Published : 29 Jan 2025, 11:06 PM
বিদেশগামী কোনো শিক্ষার্থীকে সনদপত্র সত্যায়নের জন্য প্রথমে বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটতে
হয়; এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিসত্যায়নের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসে তা চূড়ান্ত সত্যায়িত হয়।
এখানেই শেষ নয়, সত্যায়িত সেই সনদ ক্ষেত্রবিশেষে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস এবং তারপর ওই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সত্যায়ন করা লাগে।
এই কয়েক ধাপের সত্যায়ন প্রক্রিয়ার জন্য এখন আর এমন দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে না; বাঁচবে খরচ আর সময়। ‘মাইগভ’ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে সারা যাবে এই সত্যায়ন প্রক্রিয়া।
এপোস্টিল কনভেনশনে বাংলাদেশ যুক্ত হওয়ায় ওই কনভেনশনভুক্ত অন্তত ১১৭ দেশের ক্ষেত্রে এই সুবিধা পাবেন বিদেশগামী শিক্ষার্থী এবং প্রবাসীরা।
বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘সমন্বিত অনলাইন সত্যায়ন ব্যবস্থাপনা’র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। ২৯ মার্চের পর এই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত বাস্তবায়ন হবে।
এই কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, “আপনারা যে কাজটা করেছেন, এটা ছোট একটা পদক্ষেপ। এই ছোট একটা ক্ষেত্রে যদি কোনো ধরনের দুর্নীতি ছাড়া সুন্দরভাবে পার হয়ে আসলে সবার উপকার হবে।”
অনলাইন ব্যবস্থাপনার কারণে পাঁচ দিনের মধ্যে এই সত্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন অ্যাস্পায়ার টু ইনোভেইটের (এটুআই) প্রকল্প পরিচালক মামুনুর রশিদ ভূঁইয়া।
২০২৪ সালের ৩০ জুলাই এপোস্টিল কনভেনশনের পক্ষভুক্ত হয় বাংলাদেশ। এরপর এই কার্যক্রম ব্যবস্থাপনাকে সমন্বয়ের কাজ চলে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার ও কল্যাণ বিভাগের তত্ত্বাবধানে এই কাজের অগ্রভাগে ছিল এটুআই। তারা ওই সেবার অনলাইন ব্যবস্থাপনা তৈরি করেছে।
মামুনুর রশিদ ভূঁইয়া বলেন, সনদ সত্যায়নের এই কার্যক্রমে ইতোমধ্যে ৭৮টি দপ্তর ও সংস্থা এবং ১৬২টি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা বোর্ড যুক্ত হয়েছে।

এর মধ্যে ৪২টি ডকুমেন্টস সত্যায়নের সেবা যুক্ত করার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে আবেদন পড়েছে ৫৬ হাজার।
বিদেশ যাত্রার ক্ষেত্রে যত ধরনের কাগজপত্র সত্যায়ন করতে হয়, সবগুলো এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা জানান এটুআইয়ের প্রকল্প পরিচালক।
এপোস্টিল কনভেনশনের পক্ষভুক্ত ১২৭ দেশের মধ্যে ১০টি বাংলাদেশের সার্টিফিকেশনের ওপর আপত্তি দিয়েছে। এর বাইরে ১১৭টিতে বাংলাদেশের অনলাইন সত্যায়ন এখনই গ্রহণ করা হবে।
অঅপত্তি জানানো দেশগুলো হচ্ছে- জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, এস্তোনিয়া, গ্রিস, বেলজিয়াম ও সুইডেন।
ইউরোপের এই ১০টি দেশ প্রাথমিকভাবে আপত্তি দিলেও তাদের সঙ্গে ২৯ মার্চ পর্যন্ত আলোচনা ও দেনদরবারের সুযোগ আছে বলে জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার ও কল্যাণ অনুবিভাগের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ তানভীর মনসুর।
কাগজের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে এসব গুরুত্বপূর্ণ দেশে সমস্যা থেকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “এই যে, কাগজের বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে নতুন জিনিস হতে যাচ্ছে কিন্তু। আমাদের দেখতে হবে, যে দেশগুলো এটা গ্রহণ করছে না, তার ওখানে কিন্তু আমাদের সমস্যা প্রচুর রয়ে গেছে।
“সৌভাগ্যক্রমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো গ্রহণ করছে এবং তাতে করে আমাদের অনেক সুবিধা হয়ে যাবে।”
অনলাইনে সত্যায়ন যেভাবে
>> বিদেশ গমনেচ্ছু শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদেরকে ডকুমেন্টসমূহ সত্যায়নের জন্য www.mygov.bd পোর্টালে গিয়ে প্রথমে নিবন্ধন করতে হবে।
>> যে সনদ বা কাগজপত্র সত্যায়নের প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করতে হবে।
>> অনলাইনে পেমেন্ট ও আবেদন জমা দিতে হবে।
>> ডকুমেন্টটি ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষ যাচাইপূর্বক সত্যায়ন সম্পন্ন করে তা নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে।
>> ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষ যে মন্ত্রণালয়ের অধীন, সেই মন্ত্রণালয় অনলাইনে প্রতিসত্যায়ন করবে।

>> সবশেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এপোস্টিল কনভেনশনের নিয়ম মেনে ডকুমেন্টটিতে প্রতিসত্যায়ন করবে এবং সত্যায়নের সনদ হিসেবে অনলাইনে ই-এপোস্টিল সার্টিফিকেট দেবে।
>> পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক সত্যায়ন কার্যক্রম সম্পন্ন হলে সেবাপ্রার্থীর রেজিস্ট্রেশনকৃত মোবাইল নম্বরে নোটিফিকেশন যাবে।
>> সেবাপ্রার্থীরা মাইগভ পোর্টালের ব্যক্তিগত ড্যাশবোর্ডের ‘ডাউনলোড’ বাটনে ক্লিক করে ই-এপোস্টিল সার্টিফিকেট ডাউনলোড করে নিতে পারবেন।
এপোস্টিল কি এবং কেন?
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এপোস্টিল হলো একটি সার্টিফিকেট, যা এপোস্টিল কনভেনশন-১৯৬১ এর নিয়ম মেনে কোনো পাবলিক ডকুমেন্টের সত্যায়নের সনদ হিসেবে দেওয়া হয় এবং এটি সেই ডকুমেন্টের উৎপত্তির সঠিকতা প্রত্যয়ন করে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, বিদেশগামী ও বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিভিন্ন প্রয়োজনে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ ও বিভিন্ন ধরনের নথি বর্তমান প্রচলিত পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়ে সত্যায়ন করতে হয়।
এরপর ঢাকায় অবস্থিত বিদেশি দূতাবাস, বিদেশ যাওয়ার পর সে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সত্যায়ন করতে হয়।
তাছাড়া যেসব দেশের দূতাবাস ঢাকায় নেই সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য নিয়োজিত প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা দূতাবাসে যেতে হয়।
এই প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করতে নাগরিকদের অনেক সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করতে হয়। নাগরিকদের এই সমস্যা নিরসনে বাংলাদেশ এপোস্টিল কনভেনশন-১৯৬১ এ পক্ষভুক্ত হয়েছে।

এর ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় নথিপত্র সত্যায়নের সনদ হিসেবে এপোস্টিল সার্টিফিকেট দেবে এবং এপোস্টিল সার্টিফিকেট ব্যবহার করলে সেবাপ্রার্থীদেরকে সময় ও অর্থ ব্যয় করে ঢাকার বিদেশি দূতাবাস এবং বিদেশে যাওয়ার পর অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আর সত্যায়ন করতে হবে না।
এছাড়া এপোস্টিল সার্টিফিকেটে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করে বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে নথিপত্রের উৎপত্তির সঠিকতা যাচাই করা যাবে।
বিদেশি দূতাবাগুলোতে প্রতি পাতা নথি সত্যায়ন করতে তিন হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত সার্ভিস ফি দিতে হয় জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, “এপোস্টিল প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন হলে বিদেশি দূতাবাসে সার্ভিস ফি দিয়ে ডকুমেন্ট সত্যায়ন করতে হবে না। এতে বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রতিবছর প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।
“এপোস্টিল প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন হলে সকল প্রকার দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগী সম্পূর্ণরূপে দূর হয়ে যাবে এবং জাল বা নকল সিল ও স্বাক্ষরের মাধ্যমে সত্যায়ন করার প্রবণতাও দূরীভূত হবে।”
শুধু শিক্ষা সনদই নয়, জন্ম ও মৃত্যু সনদ, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, বিবাহিত-অবিবাহিত সনদপত্র, বীমা ও বাণিজ্যিক সনদপত্র, ব্যাংক বিবরণী/সনদপত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স, মেডিকেল সনদ, চারিত্রিক সনদপত্র, জনশক্তি সম্পর্কিত সংস্থার নথিপত্র, পারিবারিক সনদ, অভিভাবকত্ব সনদ, বিবাহ সনদ বা নিকাহ নামাসহ বিদেশগামীদের সব ধরনের সত্যায়ন আসছে এই প্রক্রিয়ার মধ্যে।