Published : 20 Apr 2026, 12:25 AM
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে সংকট চলার মধ্যে তেলের দাম বাড়ানো হলেও পেট্রোল পাম্পগুলোতে গাড়ির লাইন আগের মতোই দেখা যায়।
রোববারও তেলের জন্য ছয় থেকে ১৫ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কথা বলেছেন চালকরা।
তেলের লাইনে অপেক্ষা করা চালকরা বলছেন, পাম্পে তেল না পেলেও খোলা বাজারে ঠিকই পাওয়া যাচ্ছে, দর ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা লিটার।

অন্যদিকে অনলাইন শপগুলোতে গাড়ি থেকে তেল নামানোর পাইপ ও সংরক্ষণের সরঞ্জাম বিক্রির বিজ্ঞাপন বেড়েছে বলে ব্যবহারকারীদের অনেকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন।
শনিবার প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন সরকারের দুই মাস পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে জনস্বার্থে ভর্তুকি বাড়ানোর কথা বলেছিলেন।
এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে অনেকটা বাড়ানোর ঘোষণা আসে।
ডিজেলের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০, পেট্রোল ১৩৫ এবং কেরোসিন ১৩০ টাকা।
এতে করে লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা (আগের দর ১০০ টাকা), অকটেন বেড়েছে ২০ টাকা (আগের দর ১২০), পেট্রোল বেড়েছে ১৯ টাকা (আগের দর ১১৬) এবং কেরোসিন বেড়েছে ১৮ টাকা (আগের দর ১১২)।
এর আগে বেশ কয়েক মাস ধরে এ চার ধরনের তেলের দাম প্রায়ই একই রকম ছিল। সবশেষ এপ্রিলেও তা অপরিবর্তিত রাখা হয়। আর এর আগের কয়েক মাসের মধ্যে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সমন্বয় করতে বাড়ানো বা কমানো হলেও তা এক দুই টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত।
পাম্পের আগের মতোই তেলের লাইন
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরদিন রোববার সকাল ৮টায় আসাদগেটের সোনারবাংলা ফিলিং স্টেশনে দেখা যায়, তেল নেওয়ার লাইন ইকবাল রোডের অলি-গলি ঘুরে অন্তত তিন কিলোমিটারে গিয়ে ঠেকেছে। মোটরসাইকেলের লাইনে হাজারখানেক মোটরসাইকেল দেখা যায়।
আর উল্টো পাশের তালুকদার পাম্পের লাইন যথারীতি লেকরোড ছাড়িয়ে মনিপুরী পাড়ার দিকে বাঁক নিয়েছে তখন।
ফেইসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে বাইকাররা বলছেন, ঢাকার কোনো পাম্পেই রোববার চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার নিচে তেল পাননি তারা।
সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে আগারগাঁও তালতলার হাসান ফিলিং স্টেশনের মুখে কথা হয় এক ব্যক্তির সঙ্গে। পিঠে ল্যাপটপের ব্যাগ, মুখে-মাথায় ঘাম আর ধুলোর আস্তর। চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এই মানবসম্পদ কর্মকর্তা নিজের নাম বলতে চাননি। তিনি বলছিলেন, ভোর ৫টার সময় এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। সারাদিন এই পাম্পে তেল দেওয়া হয়নি। কিছুক্ষণ আগে গাড়ি ঢোকার পর কেবলমাত্র শুরু হল।
তাহলে কি অফিস থেকে ছুটি নিয়েছেন? জবাবে ওই ব্যক্তি বলেন, “দুইদিন ছুটির পর অফিস কি আর ছুটি দেয়। এখানে বাইক রেখেই সকালে গিয়ে হাজিরা দিয়ে এসেছি। এরপর চায়ের দোকানে বসেই ল্যাপটপ খুলে দিনভর অফিস করেছি। এখন তেলটা পেলে এই সপ্তাহটা অন্তত ভালো কাটবে।”
সে সময় বাইকাররা সমস্বরে হইহই করে উঠলেন। পুলিশের বাঁশিতে ঘন ঘন ফুঁ পড়লো। জানা গেল, উল্টো পাশ দিয়ে কয়েকজন বাইক ঢোকানোর চেষ্টা করছেন। তাতে সকাল থেকে লাইনে অপেক্ষা করা বাইকাররা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
তাদের একজন নাফিস বললেন, “ভাই প্রতিটি পাম্পের আশপাশে কিছু সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এরা কখন তেল আসবে সেটা জেনে রাখে। আর পাম্পের লোকজনের সঙ্গে আঁতাত করে তেল ভরে বাইরে নিয়ে বিক্রি করে দেয়।
“ট্রাস্ট (পাম্প) এদিক দিয়ে ভালো, কিন্তু ওখানে ভিআইপিদের যন্ত্রণা মাত্রা ছাড়া। সাধারণ মানুষকে ওরা গোনায়ই ধরে না।”
হইহই শুনে ফুটপাতে এসে উঠেছিলেন পেছনের কয়েকজন বাইকার।
তাদের একজন জীবন বাবু বলছিলেন, “পাম্পে না পাইলেও আগারগাঁর বিজ্ঞান জাদুঘরের সামনে যান, বিএনপি বাজারে যান ঠিকই তেল পাইবেন। দাম নেবে ৩০০ টাকা লিটার। এরা এইখানে সিন্ডিকেট করে রাখছে। দেখেন গ্যাসের গাড়িগুলো (সিএনজি চালিত) তেলের লাইনে কী করে। অথচ ওরা প্রতিদিন এখানে আসে।”
তেলের লাইনে দেখা মিলল ১৯৮৯ মডেলের একটি টয়োটা করোলা (ডাবল ই নাইনটি) গাড়ির। গাড়ির চালক নিজের নাম বললেন না। তার দাবি, তিনি নিজেই মালিক।
এত পুরোনো গাড়িগুলো সাধারণত গ্যাস দিয়ে চলে। জবাবে ওই ব্যক্তি বলেন, “আমার গাড়িটা ‘ম্যানুয়াল গিয়ারের’, এইজন্যে শখ কইরা তেলে চালাই। সকালে একজনের একটা বাচ্চার স্কুল ‘ডিউটি’ কইরা দিই। তেল তো লাগে। এইজন্য সকাল ৬টায় আইসা লাইনে খাড়াইছি।”
বাইকারদের অভিযোগ শুনে আগারগাঁওয়ের বিজ্ঞান জাদুঘরের পশ্চিম পাশের ফটকে গিয়ে জানা গেল, এখানে একজন তেল বিক্রি করেন। তবে কয়েকদিন তাকে দেখা যাচ্ছে না, ফোনে যোগাযোগ করলে তেল পাওয়া যায়। কিন্তু যাদের সঙ্গে কথা হল, তারা সে ব্যক্তির ফোন নম্বরটা দিতে পারলেন না।
বিজ্ঞান জাদুঘরের উল্টো দিকে একটি ভাসমান গ্যারেজের এক কর্মী বলেন, “আগে থিকাই এইখানে সরকারি গাড়ির তেল নামায়। এখন তার হেব্বি ডিমান্ড। এইজন্যে তার দোকানই বন্ধ রাখছে।”
দোকান বলতে, তারা জানালেন একটি ড্রামের ওপর তেলের ক্যান রাখা থাকতো। আর পরিচিত গাড়ি চালকেরা এসে চটের ছালার আড়ালে গিয়ে তেল রেখে আসতো।

তেল নামানোর সরঞ্জামের বিজ্ঞাপন
গেল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র একযোগে হামলা চালায় ইরানে। তার প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা আছে, এমন দেশে হামলা শুরু করে ইরান।
একই সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এর সরু জলপথে নিয়ন্ত্রণ নেয় দেশটি। ফলে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশের কয়েকটি তেলের জাহাজও আটকা পড়ে।
দেশে তেল সরবরাহে চাপ বাড়লে সরকার রেশনিংসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ। তবে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদের ঘটনা দিন দিন বাড়তে থাকায় সারাদেশে অভিযান শুরু করে সরকার।
তেল সংকটের শুরু থেকেই পেট্রোল পাম্প মালিক ও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল মানুষের ‘প্যানিক বায়িং’ এর কারণে পাম্পগুলোতে তেলের বিক্রি বেড়েছে কয়েক গুণ। যার কারণে তেল আসার পরপরই শূন্য হয়ে যাচ্ছে পাম্পগুলো। একই সঙ্গে কালোবাজারে তেল বিক্রির অভিযোগও ঘুরছে বাজারে।
মনজুরুল ইসলাম নামে একজন মোটরসাইকেল চালক বলেন, “ভাই আমার স্কুটির ট্যাংকে ধরেই মোটে পাঁচ লিটার তেল। তেল খায়ও বেশি। যার কারণে লাইনে দাঁড়িয়ে আমার খুব একটা লাভ হয় না। মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধের দিকেই আড়াই থেকে তিনশ টাকা দরে তেল পাওয়া যায়। ক্যাম্প (জেনিভা ক্যাম্প) এলাকাতেও পাওয়া যায়।”
মনজুরুলের ধারণা, খোলাবাজারের তেল বিক্রেতারা গাড়ি চালকদের কাছ থেকেই তেল কেনেন একটু বেশি দামে।
পাম্পগুলোতে যখন এ অবস্থা, তখন অনলাইনে বেড়েছে গাড়ি থেকে তেল নামানো আর তেল সংরক্ষণের সরঞ্জামের বিজ্ঞাপন।
একটি অনলাইন শপের উদ্যোক্তা মোহাম্মদ সাদ বলছেন, “গাড়ির ট্যাংক থেকে তেল নামানোর পাইপ অনেকেই বিক্রি করছে। এখন যারা এই পণ্যটা বিক্রি করছেন, তারা গত মার্চেই অর্ডার করেছিলেন। তবে এগুলো এখন দেশেও নাকি তৈরি হচ্ছে।”

এই ব্যবসায়ী বলছেন, “মানুষ গাড়ি থেকে তেল নামিয়ে ঘরে তেল মজুদ করে রাখছে, এটা তো সেই রোজার মাস থেকেই চলছে। এটা জেনে বুঝেই ব্যাবসায়ীরা চায়না থেকে এসব প্রোডাক্ট অর্ডার করেছে।
“কারণ আমাদের মতো ব্যাবসায়ীদের চায়না থেকে একটা প্রোডাক্ট অর্ডারের পর আসতে ন্যূনতম ১৫ দিন লাগে। আর সংকট কেটে যাওয়ার পর মাল এলে তো বিক্রি হবে না। তাই এখন যে যত পারে ফেইসবুকে ডলার খরচ করে বিজ্ঞাপন দিয়ে যাচ্ছে।”
একটি বিজ্ঞাপনের স্ক্রিনে দেওয়া নম্বরে ফোন দিলে ওই অনলাইন শপ থেকে শাকিলা নামের একজন প্রতিনিধি বলেন, “এই পাইপগুলো পানি বা যে কোনো ধরনের তরল ড্রাম থেকে নামানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। সেজন্য অনেকে স্বল্প পরিমাণে কিনে বিক্রি করছিলেন। তবে এই তেল সংকটে এর চাহিদা হঠাৎ করে বেড়ে গেছে।”
শখের ঘর নামের একটি অনলাইন শপের বিজ্ঞাপনে বলা হচ্ছে, “জ্যামে দাঁড়িয়ে থেকে কষ্ট করবেন না, সহজে তেল ‘ট্রান্সফার’ করুন।”
অনেকগুলো অনলাইন শপের ভিডিওতে মোটরসাইকেলের ট্যাংক থেকে তেল নামানোর ভিডিও টিউটেরিয়ালও দেখানো হচ্ছে।
আবার সেই তেল সাধারণ প্লাস্টিক বোতলে সংরক্ষণ বিপজ্জনক হতে পারে, এ বার্তা দিয়ে বিশেষ জারিকেনও বিক্রি করছে কেউ কেউ।