Published : 14 Mar 2026, 11:50 PM
বইমেলার সূচি রোজার মধ্যে পড়ায় শুরু থেকেই লোকসমাগম ও বিক্রি নিয়ে যে হা-হুতাশ করে আসছিলেন প্রকাশকরা, মেলার শেষবেলায় সেই আশঙ্কাই সত্য হওয়ার কথা বলছেন তারা।
প্রকাশনীগুলো বলছে, মেলার শেষ বেলায় বিক্রি কিছুটা বাড়লেও সামগ্রিকভাবে তারা সন্তুষ্ট নয়। বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন বলেছেন, তাদের স্টলে বিক্রি এবার সন্তোষজনক হয়নি।
এবার নতুন বই প্রকাশের সংখ্যাও নেমে এসেছে অর্ধেকে।
শনিবার মেলায় আসা ধানমণ্ডির বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক ফেরদৌস আমিন বলেন, “এবার মেলায় বই কম এসেছে। আমাদের দেশে পেশাদার প্রকাশনা সংস্থা কয়টা আছে? তবে মেলায় এত প্রতিষ্ঠান কোথা থেকে আসে? যারা সারা বছর বই প্রকাশ করে, মেলা শুধু তাদের নিয়েই হওয়া উচিত।”
অন্তত ১০টি প্রকাশনা সংস্থার স্টলের বিক্রয়কর্মীরা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মেলায় তাদের কোনো নতুন বই নেই।
অন্য বছর মেলা ফেব্রুয়ারি মাসের পুরোটা সময় মেলা হলেও রোজা ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে এবার শুরু হয়েছে ২৬ ফেব্রুয়ারি। মেলা হচ্ছে ১৮ দিনের।
বাতিঘরের সহকারী ম্যানেজার সঞ্জয় সূত্রধর বলেন, “গত বছরে পুরো মাসব্যাপী বইমেলা ছিল। কিন্তু এবারে ১৮ দিনের বইমেলা। এবার মেলায় জনসমাগম কম। তবে যারা এসেছেন, তাদের অনেকে বই কিনেছেন। এটা একটা ভালো দিক।

“আর দিনের বেলায় যদিও বা মানুষ কম থাকে। কিন্তু ইফতারের পরে মানুষের সমাগম বাড়ে। তুলনামূলকভাবে যদি বলা হয়, এবারে বিক্রিটা কম হয়েছে।”
অন্যপ্রকাশের স্টলের বিক্রয়কর্মী সাফায়েত হোসেন বলেন, “গত বছরের তুলনায় বেচাকেনা স্বাভাবিকভাবেই কম। কেননা এবার মেলা সংক্ষিপ্ত পরিসরে হচ্ছে। তার ওপর রোজার মধ্যে অনেকে রোজা রেখে আসতে পারেন না। ঈদেরও খুব বেশি বাকি নেই। অনেকে বাড়িতে চলে যাচ্ছেন।”
সাত বছর ধরে মেলায় স্টলের দায়িত্বে থাকার কথা জানিয়ে সাফায়েত বলেন, “শুক্রবার বা ছুটির দিনে আমাদের স্টলে কমপক্ষে ১৫ লাখ টাকার বই বিক্রি হত৷ এবার সেটা এক লাখও হয়নি।”
নতুন বই
এবার ১৮ দিনের মেলায় ১৭তম দিন শনিবার পর্যন্ত রচনাবলি ও গণঅভ্যুত্থান বিষয়ক কোনো নতুন বই প্রকাশের তথ্য মেলার জনসংযোগ বিভাগে নেই।
তবে মেলার মাঠে ঘুরে গণঅভ্যুত্থান বিষয়ক ছয়টি নতুন বইয়ের খোঁজ পেয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। এই বইগুলোর তথ্য জমা পড়েনি মেলার জনসংযোগ বিভাগে।
গত বছর মেলায় নতুন বই এসেছিল ৩ হাজার ২৯৩টি। এর আগের বছর ২০২৪ সালে মেলায় নতুন বই এসেছিল ৩ হাজার ৭৫১টি। ২০২৩ সালে ৩ হাজার ৭৩০টি নতুন বই এসেছিল।
এবারের মেলা শেষ হওয়ার এক দিন আগে, অর্থাৎ শনিবার পর্যন্ত নতুন বই এসেছে ১ হাজার ৭৭১টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বই এসেছে কবিতার ৬৫৬টি।
এ ছাড়া উপন্যাস এসেছে ২৫৯টি, গল্পগ্রন্থ এসেছে ২৪৬টি। প্রবন্ধ ৭৬টি, গবেষনা ৪২টি, ছড়া ৩১টি, শিশুতোষ ৭৮টি, জীবনীগ্রন্থ ৪৮টি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ৬টি, নাটক বিষয়ক ৭টি, বিজ্ঞান ২৩টি, ভ্রমণ ৩৭টি, ইতিহাস ২৪টি, রাজনীতি ২১টি, চিকিৎসা/স্বাস্থ্য ১৪টি, ভাষা বিষয়ক ২টি, ধর্মীয় ২৭টি, অনুবাদ ১৬টি, অভিধান ১টি, সায়েন্স ফিকশন/গোয়েন্দা ১টি এবং অন্যান্য ক্যাটাগরিতে নতুন বই এসেছে ১৫৬টি।
বই বিক্রি কমেছে ৮০ ভাগ: প্রকাশক ঐক্য
‘প্রায় পাঠকশূন্য’ এবারের একুশে বইমেলায় অংশ নিয়ে প্রকাশকরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন বলে দাবি করেছে ‘প্রকাশক ঐক্য’।
শনিবার বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি বলেছে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২৫ সালের বইমেলায় বিক্রি কমেছিল ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ। কিন্তু এবারের বইমেলার পরিস্থিতি ২০২১ সালের কোভিডকালীন মেলার চেয়েও ‘শোচনীয়’।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, অংশগ্রহণকারী ‘প্রায় ৯০ শতাংশ’ প্রকাশকের স্টল নির্মাণের ‘প্রাথমিক খরচটুকুও ওঠেনি’, যার মধ্যে ‘প্রায় ৩০ শতাংশ’ প্রকাশকের ‘৫ হাজার টাকার বইও বিক্রি হয়নি’।
শনিবারের আয়োজন
শনিবার ছিল বইমেলার ১৭তম দিন। মেলা চলে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। মেলার তথ্যকেন্দ্রে এদিন নতুন বই জমা পড়ে ১৫৭টি।
সকাল ১১টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় কবিতা আবৃত্তি। কবিতাপাঠে অংশ নেন প্রায় ৩০জন কবি ও আবৃত্তিশিল্পী এবং দুটি আবৃত্তি সংগঠন। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় জন্মশতবর্ষ: মুসলিম সাহিত্য সমাজ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মোরশেদ শফিউল হাসান।
এদিন ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন কবি জাকির আবু জাফর, কথাসাহিত্যিক অনুবাদক শাকির সবুর, প্রাবন্ধিক রাজীব সরকার এবং গবেষক খান মাহবুব। বিকেল ৪ টায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
সংগীত পরিবেশন করেন অলোক কুমার সেন, দেবিকা রানী পাল, সিনথিয়া, শারমিন সুলতানা। এ ছাড়াও ছিল সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় সংসদ’ এবং জহির আলীমের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন আবদুল আলীম ফাউন্ডেশনের পরিবেশনা।
যন্ত্রে ছিলেন প্রবীর কুমার দাস (তবলা), সুমন রেজা খান (কী-বোর্ড), গাজী আবদুল হাকিম (বাঁশি), মো. মেজবাহ উদ্দিন (অক্টোপ্যাড)।
পর্দা নামবে রোববার
রোববার অমর একুশে বইমেলার সমাপনী দিন। মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকাল ৩টায় সমাপনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।
মেলার প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন 'অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’ র সদস্য সচিব মো. সেলিম রেজা। প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান।
অনুষ্ঠানে চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার, মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার, সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার এবং শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।