগরিকদের সেবার মান বাড়ানোর জন্য ‘সিটি গভর্নমেন্ট’ প্রতিষ্ঠায় জোর দিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

গত ১৫ জুলাই ডিএনসিসির নগর ভবনে এক সেমিনারে তিনি বলেন, নগর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব যার কাছে থাকার কথা, তার অধীনেই সব গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ নেই। 

“এ কারণেই দেশে দীর্ঘদিন ধরে ‘সিটি গভর্নমেন্ট’ প্রতিষ্ঠার দাবি রয়েছে।”

তার মতে, এসব বিভাগ ও সংস্থাকে সিটি করপোরেশনের অধীনে আনা গেলে সব সমস্যার সমাধান না হলেও অন্তত ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে এবং নগর ব্যবস্থাপনায় অগ্রগতি আসবে।

কবে নাগাদ তা প্রতিষ্ঠিত হবে জানতে চাইলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সরকারের পরিকল্পনা আছে, এ বিষয়ে বাস্তবায়নের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।”

অবকাঠামো ও জলবায়ু পরিবর্তন

জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে শহরের ভূগর্ভস্থ নিষ্কাশন ব্যবস্থার ত্রুটি তুলে ধরেন ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান।

তিনি বলেন, ঢাকায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন থাকলেও সুয়্যারেজ লাইন না থাকায় গৃহস্থালি ও পয়োবর্জ্যে ড্রেন অবরুদ্ধ থাকে। গুলশান, বনানী, বারিধারার মতো এলাকায় ওয়াসা কোনো সিউয়ারেজ লাইন দিতে পারেনি। এছাড়া মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো মেগা প্রকল্পের নির্মাণকাজ এবং শহরের সম্প্রসারিত এলাকায় জলাশয় ভরাটের কারণে পানিপ্রবাহের প্রাকৃতিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের তীব্রতা বেড়েছে। আগে ড্রেনের নকশায় সর্বোচ্চ ১৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতকে মানদণ্ড ধরা হলেও এখন তা ৩০০ মিলিমিটার ধরতে হচ্ছে।”

তার মতে, শহরের অধিকাংশ এলাকা কংক্রিটে আচ্ছাদিত থাকায় বৃষ্টির পানির প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ সরাসরি ড্রেনে প্রবেশ করছে।

ঢাকার জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে বেসরকারি আবাসন প্রকল্পের কথাও বলা হয়। বিভিন্ন সময়ে করা গবেষণাতেও এসব প্রকল্পের কথা উঠে এসেছে।

২০১৪ সালে ‘সাসটেইনেবল সিটিজ অ্যান্ড সোসাইটি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে ঢাকার বন্যাপ্রবাহ এলাকা কমে যাওয়ার হিসাব তুলে ধরা হয়।

তাতে দেখা যায়, ঢাকা মহানগর উন্নয়ন পরিকল্পনার (ডিএমডিপি) আওতাভুক্ত এলাকায় ১০ হাজার হেক্টর বন্যাপ্রবাহ এলাকা  আবাসন প্রকল্পে রূপান্তর করা হয়েছে।

ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ রাকিবুল হাসান মনে করেন, ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের হাতে গিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তারা এখনও ড্রেনেজ অবকাঠামোর ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ পায়নি। 

নিয়ন্ত্রণ না পাওয়া এসব অবকাঠামোর মধ্যে বেসরকারি বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পও রয়েছে।  

বেসরকারি আবাসন প্রকল্পের কারণে জলপ্রবাহের পথ ও জলাধার হারানোর অভিযোগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ঘাটতিকেই বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান।

তিনি বলেন, “কোনো আবাসন প্রকল্পের এলাকায় একটি সিটি করপোরেশনের প্রবেশ বা কার্যকরভাবে কাজ করার সুযোগ না থাকাটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

 তার মতে, আবাসন প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা, অনুমোদন ও বাস্তবায়ন পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি।

নীতিনির্ধারণী সংকট ও সমাধান

ঢাকার জলাবদ্ধতার আরেকটি কারণ হিসেবে নানা সময়ে নেওয়া পরিকল্পনার বাস্তবায়নে ঘাটতি দেখছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসন অসম্ভব নয়। ওয়াসার অধীনে ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা থাকাকালে https://media-

বিভিন্ন সময়ে করা গবেষণায় ক্যাচমেন্টভিত্তিক পানিপ্রবাহের পথ এবং শহর থেকে পানি বের হওয়ার আউটলেটও নির্ধারণ করা হয়েছিল।

তবে দীর্ঘদিনেও ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানে থাকা প্রধান প্রস্তাবগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি বলে মনে করেন তিনি।

“বছরের পর বছর শুধু খাল পরিষ্কার করা কিংবা কোথাও কোথাও খাল দখলমুক্ত ও সংরক্ষণের কাজ হয়েছে। কিন্তু ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানে থাকা প্রধান প্রধান প্রস্তাব বাস্তবায়ন হয়নি,” বলেন অধ্যাপক আকতার মাহমুদ।

তিনি বলেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার জন্য নির্ধারিত পাঁচটি রিটেনশন পন্ড তৈরি, সেগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্যাচমেন্ট এলাকার সংযোগ স্থাপন এবং পানিপ্রবাহের পথ প্রতিবন্ধকতামুক্ত রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো এখনও হয়নি।

“এসব কাজ হয়নি। যে কারণে এখন আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, এটা একটা অসম্ভবের জায়গা তৈরি হয়ে গেছে।”

তবে তার মতে, ২০১৫-১৬ সালের ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানকে ভিত্তি করে এর প্রধান প্রধান প্রস্তাব বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে জলাবদ্ধতা এখনও নিয়ন্ত্রণযোগ্য সমস্যা।

আকতার মাহমুদ বলেন, “ঢাকার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা এখন নির্মিত এলাকায় পরিণত হয়েছে। ফলে শহরকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। কংক্রিটসহ বিভিন্ন শক্ত পৃষ্ঠের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত সড়কে চলে আসে। বিপুল পরিমাণ পানি দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার জন্য বিদ্যমান চ্যানেলগুলোর ধারণক্ষমতাও অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নয়।”

তাই সব এলাকায় একই মাত্রায় জলাবদ্ধতা বন্ধ করা সম্ভব না হলেও পানি নিষ্কাশনের পথগুলো উন্মুক্ত করা, খাল পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ এবং পানি ধরে রাখার স্থান তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

“ড্রেনেজ চ্যানেলগুলোকে প্রতিবন্ধকতামুক্ত করা, খালগুলো পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করা, পানি ধারনের স্থান তৈরি করা— এসব কাজ করা সম্ভব। এগুলো করে ফেলতে হবে,” বলেন তিনি।

ঢাকার ভবিষ্যৎ নিয়েও সতর্ক করেন এই নগর পরিকল্পনাবিদ।

“ঢাকা পরিত্যক্ত হতে পারে, তবে এর অনেকগুলো কারণ থাকবে। এর মধ্যে জলাবদ্ধতাও একটা কারণ হতে পারে। তবে আমার সাজেশন থাকবে, ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানে যে প্রধান প্রস্তাবনাগুলো আছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করাতে হবে,” বলেন তিনি।

পুরনো খবর

ঢাকায় ২৭ ঘণ্টায় ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টিতীব্রতা কমবে মঙ্গলবার থেকে

ঢাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনডিএসসিসির মতে 'কঠিন', ডিএনসিসি বলছে 'কাজ চলছে'

রাজধানীতে আঝোর বৃষ্টিতে সড়কে পানিচলতি পথে ভোগান্তি

ঢাকায় ৬ ঘণ্টায় ৮২ মিলিমিটার বৃষ্টিভারি বৃষ্টি আরও দুইদিন

ভারি বৃষ্টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জলাবদ্ধতাক্লাস বাতিল