Published : 20 Sep 2025, 01:36 AM
ঘিঞ্জি বাড়িঘরের মাঝখান দিয়ে সরু অলিগলি ধরে চলা রিকশা, গাড়ির যানজট, চারদিকে হৈচৈ, আর চরম বিশৃঙ্খল একটি এলাকার নাম পুরান ঢাকা। অথচ রাজধানীর দক্ষিণের এই অংশ এখনো বুকে ধরে আছে প্রাচীন ঢাকার নানা চিহ্ন। যদিও এসব পুরনো স্থাপনার কিছু একেবারেই মুছে গেছে, কিছু দখল হয়ে ধুঁকছে আর ভেঙে ফেলা হচ্ছে কিছু স্থাপনা।
নানা সময়ে নানা পর্যায় থেকে এসব ঐতিহাসিকভাবে মূল্যবান স্থাপনা সংরক্ষণের কথা বলা হলেও সেগুলোকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনায় চ্যালেঞ্জও কম নয়।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বলছে, ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণের দায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের। অনুরোধ এলে তারা সহায়তা করবেন।
আর ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, স্বত্ব বিনিময়ের মাধ্যমে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ভবনগুলো সংরক্ষণ করতে পারে। পরবর্তীতে সেগুলো পর্যটন স্থান হিসেবে তৈরি করা যায়, যেখান থেকে সরকারের আয়ও হবে।
সংরক্ষণের উদ্যোগটা সরকারিভাবেই নিতে হবে বলে মনে করেন সেভ দ্য হেরিটেজেস অব বাংলাদেশ’র পরিচালক সাজ্জাদুর রশীদ।

বিকে দাস রোডের ৮/১০টি পুরনো স্থাপনা সংরক্ষণের মাধ্যমে পর্যটনকেন্দ্র করা যেতে পারে মত দিয়ে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তাদেরকে (বসবাসকারী) যদি কোনোভাবে পুনর্বাসিত করতে পারে, ঘর বাড়ি তৈরি করে দেওয়া হয়- সরকার সেটাকে অধিগ্রহণ করে সংরক্ষণ করতে পারে।
“যেহেতু হেরিটেজ বলছি, স্বাভাবিকভাবেই সরকারের দায়িত্ব হবে তাদেরকে অন্য কোথাও নিয়ে গিয়ে উদ্ধার করে সংরক্ষণ করা। পর্যটনের জায়গা হলে সরকারের আয়ও হবে। সব বিল্ডিংকে তো আমরা ঐতিহ্য বলছি না, এই বিল্ডিংগুলোর একটা স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য আছে।”
পুরান ঢাকার ঐতিহ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা আরবান স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী তৈমুর ইসলামের মত হল- শুধু ভবন না, এলাকাও সংরক্ষণ করতে হবে।

“ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণ করতে হবে। ডকুমেন্টস থাকলে অধিগ্রহণ করো, না থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নাও। আর্মিরা (রূপলাল হাউজ) যেখানে থাকে, সেটা অর্পিত সম্পত্তি না। কত রকমের জালিয়াতি; আর আমরা শুনছি দখলে আছে। এখনই যদি কোনো কাজ করা না যায়, তাহলে আর রাখা যাবে না,” বলেন তৈমুর।
পুরান ঢাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একপাশে আলাদা করে সেখানে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার কথা বলছেন তিনি।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “একটা প্রত্নস্থল তালিকায় থাকলেই সেটা সবসময় সরকারের দখলে থাকে না।
“এত ধরনের পেশাজীবী এটা ব্যবহার করছেন, মানুষ বসবাস করছেন যে তাদের সকলকে পুনর্বাসন করে বা সরিয়ে দিয়ে কাজটা করতে হবে। এটা বড় একটা চ্যালেঞ্জ।”
২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পুরান ঢাকার ২ হাজারের বেশি বাড়ি পরিদর্শন করেছেন তারা। এর মধ্যে পাঁচ-ছয়শ বাড়ির তালিকা আদালতে জমা দিয়েছেন, দুয়েক বছরের মধ্যে বাকিগুলোও জমা দেওয়ার কথা বলছেন তিনি।

আফরোজা খান বলেন, “এরপর কোনো নির্দেশনা এলে প্রথমে সংরক্ষণের তালিকায় নেওয়ার পরে সেটার জন্য আমাদের যে বার্ষিক বরাদ্দ থাকে, সেখান থেকে হয়ত আমরা কাজ করা শুরু করব।
“অনেক বেশি বাজেট নিয়ে নামতে হবে, কাগজপত্র সংগ্রহ করা, সেগুলোর আলোকে মালিকানা কার আছে, তার সাথে চুক্তিতে যাওয়া- সেগুলা নিয়েও ভবিষ্যতে কাজ করব।”
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ঐতিহাসিক ভবনে পরিবর্তন আনার বিষয়টি নজরে এলে তারা বাধা দেবেন। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর তালিকা করে রাখলেও এখনও কোনোটাই সেভাবে সংরক্ষণ হয়নি।
“তাদের হয়ত জনবল বা বাজেটের সংকট থাকতে পারে। পুরো ভবনে তাদের মনিটরিং দরকার। তারা সরকারের থেকে বাজেট নিয়ে হোক বা রাজউক, সিটি করপোরেশনের সঙ্গে বসে যদি বলে, আপনারা দেখভাল করেন। তখন নিজস্ব ফান্ডে হোক বা সরকারের ফান্ডে একটা প্রজেক্টের আওতায় কাজগুলো করা যেত।”

কেমন আছে ঐতিহাসিক ভবনগুলো?
ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, পুরান ঢাকায় অন্তত ২২০০টি ভবন ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণের যোগ্য। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ২০২৪ সালের অগাস্ট পর্যন্ত ঢাকা জেলার কেবল ৩৫টি সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকা করতে পেরেছে।
এর মধ্যে পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জের ‘রূপলাল হাউজ’ ও ‘সূত্রাপুর জমিদার বাড়ি’ রয়েছে। দুটো ভবনই ১৯৮৯ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পত্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়েছে।
ওই তালিকায় ‘সূত্রাপুর জমিদার বাড়ি’ নিয়ে বলা হয়েছে, এক একর জমির উপর তৈরি বাড়িটি দুই তলা বিশিষ্ট। ইমারতের সামনে রিনথিয়ান স্তম্ভ এবং বারান্দা রয়েছে। ভেতরে বিভিন্ন আকৃতির ৩৫টি কক্ষ ও বর্গাকৃতির একটি উন্মুক্ত অঙ্গনের তিন দিকে ইমারতের সারি এবং কারুকার্যে সুশোভিত। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে রেবতী মোহন দাস নামে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি বাড়িটি তৈরি করেন।
‘রূপলাল হাউজ’র বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এভাবে- দুই তলা ভবনটি দুইভাগে বিভক্ত এবং পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত। ছাদের উপরে রয়েছে একটি বড় ত্রিভুজ আকারের পেডিমেন্ট। মাঝামাঝি অংশে ভবনের প্রবেশ পথ। ইট, চুন, সুরকির তৈরি ভবনটির দরজা-জানালায় কাঠের ভেনিসিয়ান গ্রিল, সিঁড়িতে অলংকরণ করা লোহা ও খিলানে রঙিন কাচ ব্যবহৃত হয়েছে। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ঢাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রূপলাল দাস ভবনের পশ্চিম অংশ তৈরি করেন এবং তার ছোট ভাই রঘুনাথ দাস পূর্ব দিকে সম্প্রসারণ করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
সম্প্রতি সূত্রাপুর জমিদার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটকে ‘সংরক্ষিত এলাকা সর্ব সাধারণের প্রবেশ নিষেধ’ লেখা সাইনবোর্ড ঝোলানো। ভবনের পলেস্তারা খসে পড়েছে, জানালায় চিড় ধরেছে, ভেঙে পড়েছে কারুকার্য, পানি সরবরাহের জন্য বসানো হয়েছে ট্যাংক, বিদ্যুতের মিটার; কক্ষের ভেতরে টাইলস, বেসিন, বাথরুম করা হয়েছে। সীমানা প্রাচীরের ভেতরেই ভবনের একপাশে নতুন দুটো ভবন তৈরি করে সূত্রাপুর ফায়ার স্টেশন ও ব্যারাক করা হয়েছে।

অথচ পুরাকীর্তি সংক্রান্ত আইন বলছে, প্রাচীন জিনিস ধ্বংস, অপসারণ, পরিবর্তন বা বিকৃত করা এর আশেপাশে নির্মাণের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকবে।
রশিদ নামের একজন ফায়ার ফাইটার বললেন, ছয় বছর আগে ফায়ার স্টেশন উদ্বোধন করা হয়েছে।
“পুরনো বিল্ডিংয়ে ফায়ার সার্ভিসের স্টাফরা থাকে পরিবার নিয়ে। সরকারকে ভাড়া দেয়। ভাড়া একটু কম। পানি, বিদ্যুৎ সব আছে। আমি ব্যারাকে থাকি।”
পুরনো ভবনে পাওয়া গেল সাদিকা নামের এক নারীকে, তার স্বামী ফায়ার সার্ভিসে কর্মরত। তিনি বলেন, ভবনে ৭০টি পরিবার থাকে। তারাও এখানে পরিবারসহ থাকছেন।
পুরনো এই স্থাপত্য নিয়ে রাজউকের নজরদারির অভাব যে রয়েছে, তা স্পষ্ট রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলামের কথায়।
তিনি বলেন, “অনুমতি ছাড়া করে (পরিবর্তন) থাকলে ঠিক হয়নি। পরিবর্তনের বিষয়গুলো আমাদের নজরে আসেনি, তাই পদক্ষেপ নিতে পারিনি।”
রূপলাল হাউজের বাইরের অংশের নিচ তলায় মসলা ও পানের আড়ৎ করে রাখা হয়েছে, ভেতরের অংশে বসবাস সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের। ভবনের বাইরে ‘জামাল হাউজ’ এবং ‘রূপলাল হাউজ আবাসিক এলাকা, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী’ নামে সাইনবোর্ড দেখা গেল। ভবনটির বিভিন্ন অংশের পলেস্তারা খসে পড়েছে, নষ্ট হয়েছে কারুকার্য, ভেঙে পড়া কিছু জায়গায় টিন লাগানো হয়েছে।
ওই ভবনে থাকা আড়তের লোকজন কথা বলতে রাজি হননি। তবে বৈশাখী বাণিজ্যালয়ের আব্দুর রাজ্জাক বললেন, ১৯৭২ সালে দোকানের মালিক সরকার থেকে এটি লিজ নেছে। দোকানের সাইনবোর্ডে দেলোয়ার হোসেন লেখা থাকলেও মালিকের নাম তিনি হাজী জুয়েল আখতার বললেন।

বাড়ির ভেতরে যেতেই চোখে পড়ল, লাল অক্ষরে লেখা ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক সংরক্ষিত এলাকা, সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ’। এলাকার বাসিন্দারাও বলছেন, এর ফলে দীর্ঘদিন ধরেই ভেতরে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাধা পাচ্ছেন তারা।
বাড়িতে থাকা রিতা নিজেকে সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেন, “এটা কোয়ার্টার, সেনাবাহিনীর আন্ডারে আছে। জাহাজে যারা থাকেন তাদের পরিবার এখানে থাকে। বাসা নেওয়ার জন্য অফিসে আবেদন করা লাগে তখন দেয়। এখানে থাকলে বাসা ভাড়া লাগছে না, বিদ্যুৎ, পানি সবকিছুর সুবিধা আছে। বাইরের কেউ থাকে না।”
বাড়ি দুটোর বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা বলেন, সরকারের দখলে নিতে অতীতে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও গত দুই আড়াই বছরে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
“তাদেরকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে, সেটার জন্য টাকা লাগবে। যদি এটাকে আমাদের কিনতে হয়, যারা এখন আছেন তাদের ব্যবসা রুটিরুজি তো এখানে…হুট করে করা যায় না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়। কী কী করা যায় আমাদের ভাবনার মধ্যে আছে।”
পুরান ঢাকার আরেকটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ‘বিউটি বোর্ডিংয়ের’ পাশের জমিদার বাড়িটি ঢেকে রেখেছে বটগাছের শিকড়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিছু অংশের দেয়াল। বাড়িটির বাইরের অংশে দোকান, সেলুন করা হয়েছে আর ভেতরের নিচ তলায় থাকছে একটি পরিবার এবং উপরের তলার এক পাশে পুলিশ ফাঁড়ি, আরেক পাশে পুলিশ সদস্যরা থাকেন। বাড়ির দেয়ালে ‘বিউটি বোর্ডিং’, ‘কমিউনিটি পুলিশ অফিস’ সাইনবোর্ড।
বাড়ির নিচতলায় কয়েকজন নারীকে পাওয়া গেল। এর মধ্যে এক প্রৌঢ় নারী এখানে থাকার বিষয়টি স্বীকার করলেও কীভাবে থাকছেন তার উত্তর দেননি।

পুলিশ ফাঁড়ির কনস্টেবল কাওছার বলেন, “নিচে পাবলিক নিজেরা দখল করে থাকছে। এখানে পুলিশ ফাঁড়ি অনেক দিন ধরেই, আমরা নতুন তাই সময় বলতে পারছি না।”
নাম প্রকাশ না করে এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, “মন্দিরে পূজা করতে আসত। পরে এরা দখলে নিছে। ২০/২৫ বছর ধরে থাকে।”
রতন সেলুনের রতন বলেন, নিচতলার দোকানদাররা মাসে মাসে বিউটি বোর্ডিংকে ভাড়া দেয়; তিনিও দেড়/দুই হাজার টাকা ভাড়া দেন।
“বাড়ির মালিক কে জানি না। ভেতরে যারা থাকে এরা মাগনা থাকে।”
দোকানগুলো ভাড়া দিয়েছেন কি না, জানতে চাইলে বিউটি বোর্ডিংয়ের তত্ত্বাবধানে থাকা সমর সাহা বলেন, “বিল্ডিংয়ের বাইরে হলে- ওগুলা তো আমাদের না। আমাদের কমপ্লেক্সের বাইরে আমাদের কিছু নাই, অন্যের।”
ফরাশগঞ্জের ‘মঙ্গলালয়’ বাড়িটি ব্যবহৃত হচ্ছে মসলার আড়ৎ হিসেবে, বাড়ির ভেতরে থাকছেন আড়তের শ্রমিকরা। বাড়ির বাইরে জাতীয় পার্টির নেতা সাইফুদ্দিন মিলনের পোস্টার সাঁটানো।
মসলার আড়ৎ রিফাত বাণিজ্যালয়ের সাইদুর রহমানের দাবি, দোকান আর গুদামের জন্য মাসে তিনি ৫৫ হাজার টাকা করে ভাড়া দেন সাইফুদ্দিন মিলনকে।
সাইফুদ্দিন মিলন নিজেকে বাড়িটির মালিক হিসেবে দাবি করেছেন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ২০১০/১১ সালে ‘এক হিন্দু বাবুর’ কাছ থেকে তিনি বাড়িটি কিনেছেন; যিনি পরে ভারতে চলে গেছেন। বাড়িটি সংরক্ষণ না করে বড় ভবন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তার, দুই তিনবার বাড়িটির আস্তরও করা হয়েছে।
“এটা হিন্দু প্রপার্টি, নর্মাল হিন্দুগো। এটা তো কোনো জমিদার-টমিদার না। যখন কিনছি না, তখন এইডারে ভাংতে পারতাম। তখন সমস্যা হইছে ড্যাবের আইনের মধ্যে আমার বাড়ির অর্ধেক দিক চইল্যা গেছিল। তখন আমারে রাজউক থেকে বলছিল, ‘আপনি ভাইঙেন না ড্যাবের আইনটা সংশোধন হচ্ছে। তাইলে আপনি পুরো বাড়িতে কাজ করতে পারবেন’। এজন্য বাড়িটা ভাঙিনি। এটা তো প্রত্নতত্ত্বে যাওয়ার মত বাড়ি না।”
হৃষিকেশ বাবুর বাড়ির বাইরের দেয়ালে সাইনবোর্ডে লেখা ‘এই বাড়ির মালিক আলহাজ্ব গোলাম মাওলা মল্লিক’। বাড়ির ভেতরের অংশের দেয়ালে নতুন রঙ করা হয়েছে, তবে ফটক বন্ধ থাকায় বাড়ির ভেতরে যাওয়া যায়নি।
এলাকার এক বাসিন্দা প্রকাশ না করে বলেন, পরিবারটি ৪০/৫০ বছর ধরে এখানে থাকছে। তাদের আড়তের কর্মচারীরাও এখানে থাকেন।
বাড়ির উত্তরাধিকারী সানি মল্লিক বলেন, “এটা আমাদের বাড়ি। এটা আমার দাদা কিনছিল ঋষিকেশ বাবুর কাছ থেকে।”
গত জুনে কোরবানির ঈদের ছুটির মধ্যে পুরান ঢাকার নারিন্দায় ‘মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন স্মৃতি ভবন’ ভাঙার চেষ্টা করা হয়। আর পুরোপুরি ভেঙে ফেরা হয় শতবর্ষী নারিন্দা স্যুয়ারেজ পাম্পিং স্টেশনের ঐতিহাসিক একটি ভবন, যেটি ঢাকা ওয়াসার প্রথম স্যুয়ারেজ পাম্পিং স্টেশন।
শরৎগুপ্ত রোডের নাসিরউদ্দীন স্মৃতি ভবনটি ‘সওগাত’ পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন, ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগম, সাহিত্যিক রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাইয়ের স্মৃতিবিজড়িত।
ঈদের ছুটিতে ভবনটি ভাঙার কাজ শুরু হয়। বিষয়টি জানতে পেয়ে ১৪ জুন গেণ্ডারিয়া থানায় জিডি করে আরবান স্টাডি গ্রুপ। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তরফেও জিডি করা হয়। এরপর বাড়িটি ভাঙার কাজ ঠেকিয়ে রাখে পুলিশ।
এই ভাঙচুরের ঘটনাগুলো ঘটেছে কখনও বেসরকারি ভবনে, কখনও সরকারি মালিকানাধীন বা ব্যবস্থাপনাধীন ভবনে। এমনকি আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেও স্থাপনা ভাঙচুর করা হয়েছে বলে আরবান স্টাডি গ্রুপের এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়।
আইন কী বলে?
পুরাকীর্তি আইন বলছে, কোনো জমিতে প্রাচীনত্ব রয়েছে- সরকারের এমন যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকলে সেটি বা এর কোনো অংশ অধিগ্রহণ করতে পারে। সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, যে কোনো প্রাচীন জিনিসকে একটি সুরক্ষিত প্রাচীন জিনিসপত্র হিসেবে ঘোষণা করতে পারে।
প্রাচীন জিনিস ধ্বংস, অপসারণ, পরিবর্তন বা বিকৃত করা অথবা প্রাচীনত্বের স্থানে বা তার কাছাকাছি নির্মাণ করার ক্ষেত্রে মালিকের অধিকারের ওপর বিধিনিষেধ থাকবে। জনসাধারণের প্রবেশাধিকারের সুযোগ-সুবিধা; স্বত্ব বিনিময়ের ফলে মালিক বা দখলদার বা অন্য কোনো ব্যক্তির ক্ষতির জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
প্রাচীন জিনিসপত্রের মালিকের খোঁজ পাওয়া না গেলে, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সরকারের অনুমোদন নিয়ে এবং যতক্ষণ মালিকের খোঁজ না পাওয়া যায়, ততক্ষণ সংরক্ষণ ও সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে।
কোনো পুরাকীর্তি ধ্বংস, ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে সরকারের এমন আশঙ্কা থাকলে উপদেষ্টা কমিটির সঙ্গে পরামর্শের পর জনসাধারণের উদ্দেশ্যে এই ধরনের পুরাকীর্তি বা এর কোনো অংশ অধিগ্রহণ করতে পারে।
যে প্রাচীন জিনিসপত্রের কোনো অধিকার সরকার অর্জন করেছে; সেগুলো ধ্বংস, ভাঙা, ক্ষতি, পরিবর্তন, বিকৃত অথবা লেখা বা খোদাই করা বা স্বাক্ষর করা যাবে না।
কেউ এ বিধান লঙ্ঘন করলে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।
জাতীয় বিল্ডিং কোড ২০২০-এ বলা হয়েছে, ঐতিহাসিক বা স্থাপত্যিকভাবে মূল্যবান যেসব ভবন প্রত্নতাত্ত্বিক তালিকাভুক্ত সেগুলো সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় মেরামত, পরিবর্তন এবং সংযোজন করা যেতে পারে, তবে তা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ অনুমোদিত হতে হবে। মেরামতের প্রয়োজন হলে, সেগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।
রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) পুরান ঢাকার একটা বড় অংশকে ঐতিহ্যবাহী এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সেখানে বলা হয়েছে, ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মহাপরিকল্পনাভুক্ত এলাকার ঐতিহাসিক, নান্দনিক, বৈজ্ঞানিক, সামাজিক / ধর্মীয় গুরুত্ব বিবেচনায় ৭৪টি স্থাপনা/ভবন/এলাকাকে ঐতিহ্যবাহী বিশেষ ভবন/স্থাপনা/এলাকা হিসেবে সংরক্ষণের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। নগর উন্নয়ন কমিটির অনুমোদন ছাড়া এগুলোর আংশিক বা সম্পূর্ণ অপসারণ/ পুনঃনির্মাণ/ পরিবর্তন/ পরিবর্ধন/ পরিমার্জন/সংযোজনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। হেরিটেজ সাইটের সীমানাপ্রাচীর থেকে ২৫০ মিটার ব্যাসার্ধ পর্যন্ত সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।’
সংরক্ষিত এলাকায় কোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে চাইলে তাকে পরিকল্পনায় নির্দেশিত শর্ত পূরণ এবং বিশেষ প্রকল্প কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে নির্মাণ অনুমতি নিতে হবে।
• তালিকাভুক্ত ইমারত/স্থাপনার সীমানা প্রাচীর থেকে ২০ মিটার পর্যন্ত সম্পূর্ণ খালি রাখতে হবে। এ দূরত্বের মধ্যে কোনো নির্মাণ/উন্নয়ন করা যাবে না। পরবর্তী ২৫ মিটার দূরত্ব পর্যন্ত ইমারতের উচ্চতা সর্বোচ্চ ১০ মিটার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকতে পারবে। এর পরবর্তী অংশে (২৫০ মিটারের অবশিষ্ট এলাকা) ইমারতের উচ্চতা সর্বোচ্চ ১৫ মিটার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকতে পারবে।
• সংরক্ষিত এলাকায় ইতোমধ্যে অবৈধ/অনুমোদনবিহীন/অনুমোদনের ব্যত্যয় করে নির্মিত কোনো স্থাপনা/ভবন থাকলে যথাযথ কর্তৃপক্ষ ইমারত নির্মাণ আইন এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি মেনে সেগুলো উচ্ছেদসহ প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।
সেভ দ্য হেরিটেজের সাজ্জাদ বলেন, “ঐতিহ্যগুলো সংরক্ষণ না করে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিলে শেকড় ছাড়া প্রজন্ম গড়ে উঠবে।”
তিনি বলছেন, “যারা থাকছে, তারা ভেঙে ফেলতেছে ভবনের অনেক কিছু। ইচ্ছাকৃতভাবে যদি দেখানো যায় ধ্বংস হয়ে গেছে বা যাচ্ছে, তাহলে ভেঙে নতুন ভবন তৈরি করতে পারবে। এই কাগজপত্রগুলো কীভাবে আসছে? এটা কতটুকু অথেনটিক?”
সরকার যদি আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা না করে- তাহলে প্রাচীন স্থাপনা রক্ষা করা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন স্থাপত্য সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ আবু সাঈদ এম আহমেদ।
তিনি বলেন, “অনেক স্থাপনা তো আছে ব্যক্তি মালিকানাধীন। এখন বাজারের চাহিদা অনুযায়ী অনেকে ভেঙে ফেলছেন। যেসব জায়গায় প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা আছে, সেখানে অন্য স্থাপনা করা যাবে না বলে আইনও আছে। তাই কেউ কেউ রাতের আঁধারে ভেঙে ফেলছেন।
“শুধু আইন থাকলেই তো চলবে না। সেসব স্থাপনা ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি, তারা তো সেখানে নতুন স্থাপনা করবেনই। এখন সরকারকে প্রণোদনা দিতে হবে এবং অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের ব্যাপারে কঠোর হতে হবে।”
আরবান স্টাডি গ্রুপের তৈমুর বলেন, প্যারিদাস রোডে কেবল ৩/৪টা পুরনো ভবন রয়েছে, হেমেন্দ্র দাস রোডের একটা অংশ খালি করে ফেলা হয়েছে।
“আস্তে আস্তে এমন সময় আসবে, যখন আর পুরনো এলাকাগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে না। উঁচু উঁচু বিল্ডিংগুলো যখন করে ফেলছে…প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ যে কী করে- তারাই জানে। লোকাল পলিটিক্স, বিজনেস জড়িত, জমির মালিকদের স্বার্থ রয়েছে। ঐতিহ্য রক্ষার কোনো উদ্দেশ্য কারোর নাই।”