১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ছাগলকাণ্ড: মতিউর পরিবারের আরও ৪ ফ্ল্যাট ও ২৪ একর জমি ক্রোক

এর আগে গত ৪ জুলাই তাদের চারটি ফ্ল্যাট ও প্রায় ৯ একর জমি ক্রোক করা হয়।

আদালত প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 11 Jul 2024, 06:19 PM

Updated : 10 Sep 2026, 12:11 PM

‘ছাগলকাণ্ডে’ আলোচিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক কর্মকর্তা মতিউর রহমান ও তার পরিবারের আরও চারটি ফ্ল্যাট ও ২৩৬৭ শতাংশ জমি ক্রোকের আদেশ দিয়েছে আদালত।

এছাড়া তাদের ১১৬টি ব্যাংক হিসাবে থাকা ১৩ কোটি ৪৪ লাখ ৩৬ হাজার ৪৭১ টাকা এবং শেয়ারবাজারে ২৩টি বিও অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করতে বলা হয়েছে।

দুদকের আবেদনের শুনানি নিয়ে বৃহস্পতিবার এ আদেশ দেন ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন।

দুদকের আইনজীবী মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, ক্রোক হওয়া ফ্ল্যাটগুলোর চারটিই রাজধানীর মিরপুর এলাকার, যেগুলো আবাসন কোম্পানি শেলটেকের কাছ থেকে কেনা। আর ক্রোক হওয়া জমির অবস্থান ঢাকার সাভার, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নরসিংদী ও নাটোরে।

আইনজীবী মাহমুদ হোসেন বলেন, ফ্ল্যাট ও জমি ক্রোক এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের (ফ্রিজ) আদেশ চেয়ে আবেদন করেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক আনোয়ার হোসেন। ওই আবেদনের শুনানি নিয়ে বিচারক আদেশ দিয়েছেন।

দুদকের উপপরিচালক আনোয়ার হোসেন ক্রোক আবেদনে বলেন, “অনুসন্ধানকালে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যাচ্ছে যে, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট মতিউর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যরা তাদের মালিকানাধীন স্থাবর সম্পত্তি

হস্তান্তরের চেষ্টা করছেন, যা করতে পারলে এই অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় মামলা রুজু, আদালতে চার্জশিট দাখিল, আদালত কর্তৃক বিচার শেষে সাজার অংশ হিসেবে অপরাধলব্ধ আয় হতে অর্জিত সম্পত্তি সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্তকরণসহ সব উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।”

অনুসন্ধান ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি আবেদনে উল্লেখ করেন।

এর আগে গত ৪ জুলাই মতিউর রহমান ও তার পরিবারের চারটি ফ্ল্যাট ও ৮৬৬ শতাংশ জমি ক্রোকের আদেশ দিয়েছিল আদালত।

দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে আলোচনার মধ্যে মতিউরকে এনবিআরের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে সংযুক্ত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বাদ পড়েছেন সোনালী ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদ থেকেও।

কোরবানির জন্য ঢাকার মোহাম্মদপুরের সাদিক অ্যাগ্রো থেকে ইফাত নামের এক তরুণের ১৫ লাখ টাকা দামে ছাগল কেনার ফেইসবুক পোস্ট ঘিরে মতিউর রহমানকে নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় সমালোচনা শুরু হয়।

তার আগে ছাগল কিনতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন ইফাত। ধানমন্ডির বাসায় ঈদের দিন ছাগলটি কোরবানি দেওয়ার কথা বলেছিলেন তিনি। তখন ছাগলসহ ইফাতের ছবি জুড়ে দিয়ে অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তোলেন- ১৫ লাখ টাকা দিয়ে ছাগল কেনার অর্থের উৎস কী?

এ প্রশ্ন ঘিরে সামনে আসতে থাকে ইফাতের পরিচয়। ইফাত নিজেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিসহ পোস্ট দিয়ে ও সংবাদমাধ্যমে বাবার পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, তার বাবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের সভাপতি মো. মতিউর রহমান।

ইফাতের বাবার পরিচয় ধরে অনেকে প্রশ্ন তোলেন, একজন সরকারি কর্মকর্তার ছেলের বিপুল ব্যয়ে কোরবানির পশু কেনার সামর্থ্য হল কী করে?

অবশ্য ছাগলটি ইফাত শেষপর্যন্ত কেনেননি বলে দাবি সাদিক এগ্রোর কর্ণধার মোহাম্মদ ইমরান হোসাইনের। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, ইফাত শুধু ১ লাখ টাকা দিয়ে ছাগলটির বুকিং করেছিলেন। তবে অবশিষ্ট মূল্য পরিশোধ করে ছাগলটির তিনি আর নিয়ে যাননি।

বিষয়টি নিয়ে ইফাতের বক্তব্যও এসেছে সংবাদমাধ্যমে। তার দাবি, ইমরান হোসাইনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রে তার ‘অনুরোধে’ ছাগলটি নিয়ে প্রচারের জন্য এতটা দামের কথা বলে পোস্ট দিয়েছিলেন তিনি।

মতিউর রহমান এ আলোচনায় ‘ঘি ঢেলেছেন’ ছেলের পরিচয় ‘অস্বীকার’ করে। একটি টেলিভিশনের প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, মুশফিকুর রহমান ইফাত নামে কেউ তার ছেলে বা আত্মীয় নয়, এমন নামে কাউকে চেনেন না পর্যন্ত। তার একটিই ছেলে, তার নাম তৌফিকুর রহমান।

এরপর ইফাতের পরিচয় ও পারিবারিক ঠিকুজি নিয়ে ফেইসবুকে নানা তথ্য আসতে থাকে। ইফাতের সঙ্গে মতিউর রহমান এবং পরিবারের অন্যদের ছবিও প্রকাশিত হয়।

এক পর্যায়ে সামনে আসেন ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী। একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেন, ইফাত তার মামাতো বোনের সন্তান। আর মতিউর রহমানই ইফাতের বাবা।

এ সংসদ সদস্য বলেন, ইফাত এনবিআর কর্মকর্তা মতিউর রহমানের দ্বিতীয় পক্ষের (স্ত্রীর) ছেলে। মতিউর রহমানের প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ লাকি ছিলেন শিক্ষা ক্যাডারের সাবেক কর্মকর্তা। সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি নাম লেখান রাজনীতিতে। তিনি এখন নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।

মতিউর রহমান এর আগে ব্রাসেলসে বাংলাদেশের কমার্শিয়াল কাউন্সিলের, চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার, ভ্যাট কমিশনারসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯৯৪ সালে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া এ কর্মকর্তা পড়ালেখা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগে। এর আগেও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, সেসব দুদক তদন্তও করেছে।

দুদিন আগে বেসরকারি এক টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “চারবার দুদক তদন্ত করে দেখেছে, আমি কোনো দুর্নীতি করিনি।”

মতিউর সরকারি চাকরির পাশাপাশি ব্যবসায় জড়িয়েছেন; বিনিয়োগ করেছেন পুঁজিবাজারেও।

বিপুল আয়ের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করলে মতিউর ওই সাক্ষাৎকারে বলেন, “একটা গ্রুপ অব কোম্পানির ৩০০ একরের জমিতে আমার একটা অংশ আছে। কোনো কারখানায় আমার বিনিয়োগ আছে। কিন্তু ৩০০ একর জমি বা কারখানার পুরোটা আমার না। আমাদের পরিবারের বিনিয়োগ আছে মাত্র।”

ছাগলকাণ্ডমতিউর পরিবারের সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ