Published : 13 Jan 2026, 12:41 AM
অমোচনীয় কালির কলম, মার্কিং সিল, স্ট্যাম্প প্যাড, গালা থেকে শুরু করে চার্জার লাইট, ক্যালকুলেটর কত কি না লাগে ভোটগ্রহণের আয়োজনে। সেসব কীভাবে নির্বাচনি কর্মকর্তাদের হাতে পৌঁছায় তা নিয়ে অনেকের মনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খায়।
সবচে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, ভোট আয়োজনের মূল অনুষজ্ঞ ব্যালট পেপার এবার যাবে কখন?
সংসদ নির্বাচনে ভোটের আগের দিন নির্বাচনি সামগ্রী পাঠানোর রেওয়াজ ছিল দীর্ঘদিন ধরে। তবে ২০১৮ সালে ভোট আগের রাতে হয়ে যাওয়ার অভিযোগের মধ্যে বিরোধীদের ভাষায় সে নির্বাচনের নাম হয় ‘নিশি রাতের নির্বাচন’। সেই বিতর্ক এড়াতে ২০২৪ সালে ভোটের সকালে ব্যালট পেপার পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে দুর্গম এলাকা ছাড়া দেশের বেশিরভাগ কেন্দ্রে ব্যালট পেপার পাঠানো হয় ভোটের দিন ভোর ৬টার মধ্যে; আর আগের দিন ব্যালট বাক্সসহ নির্বাচনি সামগ্রী পৌঁছায় তৎকালীন নির্বাচন কমিশন।

বর্তমান নাসির কমিশনও কি সেই পথে হাঁটবে?
এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে সোমবার নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “গণভোটের ব্যালট পেপার মুদ্রণ করে ধাপে ধাপে জেলা পর্যায় পাঠানো শুরু হচ্ছে। নির্বাচন সামগ্রী জেলা প্রশাসকের ট্রেজারি শাখায় নিরাপত্তাসহ সংরক্ষণে থাকবে। পরে প্রতীক বরাদ্দের পর ধাপে ধাপে সংসদের ব্যালট পেপার ছাপানো হবে এবং ভোটের আগে পাঠানো হবে। ভোটের আগের দিন কেন্দ্রে কেন্দ্রে যাবে।”
তিনি বলেন, গণভোটের ব্যালট পেপার ছাপানো শেষ করে প্রেসে স্থান সংকুলানের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। রিটার্নিং অফিসারের তত্ত্বাবধানে নিরাপত্তাসহ সব সামগ্রী সংরক্ষণে রাখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সম্প্রতি বলেছেন, ভোটের কয়েক দিন আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হলেও ব্যালট বাক্সসহ নির্বাচনি সরঞ্জাম পাঠানো হবে ভোটের আগের রাতে।
তিনি বলেন, “নির্বাচন সামগ্রীর ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, নির্বাচনি সামগ্রী আগের মতো আগের রাতেই সব কেন্দ্রে পৌঁছে যাবে ব্যালট পেপারসহ।”
কে এম নূরুল হুদা কমিশনের ‘নিশি রাতের নির্বাচন’র কালিমা মুছতে হাবিবুল আউয়াল কমিশন ভোটের দিন ব্যালট পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
এখন আবার আগের রীতিতে যাওয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, “আমরা কনফিডেন্ট। আমরা আর ওইসব ঘটনার অবতারণা দেখব না। আমরা আমাদের কনফিডেন্সের জায়গাটাতে ফেরত যেতে চাই।
“আমাদের সব সিস্টেম যাতে স্বাভাবিকভাবে কাজ করে, সেখানে যেতে হবে। আমাদের যথাযথ সুপারভিশন থাকবে এবং আমরা নজর রাখব—যাতে করে কোনো ধরনের ব্যত্যয় না ঘটে।”
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পর ধাপে ধাপে আসনভিত্তিক সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীর নাম ও প্রতীকসহ ব্যালট পেপার মুদ্রণ করা হবে বলে ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। দুই নির্বাচন একসঙ্গে হওয়ায় এবার ভোট নেওয়ার সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে; সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে ভোটগ্রহণ চলবে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত।
দুই ভোটের জন্য পৌনে ১৩ কোটি ভোটারের জন্য লাগবে দ্বিগুণ ব্যালট পেপার। এবার প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রে ২ লাখ ৪৫ হাজারেরও বেশি ভোটকক্ষ থাকবে। ভোটকক্ষে সিল দিতে থাকবে মার্কিং প্লেস। এছাড়া পোস্টাল ব্যালটও থাকছে।
কী কী লাগে ভোটে
ইসি কর্মকর্তারা জানান, সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণের জন্য প্রতিটি কেন্দ্রে ১৭ ধরনের সামগ্রী পাঠানো হয়ে থাকে। কলম, সুই, সুতা, দিয়াশলাইসহ ১২ ধরনের সামগ্রী স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করেন কর্মকর্তারা। এর বাইরে বেশ কিছু ধরনের ফরম ও প্যাকেট প্রয়োজন হয় নির্বাচনি কর্মকর্তাদের।
ইসির তালিকা অনুযায়ী ১৭ সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে—স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ও ঢাকনা; ছবিসহ ভোটার তালিকা; ভোটারের সমান সংসদ নির্বাচনের ব্যালট পেপার; গণভোটের ব্যালট পেপার; অমোচনীয় কালির কলম; রাবারের সিলমোহর (অফিসিয়াল সিল); মার্কিং সিল; স্ট্যাম্প প্যাড; গালা; পিতলের সিলমোহর; চার্জার লাইট; ক্যালকুলেটর; স্ট্যাপলার পিন; চটের বড় থলি; চটের ছোট থলি এবং স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের সিল (লক)।

সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন প্রকারের ফরম, প্যাকেট, ম্যানুয়েল, নির্দেশিকা, পোস্টার, লিফলেটসহ যাবতীয় মুদ্রণ সামগ্রী ঢাকার তেজগাঁওয়ে বিজি প্রেস ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস থেকে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী গ্রহণ করতে হবে।
সব নির্বাচনি সামগ্রী জেলায় পৌঁছানোর পর ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কোনো সামগ্রী ঘাটতি বা অতিরিক্ত পাওয়া গেলে বা অন্য কোন অসংগতি দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে ইসি সচিবালয়কে জানাতে হবে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাকে।
ব্যালট পেপার সরবরাহ
প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় রয়েছে আগামী ২০ জানুয়ারি। এরপর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ হবে। এরপরই পোস্টাল ব্যালটের ভোটার বাদে বাকিদের জন্য ব্যালট পেপার মুদ্রণ করা হবে।
নির্বাচন কমিশনের সূচি অনুযায়ী, রিটার্নিং কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট জেলা নির্বাচন অফিসের প্রথম শ্রেণির একজন কর্মকর্তা এবং রিটার্নিং অফিসারের একজন প্রতিনিধিকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাসহ ঢাকায় পাঠাবেন। ব্যালট পেপার গ্রহণকারী কর্মকর্তাকে অবশ্যই রিটার্নিং কর্মকর্তাকে দেওয়া ‘লিখিত ক্ষমতাপত্র’ সঙ্গে রাখতে হবে।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ সোমবার বলেন, “গণভোটের ব্যালট পেপার মুদ্রণ করে ধাপে ধাপে জেলা পর্যায় পাঠানো শুরু হচ্ছে। নির্বাচন সামগ্রী জেলা প্রশাসকের ট্রেজারি শাখায় নিরাপত্তাসহ সংরক্ষণে থাকবে। পরে প্রতীক বরাদ্দের পর ধাপে ধাপে সংসদের ব্যালট পেপার ছাপানো হবে এবং ভোটের আগে পাঠানো হবে। ভোটের আগের দিন কেন্দ্রে কেন্দ্রে যাবে।”
তিনি বলেন, গণভোটের ব্যালট পেপার ছাপানো শেষ করে প্রেসে স্থান সংকুলানের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। রিটার্নিং কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে নিরাপত্তাসহ সব সামগ্রী সংরক্ষণে রাখা হচ্ছে।
প্রেসে যাচাই ও ত্রুটি সংশোধন
প্রেস থেকে ব্যালট পেপার গ্রহণের সময় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নাম, প্রতীক ও ভোটার সংখ্যার সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করে নিতে হবে। এজন্য প্রতিটি নির্বাচনি এলাকার প্রার্থীদের নাম ও প্রতীকের তালিকা (ফরম-৫) সঙ্গে রাখতে বলা হয়েছে। কোনো ত্রুটি ধরা পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছে ইসি।
ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনি মালামাল নিরাপদে সংরক্ষণ এবং ব্যালট পেপার, মার্কিং সিল ও অফিসিয়াল সিলের গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে।

পরিবহন ও সংরক্ষণে কঠোর নিরাপত্তা
নির্ধারিত সময়ে সরকারি মুদ্রণালয় থেকে জেলা, উপজেলা হয়ে ভোটকেন্দ্র পর্যন্ত ব্যালট পেপার ও নির্বাচনি সামগ্রী পরিবহনে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে পুলিশ সুপারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছে ইসি।
ভোটগ্রহণের আগের দিন রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ব্যালট পেপার ও নির্বাচনি সামগ্রী বিতরণ করবেন। নির্ধারিত সময়ে প্রিজাইডিং কর্মকর্তারা ব্যালট পেপার ও নির্বাচনি মালামাল গ্রহণ করবেন। ওই দিনই নিরাপত্তার সঙ্গে সব ভোটকেন্দ্রে ব্যালট পেপার পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নিতে বলা হয়েছে। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ও নির্বাচনি সামগ্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
মনিহারী সামগ্রী স্থানীয়ভাবে কেনা
সুষ্ঠুভাবে ভোটের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বল পয়েন্ট কলম, সাদা কাগজ, কার্বন কাগজ, ছুরি, সুই, সুতা, মোমবাতি, গামপট, দিয়াশলাই, গ্লু, স্ট্যাম্প প্যাডের কালি এবং মুড়িপত্র থেকে ব্যালটের কাগজ আলাদা করতে লোহা বা প্লাস্টিকের পাত স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে।
কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে সব সামগ্রী গ্রহণ ও বিতরণের প্রযোজনীয় নির্দেশনা দিয়ে বৃহস্পতিবার পরিপত্র জারি করেছে নির্বাচন কমিশন।