Published : 06 Oct 2025, 10:35 PM
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে প্রার্থীদের সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত, সামাজিক যোগাযোগ ও সাইবার মাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে ‘শক্ত অবস্থান’ নেওয়ার সুপারিশ এসেছে সাংবাদিকদের কাছ থেকে।
নির্বাচনের আগে ভোটার ও অংশীজনদের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত এবং ভোটে শক্তি ও সম্পদের অপপ্রয়োগ বন্ধ করতে তারা কমিশনের কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেছেন।
আর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য দ্রুততম সময়ে প্রকাশ করতে কমিশনকে তাগিদ দিয়েছেন সাংবাদিকরা।
সোমবার বিকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সংলাপে এসব সুপারিশ তুলে ধরেন প্রিন্ট ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকরা।
সংলাপের শুরুতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতির ‘ভবিষ্যৎ নির্ধারণ’ করবে বলে দাবি করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।
নির্বাচন ‘ভালো না হওয়ার’ কোনো সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সিইসি বলেন, “এই নির্বাচনটা কিন্তু দেশের ভবিষ্যত নির্ধারণ করে দেবে। নির্বাচন ভালো না হওয়ার কোনো সুযোগ জাতি হিসেবে আমাদের কাছে নেই। সুতরাং, সবাই মিলে নির্বাচনটা করতে হবে। এটা একটা জাতীয় নির্বাচন এবং জাতীয়ভাবেই আমরা করতে চাই। নির্বাচন কমিশনের একার পক্ষে এককভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না।
"আপনারা মানুষের মতামত তৈরি করার কারিগর। আমরা সেই সুযোগটা নিতে চাই। এই নির্বাচন অবাধ-নিরপেক্ষ করতে একসঙ্গে এগিয়ে যেতে চাই।"
ফেব্রুয়ারি প্রথমার্ধে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। সে হিসাবে তফসিল হতে পারে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে। তার আগে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নিয়েছে কমিশন।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে ‘সংলাপ পর্ব’ শুরু করে ইসি।
এ ধারাবাহিকতায় পূজার ছুটির পর বসল সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে। মঙ্গলবার সংলাপ হবে নারী নেত্রী ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে। চলতি মাসে নিবন্ধিত দলগুলোর সঙ্গেও বসার কথা রয়েছে ইসির।
সাংবাদিকদের যত সুপারিশ
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক কালের কন্ঠে সম্পাদক হাসান হাফিজ বলেন, “প্রথমে আপনাদের কাছে আমার প্রত্যাশা থাকবে, আপনারা মেরুদণ্ডসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবে জাতির কাছে... আমরা চাইবো আপনারা সেই রকম দৃঢ়তা, দেশপ্রেম ও অঙ্গীকারের পরিচয় দেবেন।”
নির্বাচন ‘গ্রহণযোগ্য করতে’ কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের ব্যাপারে কমিশনের অবস্থান জাতির সামনে ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্পষ্ট করার আহ্বান জানান তিনি।
সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতে নজরদারি চালাতে রাজনৈতিক নেতাদের বাদ দিয়ে সামাজিক ও পেশাজীবী নেতা, তরুণদের নিয়ে প্রতিটি নির্বাচনি এলাকায় ‘নজরদারি কমিটি’ গঠনের সুপারিশ করেন হাসান হাফিজ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অতথ্য ছড়ানোর অভিযোগ তুলে তিনি কমিশনের পক্ষ থেকে সাইবার নজরদারি এবং এ জন্য সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করেন।
কালের কণ্ঠ সম্পাদক পোস্টাল ব্যালট প্রক্রিয়া ‘সহজ করে’ প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং ঢাকার বাইরেও অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপ আয়োজন করার সুপারিশ করেন৷
দৈনিক ইনকিলাবের সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দিন সাইবার অপরাধ ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে কমিশনকে তাগিদ দেন।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘অত্যন্ত নাজুক’ মন্তব্য করে দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক আব্দুল হাই সিকদার বলেন, “এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন আয়োজন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।”
প্রশাসন ও পুলিশে এখনও ‘ফ্যাসিস্টের দোসররা’ আছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
প্রার্থিতা ও ভোট কেনাবেচা বন্ধে কমিশনের ‘শক্ত অবস্থান’ প্রত্যাশা করেন দৈনিক প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরীফ। তিনি প্রার্থীদের হলফনামার সঙ্গে ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেওয়া, তা যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করা ও নির্বাচনি ব্যয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা করার সুপারিশ করেন।
নির্বাচন কমিশনকে নৈতিকভাবে শক্তিশালী করতে কমিশনের কার্যক্রম দৃশ্যমান করার বিষয়েও জোর দেন তিনি।
ডেইলি ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক সামসুল হক জাহিদ আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসন ও পুলিশের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় অঞ্চলভিত্তিক আলাদা দিনে নির্বাচন আয়োজন করা যায় কি না, তা কমিশনকে ভেবে দেখতে বলেন।
দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক আযম মীর শহীদুল আহসান বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জনের চেষ্টা নির্বাচন কমিশনকে করতে হবে। ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ (সবার জন্য সমান সুযোগ) নিয়ে কিন্তু কথাবার্তা আছে। তাই আমি মনে করি, এই আস্থা অর্জনটা জরুরি।”
বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনিও একাধিক দিনে ভোটগ্রহণ এবং সকাল থেকে ভোট গণনার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান।
অনলাইন সংবাদমাধ্যম ঢাকা মেইলের নির্বাহী সম্পাদক হারুন জামিল ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান।
দৈনিক নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী বলেন, “নির্বাচন ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনার ওপর আস্থা খুব অপরিহার্য। এই আস্থা অর্জনের জন্য আমার ধারণা, বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে প্রশাসন।”
গণভোটের সুযোগ কাজে লাগিয়ে নতুন উদ্যোগগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নির্বাচনে বল ও অর্থের অপপ্রয়োগ বন্ধে নজরদারি বাড়িয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, কর বা ঋণখেলাপীদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না দেওয়ার সুপারিশও করেন তিনি।
দৈনিক আজকের পত্রিকার সম্পাদক কামরুল হাসান প্রার্থীদের হলফনামা জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ওয়েবসাইট প্রকাশ করার সুপারিশ করেন।
আসন্ন নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক না হলে সমাজে আরও বিভাজন ও সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দৈনিক খবরের কাগজের সম্পাদক মোস্তফা কামাল।
তিনি বলেন, “সে জায়গাটায় নির্বাচন কমিশনের একটা বিশাল দায়িত্ব, জাতির ক্রান্তিলগ্নে। নির্বাচন যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, সবাই যদি ভোটে অংশগ্রহণ করতে পারে, তাহলে বিভাজনের জায়গাটা অনেকটা কমে আসবে।”
স্থানীয় পর্যবেক্ষক মনোনয়ন নিয়ে বিতর্কের বিষয়টি তুলে ধরে গাফিলতিতে জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার কথা বলেন দৈনিক আমাদের সময়ের নির্বাহী সম্পাদক এহসান মাহমুদ।
তিনি সাইবার মাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য মহড়া জাতির সামনে উপস্থাপন করতে কমিশনকে অনুরোধ করেন।
বাংলাবাজার পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক রাশেদুল হক নির্বাচন কর্মকর্তা, ভোটার, এজেন্ট ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেন। ভোটের দিন ও ভোটের আগের রাতে সাংবাদিকদের কেন্দ্রে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দৈনিক খবর সংযোগের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক শেখ নজরুল ইসলাম বিভিন্ন স্থানে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ব্যানার, বিলবোর্ড টাঙানো ও প্রচার বন্ধ করার সুপারিশ করেন।
যা বলছে কমিশন
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, “হলফনাম নিয়ে একটা কথা এসেছে, মিথ্যা তথ্য বা ভুল তথ্য থাকলে প্রার্থীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায় না। আমরা এবারে আরপিও সংশোধনীতে যে প্রস্তাব এনেছি তাতে শুধু ওই সময়ের জন্য নয়, তিনি যে সময়টা অফিস করার জন্য নির্বাচন করেছেন ওই সময়ের মধ্যেও অসত্য তথ্য থাকলে তাকে প্রত্যাহার করা যাবে এবং নির্বাচন কমিশন যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে তার প্রার্থীতা বাতিলসহ নির্বাচিত সংসদ সদস্যের পদও বাতিল করে দিতে পারবে।”
তিনি বলেন, “এবার আমরা একটি বিধান করেছি, প্রতিটি সংসদীয় এলাকায় নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে সকল প্রার্থী একই প্ল্যাটফর্মে এসে তাদের অবস্থান তুলে ধরবেন।”
বিগত নির্বাচনগুলোতে শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকলেও তারা নির্বাচন ‘খারাপ করার জন্য কাজ করেছে’ মন্তব্য করে সানাউল্লাহ বলেন, “এবারে হয়তোবা তারা অতটা শক্তিশালী থাকবে না, কিন্তু নির্বাচন ভালো করার জন্য কাজ করবে।”
কেন্দ্রগুলোতে রোভার স্কাউটদের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার চিন্তা কমিশন করছে বলেও জানান এ নির্বাচন কমিশনার।
স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক মনোনয়ন নিয়ে তিনি বলেন, “গত তিনটি নির্বাচনকে বৈধতা দিয়ে যেসব সংস্থা প্রতিবেদন দিয়েছে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। সরাসরি রাজনৈতিক পদধারীরা যেসব সংস্থায় ছিলেন তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে, সেটা যে রাজনৈতিক দলই হোক না কেন।”
কিছু কিছু পর্যবেক্ষক সংস্থার কর্মকান্ড ও অফিসের অস্বিত্ব না থাকার অভিযোগ কমিশন আমলে নেবে বলেছেন এ কমিশনার।
পাঁচ সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে তুলে ধরে সানাউল্লাহ বলেন, “কেউ কেউ আদালতে গেছেন, তাই এ নিয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই না। তবে ব্যাপারটা সম্ভবত সীমানা নিয়ে নয়।”
ভোটার তালিকা নিয়ে আগে বিতর্ক থাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে এ তালিকা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে সামাজিক মাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মন্তব্য করেন এই নির্বাচন কমিশনার।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব আলী নেওয়াজের সঞ্চালনায় সংলাপে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন কমিশনার বেগম তাহমিদা আহমদ, আব্দুর রহমানেল মাছউদ, মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম সরকার, বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক আবু তাহের, বাংলানিউজ২৪ এর সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু, সারাবাংলা ডট নেটের হেড অব নিউজ গোলাম সামদানী, বাংলাদেশ বেতারের পরিচালক মো. বশির উদ্দিন, রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসির (আরএফইডি) সভাপতি কাজী এমাদ উদ্দিন জেবেল, সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী, যায়যায়দিনের যুগ্ম সম্পাদক মো. মাহমুদুজ্জামান, দৈনিক আমার দেশের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, দ্য ডেইলি স্টারের হেড অব নিউজ জিয়াউল হক, ইত্তেফাকের রাজনীতি ও নির্বাচন বিষয়ক সম্পাদক সাইদুর রহমান, প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক মারুফ কামাল খান, ইউএনবির সম্পাদক মাহফুজুর রহমান।