Published : 27 Jun 2026, 10:53 AM
রাজধানীর বেইলি রোডের পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে পাহাড়ি ফল মেলা শুরু হয়েছে।
‘পাহাড়ি ফলের ঘ্রাণ, বৈচিত্র্যময় প্রাণ’-প্রতিপাদ্যে তিন দিনব্যাপী এই মেলার সূচনা হয়েছে শনিবার থেকে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত মেলাটি চলবে সোমবার পর্যন্ত।
সকাল ১০টায় মেলার উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি ভূমি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।
প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য মেলা উন্মুক্ত থাকবে বলে জানিয়েছে আয়োজক কর্তৃপক্ষ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত পার্বত্য অঞ্চলে’ কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি’।
“সরকার শুধু এই তিনটি পার্বত্য অঞ্চলের জন্য প্রতিবছর প্রায় ৫৩০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ করেছে। সেই হিসাবে ১০ বছরে ৫ হাজার ৩০০ কোটি এবং ২০ বছরে প্রায় ১০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে।

হেলাল উদ্দিন বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার আগে এবং বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগের দলীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে কাজ করার সুবাদে তিনি প্রতিটি জেলায় বহুবার গিয়েছেন, সেখানে রাত্রিযাপন করেছেন এবং পায়ে হেঁটেও বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেছেন।
উন্নয়ন না হওয়ার মূল কারণ তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে তিন পার্বত্য জেলায় ১,০৭৪টি প্রকল্প (স্কিম) রয়েছে। এক বছরে এতগুলো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
উদাহরণ দিয়ে হেলাল উদ্দিন বলেন, কম্বল কেনার জন্য ৫ কোটি টাকার অনুদান জেলা পরিষদ থেকে একসঙ্গে উত্তোলন করে নেওয়া হচ্ছে। আবার অনেক সময় দেখা গেছে, কোনো কোনো উপদেষ্টা জেলা পরিষদকে বাদ দিয়েই সবকিছু বিতরণ করে ফেলেছেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “কোনো দুর্নীতি, অনিয়ম ও অবহেলা পার্বত্য চট্টগ্রামে আর করতে দেওয়া হবে না। এই অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দিয়ে পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সব বাংলাদেশির জীবনমান ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে যে বাজেটগুলো পাওয়া যায়, সেগুলো এমন কিছু খাতে ব্যয় হয়, যা টেকসই জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে না।
স্বাস্থ্যসেবা প্রসঙ্গে হেলাল উদ্দিনের ভাষ্য, গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিটি উপজেলায় নারীদের জন্য একটি করে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র প্রয়োজন।
শিক্ষা খাত নিয়ে বলেন, দুর্গম এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে যাতায়াতের সমস্যা রয়েছে। তাই নামসর্বস্ব প্রকল্পের পরিবর্তে সেখানে মাল্টিপারপাস ডরমিটরি নির্মাণ করা হবে।
তিনি বলেন, একই সঙ্গে স্টারলিংকের মাধ্যমে স্কুলগুলোতে ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা সেন্ট্রাল এডুকেশন সিস্টেমের সার্ভার থেকে পাঠ্যসূচি ডাউনলোড করে বিশ্বমানের শিক্ষা লাভ করতে পারে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ থাকার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী হেলাল উদ্দিন বলেন, বিগত ১৯ বছর ধরে মামলার কারণে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ রয়েছে।
“এ বিষয়ে ইতোমধ্যে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনি জটিলতা নিরসন করে শিক্ষক নিয়োগের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
সুপেয় পানির সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “পার্বত্য অঞ্চলে সুপেয় পানির অভাব দূর করতে অন্যান্য প্রকল্পকে কম অগ্রাধিকার দিয়ে সারফেস ওয়াটার বা ওয়াটারশেড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রতিটি এলাকায় সুপেয় পানির ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করা হয়েছে।”
পাহাড়ি ফলমেলার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটি শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়; পার্বত্য অঞ্চলের ফসল, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার একটি মাধ্যম।
পাহাড়ের কৃষিজাত পণ্য সংরক্ষণের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি উপজেলায় পরিবেশবান্ধব ‘ইকো-ফ্রেন্ডলি মিনি কোল্ড স্টোরেজ’ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
“এ বিষয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে কৃষিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। সরকারি বার্ষিক তহবিল থেকে ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে এগুলো নির্মাণ করা সম্ভব। এসব কোল্ড স্টোরেজ ২০ থেকে ২৫ জন প্রান্তিক কৃষকের সমন্বয়ে গঠিত একটি সমবায় বা কো-অপারেটিভের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাঙ্গামাটিতে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট নিয়ে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে। এর মাধ্যমে বায়ার ও সেলারদের যুক্ত করে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হবে।
তিনি বলেন, থাইল্যান্ডের বা এধরনের দেশের মতো উদ্বৃত্ত ফলকে ড্রাই ফ্রুটস বা শুষ্ক ফলে প্রক্রিয়াজাত করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিপণনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পার্বত্য অঞ্চলে কফি চাষের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ অঞ্চলের কফির গুণগত মান অত্যন্ত ভালো। ঢাকার জনপ্রিয় বিভিন্ন কফিশপে এখন হিলট্র্যাক্স কফি বিক্রি করছে। কফি চাষ সম্প্রসারণে আরও প্রণোদনা দেওয়া হবে।
জুম চাষ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুম চাষকে আরও বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক করতে জুমচাষীদের বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
ক্রীড়া খাত নিয়ে প্রতিমন্ত্রীর কথায়, “প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান ফুটবলার ঋতুপর্ণাকে বাড়ি কেনার জন্য আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন।
“আমরা যখন বিরোধী দলে ছিলাম, তখনও আমি, দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ এবং আতিকুর রহমান রুমনসন স্থানীয় নেতারা অত্যন্ত দুর্গম পথ ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া উপেক্ষা করে ঋতুপর্ণার বাড়িতে গিয়েছিলাম। তারেক রহমানের পক্ষ থেকে তাঁর মায়ের চিকিৎসার জন্য আর্থিক অনুদানও পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।”
প্রতিমন্ত্রী ঘোষণা দেন, এই অঞ্চলে ক্রীড়ার বিকাশে রাঙ্গামাটিতে একটি বিকেএসপি প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকসহ দ্রুত জায়গা নির্বাচন করে এর কাজ শুরু করা হবে।

তিনি বলেন, এ ছাড়া তিন পার্বত্য জেলা শহরে প্রাথমিকভাবে ছয়টি মাল্টিপারপাস স্পোর্টস কমপ্লেক্স এবং পরবর্তীতে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে স্পোর্টস কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করা হবে।
সংস্কৃতি ও তথ্য খাত নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাজেট অধিবেশন শেষ হলেই রাঙ্গামাটিতে একটি তথ্যকেন্দ্র উদ্বোধন করা হবে। পার্বত্য অঞ্চলের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরতে তিন জেলায় তিনটি কালচারাল সেন্টার স্থাপন করা হবে।
হস্তশিল্পের বাজার সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে কালচারাল ফেয়ার আয়োজন করে বিদেশি ডেভেলপমেন্ট পার্টনারদের আমন্ত্রণ জানানো হবে। বিশ্বব্যাপী মার্কেটিংয়ের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া হবে।
ইকোট্যুরিজম প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রকৃতির ভারসাম্য এবং স্থানীয় রীতিনীতি, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি অক্ষুণ্ন রেখে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে ইকোট্যুরিজম উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে পার্বত্যবাসীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে।
আর্থিক স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার বিষয়ে তিনি বলেন, জেলা পরিষদের অনুদান বিতরণে আইবাস সিস্টেমের মতো ব্যবস্থা চালু করা হবে, যাতে যার নামে বরাদ্দ থাকবে, কেবল তিনিই সেই টাকা উত্তোলন করতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, শীতবস্ত্র বা চাল বিতরণ কর্মসূচিগুলো সরাসরি প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। মাস্টার রোলের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, মোবাইল নম্বর এবং টিপসই নিয়ে বিতরণ করা হবে।
এই আয়োজনে বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, বান্দরবান পার্বত্য জেলার সংসদ সদস্য সাচিং প্রু এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাধবী মার্মা।