Published : 12 Mar 2026, 09:55 PM
প্রায় তিন বছর আগে ঢাকার দক্ষিণখানে স্ত্রী আফরোজাকে হত্যা করে পুঁতে রেখে কানাডা পালিয়ে যাওয়া আশরাফুল আলম সুমন ঢাকায় গ্রেপ্তার হয়েছেন।
প্রায় এক মাস আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন বিমানবন্দরে তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও তা এতদিন প্রকাশ পায়নি।
৫১ বছর বয়সি আশরাফুল বর্তমানে কেরাণীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন এবং জামিনের জন্য চেষ্টা করছেন।
দক্ষিণখান থানার ওসি শরিফুল ইসলাম বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আশরাফুলের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলের আদালত তার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। সেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে ছিল।
“গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিন আশরাফুল কানাডা থেকে শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছলে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে হেফাজতে নিয়ে (আমাদের) জানায়। পরে আমরা তাকে গ্রেপ্তার করে যথারীতি আদালতে পাঠিয়ে দিই।”
আফরোজার ছোট ভাই মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা গ্রেপ্তারের খবর জানতাম না। প্রায় একমাস পরে মামলার খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারি আমার বোনের হত্যাকারী গ্রেপ্তার হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আদালতে জামিন নাকচ হওয়ার পর এখন সে উচ্চ আদালতে জামিনের চেষ্টা করছে।”
তিনি মনে করেন, ‘চাতুরতার’ আশ্রয় নিয়ে আশরাফুল দেশে আসার জন্য নির্বাচনের দিন বেছে নিয়েছিলেন এবং গ্রেপ্তার ‘গোপন’ রেখে জামিনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
২০২৩ সালের ২৭ মে দুপুরে ঢাকার দক্ষিণখানের নদ্দাপাড়ায় শ্বশুরবাড়ি থেকে নিখোঁজ হন ৪০ বছর বয়সি আফরোজা। পরে ৩১ মে রাতে ওই বাড়ির সীমানায় মাটিতে পুঁতে রাখা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার বাড়ি নীলফামারীর ডোমারের ভোগড়াবুড়ি গ্রামে।
ঢাকায় এসে বোন নিখোঁজ হওয়ার পর দক্ষিণখান থানায় জিডি করেছিলেন আরিফুল। এর চারদিন পরেই পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। এর আগেই আশরাফুল কানাডায় চলে যান।
সে সময় আরিফুল বলেছিলেন, আফরোজা ও আশরাফুল দুজনেই বহু বছর ধরে কানাডায় থাকতেন। সেখানে পরিচয়ের সূত্র ধরে তাদের বিয়ে হয়। আফরোজার আগেও বিয়ে হয়েছিল। তার আগের ঘরের দুই মেয়ে ও এক ছেলে আশরাফুলের সংসারেই থাকত।
ঘটনার এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০২২ সালে আশরাফুল আলমের সঙ্গে আফরোজার বিয়ে হয়। এটা আশরাফুলের চতুর্থ বিয়ে। তার আগের স্ত্রীর ঘরেও সন্তান রয়েছে।
আরিফুল বলেছিলেন, ২০২৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি স্বামীকে নিয়ে কানাডা থেকে দেশে আসেন আফরোজা। তার এক ভাগনিকেও সঙ্গে আনেন তারা। কানাডায় বিয়ে হলেও দেশে আনুষ্ঠানিকতা সারতে তারা নতুন করে কাবিননামা করেন।
সে সময় নিখোঁজের যে জিডি করা হয়েছিল সেটির তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন দক্ষিণখান থানার এসআই রেজিয়া খাতুন। এই জিডির তদন্ত করতে গিয়ে আফরোজার শ্বশুর, জা ও ভাসুরের কথাবার্তায় তার সন্দেহ হয়।
এসআই রেজিয়া খাতুন ওই সময় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, “পরে কৌশলে তাদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে আফরোজার অবস্থান জানতে গিয়ে জানা যায়, আফরোজা নিখোঁজ হয়নি, খুন হয়েছেন এবং লাশ বাড়ির সীমানা দেয়ালের পাশে মাটি চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে।”
আশরাফুল কানাডায় চলে যাওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব না হলেও আত্মীয়দের মাধ্যমে মোবাইল ফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় বলেন এসআই রেজিয়া।
“নানা কৌশল অবলম্বন করে খালা পান্না চৌধুরীসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের মাধ্যমে আশরাফুলের সাথে ৩১ মে (লাশ উদ্ধারের দিন) রাতে ভিডিও কলে কানাডায় যোগাযোগ করা হয়। তখনই আফরোজার মরদেহ পুঁতে রাখার জায়গাটি আশরাফুল ভিডিও কলের মাধ্যমে জানিয়ে দিলে মাটি খুড়ে মরদেহ উদ্ধার হলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।”
আফরোজার লাশ উদ্ধারের ঘটনায় মামলার আসামিরা হলেন-আশরাফুল, তার ভাই সজীব আলম, তাদের বাবা শামছুদ্দিন আহমেদ, তাদের খালা আইনজীবী পান্না চৌধুরী এবং সজীবের স্ত্রী তাহমিনা বাশার।
সে সময় পুলিশ আশরাফুলের বাবা, ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী, খালাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তারা জামিন পান।
পুলিশ ওই বছরের ডিসেম্বর পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
আফরোজার ভাই মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে মামলার বিচারকাজ চলছে জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। এই আদালতে আগামী ৩০ মে অভিযোগ গঠনের শুনানির দিন রয়েছে।
তিনি বলেন, “গ্রেপ্তারের পর এই আদালতে জামিনের জন্য আবেদনও করেছিল তারা। কিন্তু জামিন নাকচ করে দেয় আদালত। এখন উচ্চ আদালতে জামিনের চেষ্টা করছে। এছাড়া তারা দেশে বাইরে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে আসামিদের একজন দেশের বাইরে চলে গেছে বলে জানতে পেরেছি।”
এই মামলার অন্যতম আসামি আশরাফুলের খালা আইনজীবি পান্না চৌধুরী। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এই ঘটনার সাথে তিনি কোনোভাবেই জড়িত নন। বরং আফরোজার মরদেহ বের করে দিতে তিনি পুলিশকে সহায়তা করেছেন।
“আমার সাথে ওদের (আশরাফুলের বাবা, ভাই) সম্পর্ক ভালো না। বোন মারা যাওয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে তাদের সাথে আমি কোনো সম্পর্ক রাখিনি।”
এক প্র্রশ্নের জবাবে পান্না চৌধুরী বলেন, “আশরাফুল কেন দেশে এসেছে, এটা আমারও প্রশ্ন। আর আসামিদের মধ্যে আশরাফুলের ভাই সজীব আলমের স্ত্রী তাহমিনা বাশার দেশের বাইরে গেছেন। হয়তো চলে আসবেন।”
এ ব্যাপারে সজীব আলমের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
আগের খবর:
স্ত্রীকে হত্যার পর পুঁতে রেখে কানাডায়: স্বামীসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে ...
স্ত্রীর লাশ পুঁতে রাখার স্থান কানাডা থেকে ভিডিও কলে দেখালেন স্বামী