Published : 03 Dec 2023, 10:06 PM
রাজধানীর দক্ষিণখানে প্রায় ৬ মাস আগে স্ত্রীকে হত্যার পর বাড়ির ভেতর খোলা জায়গায় মাটিচাপা দিয়ে কানাডা পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় স্বামীসহ পরিবারের পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।
তারা হলেন নিহত আফরোজা বেগমের (৪০) স্বামী আশরাফুল আলম (৪৮), তার ভাই সজীব আলম (৪৪), তাদের বাবা শামছুদ্দিন আহমেদ (৬৮), তাদের খালা আইনজীবী পান্না চৌধুরী (৫২) এবং সজীবের স্ত্রী তাহমিনা বাশার (৪২)।
পুলিশ বলছে, আফরোজাকে হত্যার পর লাশ গুম করতে এবং আশরাফুলকে দেশের বাইরে চলে যেতে সহায়তা করেন পরিবারের চার সদস্য।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দক্ষিণখান থানার এসআই রেজিয়া খাতুন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তদন্তকালে আফরোজার স্বামীসহ পাঁচ জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।”
হত্যার ঘটনার পর আশরাফুল নিরাপদে দেশের বাইরে চলে যেতে পারলেও পুলিশ অন্যদের গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয়। পরে তারা চারজনই জামিনে মু্ক্তি পেয়ে যান।
আফরোজা ও আশরাফুল দুজনেই বহু বছর ধরে কানাডায় থাকেন। সেখানে পরিচয়ের সূত্র ধরে তাদের বিয়ে হয়। আফরোজার আগেও বিয়ে হয়েছিল। তার আগের ঘরের দুই মেয়ে ও এক ছেলে আশরাফুলের সংসারেই থাকত।
চলতি বছর ২৭ ফেব্রুয়ারি তারা এক মেয়েকে নিয়ে দেশে আসেন। কানাডায় বিয়ে হলেও দেশে আনুষ্ঠানিকতা সারতে নতুন করে কাবিননামা করেন।
গত ২৭ মে দুপুরে দক্ষিণখানের নদ্দাপাড়ায় শ্বশুরবাড়ি থেকে নিখোঁজ হন আফরোজা। পরে ৩১ মে রাতে ওই বাড়ীর সীমানার ভেতর থেকে মাটিতে পুঁতে রাখা মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এসআই রেজিয়া খাতুন বলেন, হত্যাকাণ্ডে আশরাফুলের পরিবারের অন্য সদস্যদের জড়িত থাকার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
“বাড়ির ভেতর স্ত্রীকে হত্যার পর মৃতদেহ শুধু আশরাফুলই ঘর থেকে টেনে বাইরে এনে মাটি খুঁড়ে সেখানে পুঁতে রাখল, ঘরে থাকা রক্ত পরিষ্কার করল, আর সেসময় বাড়িতে থাকা অন্য লোকজন টের পেল না, এটা কোনোভাবে বিশ্বাসযোগ্য নয়।”
আফরোজার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তার ছোট ভাই আরিফুল ইসলাম দক্ষিণখান থানায় একটি জিডি করেন। সেই জিডির তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন এসআই রেজিয়া খাতুন। তদন্ত করতে গিয়ে আফরোজার শ্বশুর, জা ও ভাসুরের কথাবার্তায় তার সন্দেহ হয়।
“পরে কৌশলে তাদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে আফরোজার অবস্থান জানতে গিয়ে জানা যায়, আফরোজা নিখোঁজ হয়নি, খুন হয়েছেন এবং লাশ বাড়ির সীমানা দেয়ালের পাশে মাটি চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে,” বলেন রেজিয়া খাতুন।
পুরানো খবর:
খুন করে পুঁতে রাখা হয়েছিল গৃহবধূকেতিনি বলেন, আশরাফুল তার স্ত্রীকে হত্যা করে কানাডা চলে যান। সে কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে আত্মীয়দের মধ্যেমে মোবাইল ফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
“নানা কৌশল অবলম্বন করে খালা পান্না চৌধুরীসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের মাধ্যমে আশরাফুলের সাথে ৩১ মে রাতে ভিডিও কলে কানাডায় যোগাযোগ করা হয়। তখনই আফরোজার মরদেহ পুঁতে রাখার জায়গাটি আশরাফুল ভিডিও কলের মাধ্যমে জানিয়ে দেন।”
এরপর আফরোজার মরদেহ উদ্ধার হলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় জানিয়ে এসআই রেজিয়া খাতুন বলেন, আফরোজার ডান বাহুতে এবং মাথার পেছনে পাঁচটি কোপের জখম ছিল।
নিখোঁজের জিডি হওয়ার মাত্র চারদিনের মাথায় লাশ উদ্ধার করা ‘বড় চ্যালেঞ্জ ছিল’ বলে মন্তব্য করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
কী ঘটেছিল?
এসআই রেজিয়া খাতুন বলেন, পারিবারিক নানা বিষয় নিয়ে আফরোজা ও আশরাফুলের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হত। ২৬ মে রাত পৌনে ৯টার দিকে তাদের বিয়ের রেজিষ্ট্রেশন নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ঝগড়া হয়। এক পর্যায়ে আফরোজার চিৎকার এবং পরে গোঙানোর শব্দ পান আশরাফুলের বাবা শামছুদ্দিন, ভাই সজীব, সজীবের স্ত্রী তাহমিনা।
“পরে তারা আশরাফুলের ঘরের সামনে গিয়ে দেখেন, আফরোজা ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে। মৃত্যু নিশ্চিত জেনে আশরাফুল অন্যদের সহায়তায় মরদেহ বিছানার চাদর ও কম্বলে পেঁচিয়ে এবং বালিশের কাভার দিয়ে বেঁধে প্রায় ৬০ ফুট ধুরে বাড়ির আঙিনায় মাটি চাপা দেন।”
হত্যাকাণ্ডের দুদিন পর ২৮ মে আফরোজার মেয়েকে নিয়েই সুমন কানাডা চলে যান।
রেজিয়া বলেন, “আশরাফুলকে রক্ষা করার জন্য হত্যার বিষয়টি অন্যরা গোপন করে রাখে এবং তাকে কানাডা পালিয়ে যেতে সহায়তা করে।”
কীভাবে তদন্ত
জিডির তদন্ত করতে গিয়ে এসআই রেজিয়া খাতুন দক্ষিণখানের দক্ষিণপাড়া মসজিদ রোডের ৪২ নম্বর বাসায় যান। সেখানে আফরোজার স্বামী আশরাফুলের খোঁজ করলে পরিবারের সদস্যরা বলেন, তিনি কানাডা চলে গেছেন। আর আফরোজা স্বামীর সঙ্গে রাগ করে বাসায় মোবাইল ফোন রেখে বের হয়ে গেছেন।
সম্ভাব্য বান্ধবীদের বাসায় খোঁজ করেও আফরোজাকে না পাওয়ায় তার মোবাইল ফোনের খোঁজ করেন তদন্ত কর্মকর্তা। পরিবারের সদস্যরা তখন বলেন, আশরাফুলই কানাডা যাওয়ার সময় মোবাইল ফোন নিয়ে গেছে।
এসআই রেজিয়া খাতুন বলেন, পরিবারের সদস্যদের সাথে নানা কৌশলে কথা বলতে গিয়ে এক পর্যায়ে পান্না চৌধুরী স্বীকার করেন, তার বোনের ছেলে আশরাফুলই হত্যা করেছেন আফরোজাকে।
পান্না এ ব্যাপারে এসআই রেজিয়ার সহযোগিতা চান। এই পুলিশ কর্মকর্তা তখন কানাডায় থাকা আশরাফুলের সঙ্গে ফোনে কথা বলিয়ে দিতে বলেন। যোগাযোগ হলে আশরাফুল নানা লোভনীয় প্রস্তাবও দেন।
এসআই রেজিয়া খাতুন জানান, আশরাফুলকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে নিয়ম অনুযায়ী ইন্টারপোলের সাহায্য চাওয়া হয়েছে।
আফরোজার ভাই যা বলেন
আফরোজার সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে তার ভাই আরিফুল ইসলাম এবং তাদের বাবা মোহাম্মদ আতাউল্লাহ বিভিন্নভাবে আশরাফুল এবং আফরোজার মেয়ের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু আশরাফুল তাদের জানান, বাসা থেকে রাগ করে বান্ধবীর বাসায় চলে গেছেন আফরোজা। আর তিনি জরুরি দরকারে কানাডা চলে যাচ্ছেন। আফরোজাও এক সপ্তাহ পরে যাবেন।
আফরোজার মেয়ে তার মামাকে বলে, ঘটনার দিন সে এক বান্ধবীর সাথে সিনেমা দেখতে গিয়েছিল এবং রাতে বাসায় ফিরে সে আর মাকে দেখেনি। তখন আশরাফুল তাকে বলেছিলেন, আফরোজা রাগ করে বান্ধবীর বাসায় গেছেন।
আফরোজার ছোট ভাই, মামলার বাদী মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তার বোনের রেখে যাওয়া ‘উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডলার, কানাডায় করা ইন্সুরেন্সের টাকাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র আত্মসাৎ করতেই’ তার বোনকে পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশে এনে হত্যা করা হয়েছে। আশরাফুলসহ পরিবারের লোকজন আফরোজার সঙ্গে ভালো ব্যবহারও করেনি।