Published : 07 Mar 2026, 10:20 PM
দেশে অর্ধ-শতাধিক প্রকাশনা সংস্থা আছে, যেগুলোর নেতৃত্বে আছেন নারীরা।
এবারের অমর একুশে বইমেলা ঘুরে এমন ২৫টির মতো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্টল দেখেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, যেগুলোয় নারী প্রকাশকরাই রয়েছেন নেতৃত্বের জায়গায়।
তারা বলছেন, নারী প্রকাশকদের সংকট আলাদা কিছু নয়। ফলে প্রকাশনা শিল্পের সামগ্রিক সংকট থেকে উত্তরণ না ঘটলে নারী প্রকাশকরাও ভালো থাকবেন না।
বইমেলায় ছোটদের প্রকাশনী 'ময়ূরপঙ্খী'র স্টলে বসেছিলেন মিতিয়া ওসমান। তিনি এই প্রতিষ্ঠানটির স্বত্ত্বাধিকারী।
মিতিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "প্রকাশনা শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ তো এখন অনেক বেড়েছে। তবে সামগ্রিক বাস্তবতায় এখনো নারী প্রকাশকের সংখ্যা খুব বেশি নয়।"
প্রকাশনা শিল্পের সামগ্রিক যে সংকট, তাতে বাইরে নারী প্রকাশক হিসেবে আলাদা কোনো সংকট দেখেন না মিতিয়া ওসমান।
তিনি বলেন, "পুরো দেশের সমাজ কাঠামো যেভাবে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে অন্য সব নারীর মতোই জীবনের লড়াই করতে হয়। তবে প্রকাশক হিসেবে পুরুষ যেমন সংকট মোকাবেলা করেন, নারী হিসেবে আমিও তেমন সংকটই মোকাবেলা করি; আলাদা কিছু নয়।"
২০০৫ সাল থেকে বইমেলায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করলেও এবার স্টল নেয়নি ‘বলাকা প্রকাশন’। এই প্রকাশনা সংস্থার স্বত্বাধিকারী শরিফা বুলবুলের সঙ্গে কথা হয় মেলার মাঠে।
এবার স্টল না নেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, "আমার মনে হয়েছে, এই বইমেলা ‘ফ্লপ’ হবে।"
অন্যদিকে অতীতের ধারাবাহিকতায় এবারও বইমেলায় অংশ নিয়েছেন ‘বই উদ্যান’ এর প্রকাশক শেখ জান্নাতুন নিসা।
তিনি বলেন, “দেশে নারীর নেতৃত্বে অর্ধশতাধিক প্রকাশনা সংস্থা আছে। কিন্তু এবারের বইমেলায় অংশ নিচ্ছে হাতে গোনা কিছু প্রকাশক। কারণ, করোনা মহামারীর পর থেকে বই বিক্রি কমে গেছে। তার ওপরে গতবছরের মেলায় অনেকের ব্যাপক লোকসান হয়েছে। আর এবারের রোজার মধ্যে বইমেলা ভালো জমবে না বলে অনেকে অংশ নিচ্ছেন না।"
পাঁচ প্রস্তাব
দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "আমি নিজেকে একজন পেশাদার প্রকাশক মনে করি, 'নারী প্রকাশক' নয়। তবে প্রকাশনায় নারীদের কী কী সংকট বা চ্যালেঞ্জ আছে, সেটা নিজের এবং অন্যদের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝার চেষ্টা করি।
"এটা অন্য যেকোনো পেশায় নারীর সংকট থেকে খুব ভিন্ন কিছু নয়। নারীদের জন্য আলাদা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।"

তবে শিল্পের জন্য সার্বিকভাবেই সরকারের অনেক কিছু করণীয় আছে বলেও মনে করেন মাহরুখ। তিনি এ বিষয়ে পাঁচটি প্রস্তাবও তুলে ধরেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে।
মাহরুখ বলেন, "এসব উদ্যোগ নিলে সার্বিকভাবে প্রকাশনা শিল্প উপকৃত হবে।"
মাহরুখ মহিউদ্দিনের প্রস্তাবের মধ্যে আছে, "সহজ শর্তে স্বল্পসুদে ঋণ দেয়া; কম খরচে কাগজ কেনার ব্যবস্থা করা; প্রকাশনা ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ দেওয়া; সম্পাদনা ও পাণ্ডুলিপি ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং বইয়ের পর্যাপ্ত ক্রয় ও বিপণন নিশ্চিত করা।"
শনিবার ছিল অমর একুশে বইমেলা’র ১০ম দিন। মেলা সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলে। এর মধ্যে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মেলায় ছিল শিশুপ্রহর।
বইমেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখা গেছে, নারী লেখকদের নতুন প্রকাশিত বইয়ের পাশাপাশি নারীকেন্দ্রিক বিষয়ভিত্তিক বই নিয়েও পাঠকদের আগ্রহ রয়েছে।
বিদ্যা প্রকাশ এনেছে পলি শাহীনার ‘না জীবন না মৃত্যু’, তাসলিমা জামান পান্নার ‘কাছে থেকেও দূরে তুমি’, পিওনা আফরোজের ‘বিকেলের অনেক রং’ এবং রিমি রুম্মানের ‘নোঙর’।
বাতিঘরের স্টল ম্যানেজার তারেক আবদুর রব বলেন, "নারীকেন্দ্রিক গবেষণামূলক বইয়ের প্রতি পাঠকদের আগ্রহ বেড়েছে।"
নতুন বই
মেলার তথ্যকেন্দ্রে নতুন বই জমা পড়েছে ১৮৫টি। ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন মুস্তাফা মজিদ।
অমর একুশে উদযাপনের অংশ হিসেবে শনিবার বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে শিশুকিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
জন্মশতবর্ষে নুরজাহান বেগম
বিকাল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘জন্মশতবর্ষ : নূরজাহান বেগম’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রাবন্ধিক ইসরাইল খান। আলোচনায় অংশ নেন লেখক সোহরাব হাসান। সভাপতিত্ব করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী।

ইসরাইল খান বলেন, "বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সাময়িক সাহিত্যের ইতিহাসে নারী সম্পাদকের নেতৃত্বে সুদীর্ঘকালব্যাপী পরিচালিত ও প্রকাশিত দুয়েকটি পত্রিকার নাম ইতিহাসে উজ্জ্বলরূপে চিরজাগরুক থাকলেও ‘সাপ্তাহিক বেগম’ এর তুলনা পাওয়া যায় না।
“বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি তথা সার্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ও উন্নয়নের ইতিহাসে এই পত্রিকা যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে। এই পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে মহীয়সী নূরজাহান বেগমের নামও সমমর্যাদায় উচ্চারিত হবে।”
সোহরাব হাসান বলেন, ‘বেগম’ পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল, পরবর্তী সময়ে নূরজাহান বেগমই এই পত্রিকার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। সম্পাদক হিসেবে তিনি তার সমস্ত মেধা দিয়ে এই পত্রিকার প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে নারীর জাগরণকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।"
লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন, "মুসলিম নারীদের জন্য প্রথম সার্থক সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বেগম’ নারীদের সৃজনশীলতাকে উজ্জীবিতকরণ ও আত্মপরিচয় সৃষ্টির একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। নূরজাহান বেগম কেবল উত্তরাধিকারসূত্রেই নয়, তিনি মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে ‘বেগম’ পত্রিকাটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।"
গান-কবিতার আয়োজন
বিকাল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন মিনহাজুল হক। আবৃত্তিতে ছিলেন সাহিদা পারভীন রেখা, আনজুমান আরা ও আজহারুল ইসলাম রনি।
সংগীত পরিবেশন করেন ফেরদৌস আরা, পিয়াল হাসান, নিশাত আহমেদ, মো. ইউসুফ আহমেদ খান, জয় শাহরিয়ার, নির্ঝর চৌধুরী ও মো. শফিউদ্দিন।
বাদ্যযন্ত্রে ছিলেন কাজী মো. ইমতিয়াজ সুলতান (তবলা), মো. নূর এ আলম সজীব (কি-বোর্ড), মো. মনিরুজ্জামান (বাঁশি) ও মো. মেজবাহ উদ্দিন (অক্টোপ্যাড)।
রোববার যা থাকছে
রোববার মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায়; চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকাল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে আসাদ চৌধুরীকে নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান। বিকাল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।