Published : 07 Apr 2026, 04:05 PM
বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস লন্ডনে গিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জুলাই-অগাস্ট আন্দোলনের ‘ট্রফি’ দিয়ে নির্বাচনের তারিখ নিয়ে আসেন বলে দাবি করেছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এও দাবি করেন, ১৯৭১, ১৯৯০ এবং জুলাই-অগাস্ট এই তিনটি আন্দোলনের ‘ট্রফি’ বিএনপির ঘরে আছে।
সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে বিএনপির সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের টানপড়েনের মধ্যে গেল বছর ১৩ জুন লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও বিএনপির তখনকার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বৈঠক করেন।
সেই বৈঠকের পর যৌথ ঘোষণা আসে। বলা হয়, সংস্কার ও বিচারের বিষয়ে পর্যাপ্ত অগ্রগতি হলে ফেব্রুয়ারিতে রোজা শুরুর আগেও ভোট হতে পারে।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এর আগে এপ্রিলের প্রথমার্ধের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলেছিলেন।
শেষ পর্যন্ত রোজা শুরুর আগে ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়, তাতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি।
সংসদের আলোচনায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, “একটি দল বিএনপি, যাদের ঘরে ১৯৭১, ১৯৯০, জুলাই-অগাস্ট তিনটি ট্রফি আমাদের ঘরে রয়েছে।”
তার ভাষায়, “আওয়ামী লীগ ৭১ ও ৯০ এর কথা বলতে পারবে, কিন্তু জুলাই-অগাস্ট তাদের ঘরে নাই; আর বিরোধী দলের সদস্যরা জুলাই-অগাস্ট বলতে পারলেও ৭১ ও ৯০ বলতে পারবেন না।”
এ সময় বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে হৈচৈ শুরু হলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “বক্তাকে বক্তব্যে কোনো বাধা দেবেন না। আপনাদের যখন সময় আসবে, আপনারা আপনাদের বক্তব্যের মধ্যে বলবেন।”
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটে।
এই আন্দোলনের একক কৃতিত্ব দাবি করা নিয়ে নানা বিতর্ক সামনে এসেছে।
মীর শাহে আলম বলেন, “জুলাই-অগাস্টের আন্দোলন ছাত্র-জনতার সঙ্গে আমরা সবাই ছিলাম। ট্রফি আমরা কারও কাছে নিতে যাইনি। ক্যাপ্টেন কে, এটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. ইউনূস চেনেন। এই কারণে উনি লন্ডনে গিয়ে আমাদের ক্যাপ্টেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ট্রফি দিয়ে নির্বাচনের তারিখ নিয়ে আসছেন।”
তিনি বলেন, “ক্যাপ্টেন একজনই থাকে। সে ক্যাপ্টেনের কাছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান লন্ডনে গিয়ে আলোচনা করে নির্বাচনের তারিখ নিয়ে আসছেন বলেই এ দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে।”
রাষ্ট্রপতির ভাষণের আলোচনায় মীর শাহে আলম বলেন, বর্তমান সংসদ ‘একটি অনন্য বৈশিষ্ট্যের সংসদ’ এবং এখানে ২১৯ জন নতুন সদস্য রয়েছেন। তিনি নিজেকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এবং বিরোধীদলীয় নেতাকেও প্রথমবারের মতো নির্বাচিত সদস্য হিসেবে বর্ণনা করেন।
বগুড়া-২ আসনের এই সংসদ সদস্য নিজের এলাকার উন্নয়ন প্রসঙ্গও তোলেন। তিনি বলেন, বগুড়া ১৯ বছর ‘উন্নয়নবঞ্চিত’ ছিল। বিমানবন্দর, সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া পর্যন্ত রেল সংযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সড়ক অবকাঠামোসহ বিভিন্ন প্রকল্পে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
স্পিকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনি ১৯৭১ সালকে রিপ্রেজেন্ট করছেন।”
এ সময় সরকারি দলের বেঞ্চে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন তুলে ধরেন কয়েকজনের নাম বলার পাশাপাশি তিনি বলেন, বিরোধী দলের বেঞ্চে সে ধরনের উপস্থিতি নেই।
সঙ্গে সঙ্গে স্পিকার তাকে থামিয়ে বলেন, “বিরোধী দলের বেঞ্চেও মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। আমি নিজেই রণাঙ্গনে দেখেছি। গাজী নজরুল ইসলাম সাতক্ষীরা, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা।”
বিরোধী দলের উদ্দেশে মীর শাহে আলম বলেন, “আমরাও আন্দোলন করেছি, আপনারাও আন্দোলন করেছেন। কিন্তু মাঝপথ থেকে আপনারা আমাদের কাছ থেকে চলে গিয়েছিলেন ২০১৪ সালের পরে।”
তার ভাষায়, দীর্ঘদিন চারদলীয় জোট ও ২০ দলীয় জোটে একসঙ্গে আন্দোলন করলেও ‘কোন এক অজানা কারণে’ তারা সরে যান এবং পরে জুলাই-অগাস্ট আন্দোলনকে এমনভাবে ধারণ করতে চান, “মনে হয় ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধই হয়নি, ৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনই হয়নি।”
তিনি সরকারের কাজে বিরোধী দলের সহযোগিতাও চান।
মীর শাহে আলম বলেন, “আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে আগামী পাঁচ বছরে এই দেশকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে যেতে চাই, যাতে মানুষ মনে করে যে একসময়কার জোটবদ্ধ বিএনপি-জামায়াত যদিও আজকে আলাদা আলাদা, কিন্তু তারা আবার ভেতরে ভেতরে এক হয়ে দেশটিকে একটি ভালো জায়গায়, সুন্দর জায়গায় নিয়ে গিয়েছে।”
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য শেষে ফ্লোর নেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, “আমরা প্রথম দিনই অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছি, এই বিরোধী দল কোনো গতানুগতিক বিরোধী দল হবে না। ন্যায্যসঙ্গত সকল কাজে সমর্থন-সহযোগিতা, অন্যায় এবং জনগণের অধিকার হরণকারী সকল পদক্ষেপে আমাদের কণ্ঠ থাকবে আপসহীন।”
মীর শাহে আলমের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আজকে মাননীয় সংসদ সদস্য প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানাইতে গিয়ে আমাদেরকে একবারে জেরবার করে ফেলেছেন।”
শফিকুর রহমানের ভাষায়, “অসংখ্য অসত্য তথ্য এখানে এসেছে। দুই-একটার প্রতিবাদ আপনি নিজেও করেছেন। আমি অনুরোধ করব, অসত্য কোনো তথ্য যেন এই মহান সংসদে কেউ পরিবেশন না করেন।”
তিনি বিভ্রান্তিকর তথ্য সংসদ কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানান।
জবাবে স্পিকার বলেন, “আমি বক্তব্য পরীক্ষা করে দেখব। সেখানে কোনো অসংসদীয় বা অসত্য তথ্য থাকলে সেটা এক্সপাঞ্জ করা হবে।”
জকিগঞ্জকে প্রথম ও কানাইঘাটকে দ্বিতীয় মুক্তাঞ্চলের স্বীকৃতি দাবি
জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় সিলেট-৫ আসনের খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবুল হাসান জকিগঞ্জকে প্রথম এবং কানাইঘাটকে দ্বিতীয় মুক্তাঞ্চল হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর জকিগঞ্জ এবং ২২ নভেম্বর কানাইঘাট হানাদারমুক্ত হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত জকিগঞ্জকে প্রথম মুক্তাঞ্চল এবং কানাইঘাটকে দ্বিতীয় মুক্তাঞ্চল হিসেবে সরকারিভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
“অনতিবিলম্বে জকিগঞ্জকে প্রথম মুক্তাঞ্চল এবং কানাইঘাটকে দ্বিতীয় মুক্তাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হোক।”
তার বক্তব্যের সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ নিজের যুদ্ধস্মৃতির কথা তুলে ধরে বলেন, তিনি ‘জেড ফোর্সের’ একজন তরুণ সেনা অধিনায়ক হিসেবে ওই এলাকার চারগ্রাম ও আটগ্রাম দখলের অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। এরপর আবুল হাসানের জন্য আরও তিন মিনিট সময় বাড়িয়ে দেন স্পিকার।
বক্তব্যে খেলাফত মজলিসের এই সদস্য তার নির্বাচনি এলাকা জকিগঞ্জ ও কানাইঘাটের সড়ক, নদীভাঙন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার নানা সংকটও তুলে ধরেন।
আবুল হাসানের বক্তব্য শেষে স্পিকার স্বাস্থ্য ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রীকে উদ্দেশ করে জকিগঞ্জ-কানাইঘাটের উন্নয়নে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানান।