Published : 29 Sep 2025, 06:27 PM
ডিম ছাড়া ও প্রজননের জন্য আগামী ৪ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশ ধরা, আনা-নেওয়া, বাজারজাত ও মজুদ নিষিদ্ধ করেছে সরকার।
এই সময়ে ইলিশ রক্ষায় বিশেষ অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার।
সোমবার প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “মা ইলিশ রক্ষা করতে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রজনন সময় বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা, বিশেষ করে মৎস্যজীবীদের মতামত অনুযায়ী এই সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়।”
ফরিদা আখতার বলেন, ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম (৪ থেকে ২৫ অক্টোবর)। আশ্বিনী পূর্ণিমার পূর্বের চার দিন এবং অমাবস্যার পরের তিন দিনকে অন্তর্ভুক্ত করে মোট ২২ দিন এই অভিযান চলবে।
“প্রজনন মৌসুমের পূর্ণিমা ও অমাবস্যা উভয় সময়ই ডিম পাড়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায়, দুটি পর্যায় অন্তর্ভুক্ত করে সর্বোচ্চ প্রজনন নিশ্চিত করা হয়েছে। এই কর্মসূচি ‘মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান ২০২৫’ নামে পরিচিত। অভিযান পরিচালনায় মৎস্য কর্মকর্তাদের পাশাপাশি নৌ পুলিশ, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী এবং বিমান বাহিনীসহ সকল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অংশগ্রহণ করবে।”
এই সময়ে জেলেদের জন্য সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে উপদেষ্টা বলেন, ৩৭টি জেলার ১৬৫টি উপজেলার ৬ লাখ ২০ হাজার ১৪০ জেলে পরিবারকে ভিজিএফ (চাল) দেওয়া হবে, পরিবার প্রতি বরাদ্দ থাকবে ২৫ কেজি করে চাল, যা পুরো কার্যক্রমে মোট ১৫ হাজার ৫০৩ দশমিক ৫ টন চাল প্রয়োজন হবে।
“এ অভিযানের সময় জলসীমার বাইরে মাছ ধরা ট্রলারের অনুপ্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। নদীতে ড্রেজিং সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা হবে। সমুদ্র, উপকূল ও মোহনায়ও প্রধান প্রজনন মৌসুমে ২২ দিন ধরে ইলিশ আহরণ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকবে।”
ফরিদা আখতার বলেন, “বিএফআরআই এর গবেষণা অনুযায়ী ২০২৪ সালের নিষেধাজ্ঞার ফলে ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ মা ইলিশ নিরাপদে ডিম ছেড়েছিল। এর ফলে ৪৪ দশমিক ২৫ হাজার কোটি জাটকা বা রেণু ইলিশ পরিবারে যুক্ত হয়েছে। এই ডিম থেকে উৎপন্ন রেণু বা পোনা (জাটকা) ভবিষ্যতে পরিপক্ক ইলিশে পরিণত হবে।”
গত ৫ বছরে প্রায় ১০ শতাংশ ইলিশ আহরণ কমার তথ্য দিয়ে মৎস্য উপদেষ্টা বলেন, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত ইলিশ আহরণ ক্রমাগত হ্রাস পেয়েছে।
“চলতি বছরের জুনের মাঝামাঝি সময়ে সারা দেশে জাটকা ইলিশ আহরণের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর আশা করা হয়েছিল বাজারে ইলিশের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পাবে। তবে মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ও অগাস্ট মাসে ইলিশ আহরণ ২০২৪ সালের তুলনায় যথাক্রমে ৩৩ দশমিক ২০ শতাংশ এবং ৪৭ দশমিক ৩১ শতাংশ কম হয়েছে। এই দুই মাসে মোট আহরণ হয়েছে ৩৫ হজার ৯৯৩ দশমিক ৫ টন, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ২২ হাজার ৯৪১ দশমিক ৭৮ টন (৩৮ দশমিক ৯৩%) কম।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ থেকে ২০১০-১১ ও ২০১১-১২ অর্থবছরে উল্লেখযোগ্যভাবে ইলিশ রপ্তানি হয়েছিল। ২০১০-১১ সালে ৮ হাজার ৫৩৮ দশমিক ৭৭ মেট্রিক টন ইলিশ রপ্তানির মাধ্যমে ৩৫২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানির জন্য অনুমোদনের পরিমাণ ১ হাজার ৮৭৫ টন আর প্রকৃত রপ্তানি হয়েছিল ১ হাজার ৮৭৫ টন, যার রপ্তানি মূল্য ছিল ১৫৪ কোটি টাকা।”
২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানির জন্য অনুমোদনের পরিমাণ ৪ হাজার ৬০০ টন। আর প্রকৃত রপ্তানি হয় ১ হাজার ২১১ টন, যার মূল্য ১১৩ কোটি টাকা।
২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানির জন্য অনুমোদনের পরিমাণ ৩ হাজার টন, আর প্রকৃত রপ্তানি হয় ১ হাজার ৩৭৬ টন, যার রপ্তানি মূল্য ১৪৮ কোটি টাকা।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানির জন্য অনুমোদনের পরিমাণ ৩ হাজার ৫৫০ টন, আর প্রকৃত রপ্তানি হয় ৬৬৫ টন, যার রপ্তানি মূল্য ৮৫ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানির জন্য অনুমোদনের পরিমাণ ২ হাজার ৪২০ টন, আর প্রকৃত রপ্তানি হয় ৫৭৪ টন, যার রপ্তানি মূল্য ৬৮ কোটি টাকা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানির জন্য অনুমোদনের পরিমাণ ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন। রপ্তানি চলছে। সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, অনুমোদিত পরিমাণের তুলনায় প্রকৃত রপ্তানি ধীরে ধীরে কমে আসছে।
উপদেষ্টা বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নির্ধারিত প্রতি কেজি ইলিশের রপ্তানি মূল্য সাড়ে ১২ ডলার। এ হিসাবে বেনাপোল স্থল বন্দর দিয়ে ৮১ হাজার ৪৩৮ কেজি ইলিশ রপ্তানি হয়েছে, যার বাজার মূল্য দাঁড়ায় ১২ কোটি ৩৯ লাখ ৭ হাজার ৯১৭ টাকা। এ ছাড়া আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে ২২ দশমিক ২৬ টন ইলিশ রপ্তানি হয়েছে, যার বাজার মূল্য ৩ কোটি ৩৮ লাখ ১৫৪ টাকা।