Published : 17 Oct 2025, 11:04 PM
ঢাকার পল্লবীতে ‘সারারাত আটকে রেখে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের’ মামলার অভিযোগপত্রে নিপীড়কদের ‘সবার নাম না আসায়’ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী নারী সাংবাদিক।
ঘটনা তদন্ত করে পুলিশ দুমাস আগে যে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে, তাতে ১৩ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করায় নারাজি দেবেন বলে জানিয়েছেন বাদী।
তবে তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, তদন্ত চলাকালে ওই নারী তেমন সহযোগিতা করেননি।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ওই নারী সাংবাদিক চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে জানতে পারেন, একটি সংঘবদ্ধ চক্র ঢাকার মাটিকাটা এলাকার সিঙ্গার শোরুম গলিতে নারী-পুরুষ এনে তাদের নির্যাতন করে অশ্লীল ছবি বা ভিডিও ধারণ করে টাকা আদায় করে। অভিযোগের সত্যতা জানতে গত ১৭ মার্চ রাত ১১টার দিকে ওই সাংবাদিক যাওয়ামাত্র ১৬ জন পুরুষ তাকে ঘিরে ধরে। তারা তাকে মারধর, শারীরিক নির্যাতন করতে করতে রাত ১টার দিকে পল্লবীর বালুঘাট ‘ইস্টার গার্ডেন গ্রিন সিটি বিল্ডিংয়ের তৃতীয় তলায়’ আটকে রেখে ধর্ষণ করে। তারা তাকে মারধরও করে। পরে সেখান থেকে কৌশলে পালিয়ে যাওয়ার সময় ওই পুরুষরা দেখে ফেলে এবং মারধর করে। ওই নারীর চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করে।
পরে তিনি পল্লবী থানায় আটজনের নাম উল্লেখসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার পর গ্রেপ্তার এনামুল হক ও হামিদুর রহমান বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। তাদের মধ্যে এনামুল হক আদালতে ‘স্বীকারোক্তিমূলক’ জবানবন্দি দেন।
ঘটনার ছয় মাস পর গত ৩০ সেপ্টেম্বর তিন জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন ঢাকার মহানগর পুলিশের তেজগাঁও উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের পরিদর্শক আমেনা খাতুন।
অভিযুক্তরা হলেন—বালুঘাট গ্রিন সিটি গার্ডেনের কেয়ারটেকার এনামুল হক, শাহীন চৌধুরী ও মাহমুদুল হাসান। তবে গ্রিন সিটি গার্ডেনের আরেক কেয়ারটেকার হামিদুর রহমান এবং ইয়াছিন, হাবিব, ছোট ইয়াছিন, আনুসহ ১৩ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।
গত ৯ অক্টোবর মামলার অভিযোগপত্র দেখেছেন ঢাকার মহানগর হাকিম দিলরুবা আফরোজ তিথি। বিচারের জন্য তিনি মামলাটি ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ বদলির আদেশ দেন। বৃহস্পতিবার মামলাটি ঢাকার মহানগর হাকিম আদালত থেকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই আবুল কালাম আজাদ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক আমেনা খাতুন বলেন, “এক নারী সাংবাদিককে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মারধরের মামলায় তিনজনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছি। এজাহারনামীয় পাঁচ আসামি ও অজ্ঞাতনামা ৮ আসামিসহ ১৩ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “মামলার তদন্তভার পাওয়ার পরই বাদীর সাথে যোগাযোগ করি। তিনি আমাদের যোগাযোগ করতে বারণ করেন। তাকে ফোন দিলে ফোন ধরেন না। তিনি যদি আমাদের সহযোগিতা করতেন, তাহলে মামলার তদন্তটা আরও ভাল হতো।
“ঘটনার সাথে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা যেত। এর পরও যদি কোনো আসামির নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়, তাহলে আদালতে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করব।”
আসামিদের সবার নাম অভিযোগপত্রে না আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই নারী সাংবাদিক বলেন, “যারা এ ঘটনার সাথে জড়িত, তাদের সবার নাম অভিযোগপত্রে আসেনি। ১৬ জন এ ঘটনা ঘটিয়েছে। আর অভিযোগপত্র দিয়েছে তিনজনের নামে। আমি এ তদন্তে সন্তুষ্ট নই।
“তদন্ত কর্মকর্তা আমার সাথে যোগাযোগ করেননি, কথা বলেননি। তার মতো করে একটি অভিযোগপত্র জমা দিয়ে দিয়েছে। আমি এ অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নারাজি দাখিল করব।”
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, গত ১৭ মার্চ রাত ১১টার দিকে সোহেল নামের এক বন্ধুকে নিয়ে মাটিকাটা এলাকায় যান ওই সাংবাদিক। এসময় বাদী আশেপাশের নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের ছবি তোলেন এবং ভিডিও ধারণ করেন। বিষয়টি বখাটেরা দেখতে পেয়ে বাদী ও তার বন্ধুকে ইস্টার গার্ডেন গ্রিনসিটি ভবনের নিচ তলায় নিচে যায়। তারা সোহেলকে মারধর করে তাড়িয়ে দেয়।
সোহেলের নাম-ঠিকানা না পাওয়ায় এবং এই বিষয়ে ‘বাদী সহযোগিতা না করায়’ সোহেলের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করা যায়নি বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, মাদক কারবারি হাসান, শাহীন, আনু, ইয়াছিন, হাবিবসহ অন্যরা বাদীকে ওই ভবনের তৃতীয় তলায় নিয়ে যায়। তারপর তারা নির্যাতন চালিয়ে চলে যায়। বাদী ওই কক্ষে অবস্থানকালে ভবনের কেয়ারটেকার এনামুল পরপর দুইবার ধর্ষণ করে। ভোরের দিকে বাদী ওই স্থান থেকে চলে যাওয়ার সময় ওই আসামিরাসহ অচেনা ৩/৪ জন ঘটনাস্থলে যায়। ইস্টার টাওয়ারের সামনে পেয়ে তাকে মারধর করে।
এসময় ওই নারী দৌড়ে দৌড় দেন। তখন গ্রিনসিটি গার্ডেনের কেয়ারটেকার হামিদুর ঘুম থেকে উঠে মশারির ভেতর বাদীকে লুকিয়ে রাখেন। বখাটেরা চলে যাওয়ার পর হামিদুর ওই নারীকে ধর্ষণ করে।
তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে বলেছেন, আসামিদের ধরতে পুলিশ অভিযান পরিচালনা করলেও সঠিক নাম-ঠিকানা না পাওয়ায় তাদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। বাদীর সঙ্গে মোবাইলে কথা বললে তিনি মামলা তদন্ত কাজে সহযোগিতা করতে অনীহা প্রকাশ করেন। বাদীকে বারবার নোটিস দিয়ে অফিসে হাজির করা যায় নাই।
এনামুল হকের আইনজীবী তারেক হাসান বলেন, “অনেককে এ মামলায় সম্পৃক্ত করে মামলা দায়ের করা হয়। এনামুল হক গ্রেপ্তারের পর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি এ ঘটনার সাথে জড়িত না। তাকে জড়ানো হয়েছে।
“ওইখানকার স্থানীয়রা, বখাটেরা, প্রভাবশালীরা এ ঘটনা ঘটিয়ে তাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। এজাহার কার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নাই। আমরা তার পক্ষে আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।”